আমার বয়স তখন পনেরো-ষোলো। বিয়ে হয়েছে প্রায় বছর দুই আগে। কোলে আছে সাত মাসের একটি ছেলে সন্তান। একদিন দুপুরবেলা রান্না সেরে, ঘর গুছিয়ে বসে আসি। কিছুক্ষণ পর স্বামী মাঠ থেকে এসেছেন। তাকে খাবার দিলাম। খেয়ে স্বামী সন্তানের সঙ্গে একটু দুষু্বমি করলেন। তারপর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ঘরের বারান্দায়। স্বামীর পাশে বসে আমিও সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছি। হঠাত্ চারপাশে গোলাগুলির আওয়াজ, মানুষের চিত্কার-চেচামেচি।
আমরা বাড়ির বাইরে আসতে না আসতেই পাকবাহিনীর সেনারা আমার বাড়িতে ঢুকে পড়লো। ঢুকেই প্রথমে স্বামীকে মাটিতে ফেলে বেয়নেট দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছে। তারপর গুলি করে মেরেছে। আমি ছেলেকে বুকের মধ্যে শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম। এক পাকসেনা জোর করে আমার কোল থেকে ছেলেকে কেড়ে নিয়ে প্রথমে মাটিতে ফেলে দিলো। তারপর জোরে একটা চাপা দিলো তার বুট দিয়ে। আর এক চাপাতেই আমার বুকের মানিক শেষ। স্বামী-সন্তানকে হত্যা করে তারা ঝাপিয়ে পড়লো আমার উপর এবং শুরু করলো শারীরিক নির্যাতন। সে নির্যাতনের চিহ্ন আজো বহন করছি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের নির্যাতনের কথা কেঁদে-কেঁদে এভাবেই বর্ণনা করলেন বীরকন্যা রাজুবালা। শুধু রাজুবালা নয়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে গ্রামে অসংখ্য নারীর জীবনে ঘটেছে এমন ঘটনা। যাদের অনেকের খোঁজ-খবর আমরা বিজয়ের ৪২ বছরেও নিতে পারিনি। দিতে পারিনি তাদের প্রাপ্য সম্মান। কিংবা মুছে দিতে পারিনি তাদের চোখের জল। সেসব বীরকন্যাদের খোঁজ-খবর নেয়া বা সম্মান দেয়ার কাজটিই করেছে ‘চেষ্টা’ নামক একটি সামাজিক নারী সংগঠন। তারা সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে খুঁজেখুঁজে দশ বীরকন্যাকে ঢাকায় এনে সম্মাননা জানিয়েছেন। বীরকন্যা রাজুবালা সে সম্মাননা অনুষ্ঠানেই বলেছেন একাত্তরে তার ওপর নির্যাতনের এসব কথা।
গত ১০ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সংগীত ও নৃত্যকলা ভবনের মিলনায়তনে এ সম্মাননা জানানো হয়। রাজুবালাসহ অন্য বীরকন্যারা হলেন-সূর্যী বেগম, জয়গুন বেগম, হাজেরা বেগম, আছিয়া বেগম, সুরাইয়া বেগম, নূরজাহান বেগম, রহিমা বেগম ও কমলা বেগম। এদের মধ্যে একজন শারীরিক অসুস্থতার জন্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পরেননি।
অনুষ্ঠানে বীরকন্যাদের হাতে ফুলের তোড়া ও উত্তরীয় পরিয়ে দেন বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। ‘চেষ্টা’র সভাপতি সেলিনা বেগমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কবি কাজী রোজীসহ অনেকে। বীরকন্যারা অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বামী-সন্তান হারানো ও নির্যাতনের কথা বর্ণনা করেন। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় গান গেয়ে শোনান শিল্পী আবিদা সুলতানাসহ অনেকে।
বীরকন্যা আছিয়া বেগম বলেন, ‘আমি চাকরি করতাম পরিবার পরিকল্পনা সমিতিতে। আমাদের গ্রামে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমরা গ্রামের মোতাহার মাস্টারের বাসায় বসে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রুটি বানাতাম। সখিনা নামের একটি মেয়েও আমার সঙ্গে থাকতো সব সময়। একদিন শেষরাতে হঠাত্ মানুষের চেচামেচিতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম থেকে উঠে দেখি চারদিকের বাড়িঘরে আগুন, মানুষের দৌড়-ঝাঁপ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের বাড়িতে বেশ কয়েকজন পাকসেনা চলে আসে এবং আমাদের ধরে নিয়ে যায়। আমার পেটে তখন বাচ্চা ছিলো। সে অবস্থায় পাকসেনার দল আমার উপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। প্রায় তিন মাস পরে আমরা ছাড়া পাই। স্বামী হোসেন আলী তখন নিখোঁজ। আজো তার খোঁজ নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছরেও আমাদের খোঁজ কেউ নেয়নি। সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা। অথচ সামাজিকভাবে আমরা এখনো অবেহেলিত-অপমানিত।’
বীরকন্যা নূরজাহান বেগম বলেন, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছিলাম পাকসেনাদের ভয়ে। কিন্তু পালাতে পরিনি। ধরা খাই পথে। তারপর ক্যাম্পে নিয়ে চলে শারীরিক নির্যাতন। স্বামী মারা গেছে অনেক আগে। দুই মেয়ে আছে। তারা আমার দেখাশোনা করে না। একাত্তরের সেই নির্যাতন নিয়ে এখনো বড় কষ্টে আছি। কিন্তু আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই।’
আছিয়া বেগম ও নূরজাহান বেগমের মতো অন্য বীরকন্যাদেরও রয়েছে এমন না জানা অসংখ্য গল্প। কিন্তু তাদের সে গল্প শোনার সময়টুকুও আমাদের নেই। আর তাই অনুষ্ঠানে এসব বীরকন্যারা তাদের বয়স্কভাতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভাতা প্রদানসহ বিভিন্ন সহযোগিতার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের বীরকন্যাদের পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে ২০১১ সালের চার সেপ্টেম্বর ‘চেষ্টা’র যত্রা শুরু হয়। শুরুতে সদস্য ছিলো মাত্র চারজন। এখন সদস্য সংখ্যা ১৮ জন। তারা কেউ চাকরিজীবী। কেউ গৃহিণী। কেউবা অন্য পেশার। এর আগে ‘চেষ্টা’র সদস্যরা হবিগঞ্জের তিন বীরকন্যাকে ঢাকায় এনে সম্মাননা জানান এবং তাদের একটি করে দুধের গাভী প্রদান করেন।
ছবি: লেখক
