প্র জ ন্মে র আ ই ক ন

অতিথিবত্সল একজন

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:১৬
ক্যারিয়ার শব্দটি আমাদের জীবনে বড় গুরুত্ব বহন করে। একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সঠিক সময়ে সঠিক ক্যারিয়ারের পথটা নির্ধারণ করা, সেই পথে এগিয়ে চলা। কোনো কাজই ছোট না, ইচ্ছে আর দৃঢ় মনোবল থাকলে পছন্দ অনুযায়ী ক্যারিয়ার বেছে নিয়ে তাতে সফল হওয়া সম্ভব। তেমনই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন, দ্য ওয়েস্টিন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজার আজিম শাহ্। যিনি তার সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে নিজ গুণে স্থান করে নিয়েছেন আমাদের এবারের প্রজন্মের পাতায়। তার সাফল্যের নানা গল্প নিয়ে এই আয়োজন। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মোর্শেদ নাসের ও গ্রন্থনা করেছেন প্রাঞ্জল সেলিম হোটেল ম্যানেজমেন্ট কথাটি শুনলে অনেকেরই চোখে ভেসে উঠতে পারে একজন ওয়েটারের ছবি। ঠিক এমনটি ঘটেছিল আজিম শাহে্র বেলায়ও, যখন তার বাবা তাকে বলেছিলেন হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়ার জন্য। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা না। ডাক্তারি কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনার থেকে কোনো অংশেই কম যায় না এই বিদ্যাটি। একে খাটো করে দেখার উপায় নেই, কারণ এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে আজিম শাহ্ আজ একজন সফল ব্যক্তিত্ব। অসংখ্য দেশ ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে আজিম শাহে্র। নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, জাপান ও বৈরুতের মতো শহরে কেটেছে তার শৈশব। এই ব্যাপারে মজা করে তিনি বলেন, ‘দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোটা একরকম আমার সিস্টেমেরই অংশ হয়ে গেছে।’ তার পড়াশোনার পর্বটি শুরু হয় ভারত থেকে। ভারতের বোম্বের এয়ার ইন্ডিয়া স্কুলে তিনি ১২ বছর পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। স্কুল ও কলেজের গণ্ডি পার হওয়ার পরে তিনি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য অস্ট্রেলিয়া চলে আসেন। অস্ট্রেলিয়া চলে আসার আরও একটি কারণ হলো তার সিটিজেনশিপ। সে সময় তাকে দুটো রাস্তার সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল, হয় ভারতের নাগরিকত্ব নতুবা অস্ট্রেলিয়ার। ১৮ বছর বয়সের আগেই তাকে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য যেতে হয়েছিল সেখানে। আর এই কারণে তিনি তার টুয়েলভথ গ্রেড শেষ করতে পারেননি। সেখানেই তার ক্যারিয়ারের অধ্যায়টি শুরু হয়। তার ইচ্ছে ছিল পাইলট হবেন। পাখির মতো আকাশে উড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার পরিবারের পছন্দ ছিল অন্যরকম। হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনার প্রস্তাব করা হয় তাকে। পরবর্তীতে তিনি বুঝতে পারেন, আসলে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পড়াশোনা করতে খরচ অনেক বেশি। এরপর বাবার প্রস্তাবে রাজি হয়ে তিনি হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। তিনি চিন্তা করলেন, মানুষের কয়েকটি চাহিদার মধ্যে অন্যতম হলো থাকা এবং খাওয়া। তাই, এই ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার করলে খারাপ হয় না। শুরু হলো তার প্রস্তুতি। হোটেল স্কুলের জন্য ইন্টারভিউ দিতে গেলেন তিনি। দুটি কলেজে তার সিলেকশনও হলো। শুরু হলো তার ক্যারিয়ারের পথচলা। তিনি ডিপ্লোমার জন্য ভর্তি হলেন। অস্ট্রেলিয়াতে তিনি একটি অস্ট্রেলিয়ান পরিবারের সাথে থাকতেন। পারিবারিকভাবে তারা পরিচিত ছিলেন। তার জন্মের সময় তারাই তার মা’কে হাসপাতাল নিয়ে যান। তারা তার পরিবারেরই অংশ হয়ে গিয়েছিলেন। পড়াশোনার জন্য অস্ট্রেলিয়াতে এসে তাদের সাথে থাকলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়াতে একটা নিয়ম আছে, কেউ আঠারো বছরের হলে তাকে থাকার জন্য পে করতে হয়। সেভাবে তাকেও কিছু দিতে হতো। তবে সেটার পরিমাণ ছিলো খুব সামান্য, সপ্তাহে ২৫ থেকে ৩০ ডলারের মতো। এই পরিবারের সাথে থাকতে গিয়ে তার অনেক ধরনের মানুষের সাথে পরিচয় হয়। ভিন্ন ভাষী মানুষের সাথে তার নানা রকমের অভিজ্ঞতাও হয়। এসবের মাঝখানেই শুরু হয় তার হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা। ১৯৮৩ সালে তিনি এ বিষয়ে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এরপর হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে মনে হয়েছে তার বাবা সঠিক প্রস্তাবই দিয়েছিলেন তাকে। তিনি নিজেও বেশ আনন্দের সাথে পড়াশোনা চালিয়ে যান। সে সময় আজিম শাহেক তার লেকচারার বলেছিলেন, ‘এই বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়ে সফল হতে হলে প্রয়োজন অভিজ্ঞতার, সাথে কাজ করে যেতে হবে নিষ্ঠার সাথে। কারণ যত বেশি কাজ করা যাবে শেখাটা ততটা সহজ হবে।’ তিনি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করেন, কারণ তারা ছিলেন ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে শেষ ব্যাচ, যারা জেনারেল কোর্সটা করতে পেরেছিলেন। তারা হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রির সব ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার ডিপ্লোমার কোর্সটির বিষয় ছিল হসপিটালি ও ট্যুরিজম নিয়ে। এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা যে তার ভালো লাগছিল এবং নিজেকে এর সাথে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলেন সেটা বোঝা গিয়েছিল তার পারফর্মেন্স দেখে। কোর্সের দ্বিতীয় বছর পার হয়নি তখনও, অথচ তাকে ক্লাস লিডার করা হয়েছিল। যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া আসা অর্থাত্ যাতায়াতের কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল তাকে। কারণ সেখানে প্রায় সবারই নিজের গাড়ি আছে। আর বাস ট্রান্সপোর্টেশন আধা ঘণ্টা পর পর ছিল। সাহসের সাথে সেই অধ্যায়টাও পার করেন তিনি। কোর্সের মাঝে কিছুটা বিনোদনের সময়ও বের করে নিতেন তিনি। এই ছাত্রজীবনে তাকে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা টাকা-পয়সার সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। এ কারণে তিনি এক রেস্টুরেন্টে পার্ট টাইম কাজ শুরু করেন। ‘রাঙ্গুন বার্মিজ কারিজ’ নাম ছিল ফুড কোর্টটির। প্রথম প্রথম তিনি কলেজ শেষ করে সেখানে খেতে যেতেন। এরপর তিনি একদিন তাদের কাছে জানতে চাইলেন তার করার মতো কোনো কাজ আছে কি না। তারা জানালো, থালাবাসন ধোয়ার কাজ দেওয়া যেতে পারে তাকে। তিনি সেই কাজ শুরু করেন। এরপর একসময় তিনি কিচেন হেড হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। আগ্রহের বশে তিনি রান্না শেখার চেষ্টা করতেন। একসময় তাকে স্টোরের ইনচার্জ করে দেওয়া হলো। অবশ্য নিজের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্যও তাকে রান্না শিখতে হয়েছিল। ডাল ও কারি রান্না শিখলেন তিনি। সেটা ছিল তার কাছে যেন অনেকটা ডাল-ভাতের মতো। এভাবেই তিনি পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেন নিজেকে। তিনি মনে করেন, ‘প্রয়োজনীয়তাই সৃজনশীল হতে সহায়তা করে।’ একই সময় তিনি শেরাটন হোটেলে কাজের জন্য আবেদন করেছিলেন। সেখানে পরিচয় হয় তার বাবার একজন ব্যাচমেটের সাথে। এরপর তিনি তার সাথে কাজ করা শুরু করেন। শুরুর দিকে তিনি সার্ভ করার কাজ করতেন। তবে তার আগ্রহ ছিল রান্নাঘরের দিকে, তিনি একজন পেস্ট্রি শেফ হিসেবে কাজ করতে চাইতেন। একদিন সেখানকার এক্সিকিউটিভ শেফের সাথে দেখা হয় তার। তার বয়স ছিল প্রায় পঞ্চাশের কোঠায়। আজিম শাহ্ অবাক হয়েছিলেন যে, এই বয়সেও সেই ভদ্রলোক একজন শেফ হিসেবে কাজ করছেন। এরপর তিনি বিস্মিত হলেন ভেবে যে, এই ভদ্রলোক জিএম হবেন কবে! কোনোকিছুর প্রতি ফোকাস করে সেদিকে এগিয়ে গেলে তা পাওয়া যাবে। সেটা ভেবে তিনি ঠিক করলেন, তিনি রেস্টুরেন্ট সাইডেই থাকবেন। তার বয়স যখন বিশের কাছাকাছি তখন তার বাবা বলেছিলেন, ‘এখন তুমি কাজ করছ, তোমার নিজের একটা বাসা নিয়ে নেওয়া উচিত।’ বাবার কথা শুনে তিনি একটা বাসা মর্টগেজ নেন। এই প্রথম বাড়ি হলো তার। তার সাথের সবাই, তার বন্ধু-বান্ধবরা যখন আনন্দ উল্লাস করছে, তখন তাকে বাড়ির টাকা শোধ করার জন্য কাজ করতে হয়েছে। আড্ডা দেওয়ার সময় ছিল না তার। কাজ করে যেতে হয়েছিল ভবিষ্যতের জন্য। এরপর তার ফুল টাইম কাজ শুরু হলো—সাথে সাথে শুরু হলো লোন শোধ করার প্রক্রিয়া। তবে তিনি তার বাবার কাছে কৃতজ্ঞ এই ব্যাপারটি নিয়ে। এটাই তার জন্য সেরা সময় ছিল নিজের একটা বাড়ি করার। কারণ তিনি দেখেছেন, পরবর্তীতে তার সহকর্মীরা বাসা নেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের কষ্ট করতে হয়েছে অনেক। আর সেদিক দিয়ে তিনি প্রায় তিনটা কি চারটার মতো বাসা বদল করেছেন। তিনি জানালেন এটা শুধুমাত্র সম্পদ বৃদ্ধি করার ঘটনা ছিল না। এর উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতটা নিরাপদ করা। তবে এর পাশাপাশি তিনি তার পরিবারকেও অনেক সাহায্য করেছেন। তিনি তার পরিবারের অস্ট্রেলিয়াতে আসার টিকিটেরও ব্যবস্থা করেন। ফেরার পর শেরাটন হোটেলের কাজের সাথে তার ক্যারিয়ার এগিয়ে যেতে থাকে। তাকে রেস্টুরেন্ট ম্যানেজারের পোস্ট দেওয়া হয়। সেই সময় তিনিই সর্ব কনিষ্ঠ রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার ছিলেন। এশিয়া প্যাসিফিকে কাজ করার সময় তার ক্লাসমেটদের সাথে দেখা হয়। তাদের বস হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এর কারণ হলো তিনি অন্য সবার থেকে বেশি সিরিয়াস ছিলেন ক্যারিয়ার নিয়ে। নিজের জীবনের লক্ষ পূরণে অনেক দৃঢ় ছিলেন। তিনি সবার সাথে মিলেমিশেই কাজ করতেন। তিনি মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে শেখেননি। কেউ সাদা, কেউ কালো এই বৈষম্যের কথা মানেন না তিনি। যেখানে তিনি বেড়ে উঠেছেন সেই পরিবেশে কেউ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ছিলেন না। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইসলামে বলা হয়েছে সবাই সমান।’ তিনি মনে করেন, কাউকে ছোট করে কেউ বড় হতে পারে না। যদি কারও মধ্যে মেধা থাকে তবে দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে গেলে সাফল্য আসবেই। কে কী বলল সেটা ভেবে বসে থাকলে চলবে না। কী করলাম—এটা চিন্তা করতে গেলে নেতিবাচক ধারণা মনে আসবে। কিন্তু মনে কোনো নেতিবাচক চিন্তাকে ঠাঁই দেওয়া যাবে না। তিনি জীবনে দুটো শব্দ পছন্দ করেন না। একটি হলো, ‘দুঃখিত’ আর অপরটি হলো ‘হবে’। তিনি তার স্টাফদের কাছ থেকে এই শব্দ দুটি শুনতে চান না। তিনি মনে করেন সব কিছু করা সম্ভব। এরপর তিনি তার অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ানরা খুব প্রাণোচ্ছল, তারা খুব ভালো। তারা আপনাকে কঠিন সময়ের মধ্যে ফেলবে। আবার সেটা কাটিয়ে উঠতে পারলে তারাই হয়ে যাবে আপনার বন্ধুর মতো। তাদের সাথে যদি মজা করা হয় তবে তারাও আপনার সাথে মজা করবে। তারা সবাইকে সমান ভাবে দেখে।’ সেই ব্যাপারে আলাপ করতে গিয়েই প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে শিশুদের কথা। তিনি বলেন, ‘শিশুরা ইনোসেন্ট, তারা কিছু বোঝে না। আমরাই তাদের পার্থক্যগুলো শেখাই। ভালো-খারাপ আমরাই তাদের বুঝাই। আর তাই এটা আমাদেরই দায়িত্ব তাদের ভালো কিছুর নির্দেশনা দেওয়া। এ দিক দিয়ে অস্ট্রেলিয়ানরা ভালো। তারা খারাপটা শেখায় না। এটা এমন একটা জায়গা যেখানে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। কেউ যদি অলস হয় তবে সে সব জায়গাতেই অলস থাকবে। আবার কারও ভেতর যদি কিছু করার উদ্দীপনা থাকে তবে সে এগিয়ে যাবেই।’ আর জীবনে সাফল্য লাভে তিনি একটি সহজ যুক্তিতে বিশ্বাস করেন, ‘বি স্মার্ট, ওয়ার্ক হার্ড।’