প্র জ ন্ম মু খ

সুরের চিত্রকর

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:১৬
ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও এখন কম্পিউটারে খেলতে খেলতে মুভি মেকার দিয়ে দিব্যি বানিয়ে ফেলছে ছোট ছোট শর্টফিল্ম অথবা কোনো স্লাইডশো! আমাদের আজকের প্রজন্মের মেধাবী মুখ শুভব্রত সরকার কিন্তু ব্যতিক্রমী একজন। যখন অধ্যাপক বাবা মোটা মোটা বই নিয়ে ঘুরতেন, তার পাশে বোন ব্যস্ত থাকতেন ডাক্তারি পড়া নিয়ে তখন ছোট্ট শুভ ভালোবাসতেন ওয়েব জগত্, অ্যানিমেশন আর গ্রাফিক্সের রঙিন দুনিয়া। সেই ভালোবাসাই তাকে নিয়ে এসেছে আজকের অবস্থানে। অসাধারণ কিছু কাজ দিয়ে ঠাই করে নিয়েছেন মানুষের মনে। ভিডিও সম্পাদনা আর পরিচালনায় অনন্য এই মেধাবীকে নিয়ে লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র শুরু থেকেই শুভর আগ্রহ ছিল ভিডিওগ্রাফির প্রতি। সেগুলো সম্পাদনা আর গ্রাফিক্স নিয়ে খেলা করার শখটাও ছিল তখন থেকেই। সেই চিন্তাভাবনা থেকেই নিজের কাজটাকে একটু প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ভর্তি হলেন স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগে। ছাত্র থাকাকালীনই তিনি বেশ কিছু জায়গাতে কাজ করার সুযোগ পান, বিভাগের চেয়ারম্যান চিত্রপরিচালক মতিন রহমানের সাথে কাজ করেন বেশকিছু বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে। সেগুলোতে সহকারী পরিচালকের কাজ ছাড়াও সম্পাদনার সাথেও জড়িত ছিলেন তিনি। শুভ তার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তৈরি ডকুমেন্টারিতেও কাজ করে সুনাম কুড়ান বন্ধুদের কাছ থেকে। শুভ মনে করেন ২০০৭ সালে বিদেশি একটি সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি ‘পুরোড প্রাইড’ তার পথচলায় এক বড় অনুপ্রেরণা। এই ডকুমেন্টারিটি জার্মানির ‘সিলভার বিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে, যেটা তার জন্য তো বটেই, বাংলাদেশের জন্যও অনেক বড় একটা অর্জন বলে মনে করেন তিনি। সেই সময় এর পুরো কারিগরি সহায়তাই শুভ করেছিলেন, আর তার পর থেকে তিনি যেন আরও উত্সাহ পেয়ে গেলেন। কাজ করতে শুরু করলে পুরোদমে। বর্তমানে শুভ মিউজিক ভিডিওর নির্মাতা হিসেবেই খ্যাতি কুড়িয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে। ব্যতিক্রমী নির্দেশনা, পরিচালনা আর সম্পাদনা দিয়ে তিনি উপহার দিয়েছেন অনেক ভালো ভালো কাজ; আপাতদৃষ্টিতে তার কাছে সেগুলো পরীক্ষামূলক মনে হলেও সেটা শিল্পের বিচারে অবশ্যই মানোত্তীর্ণ, দর্শকপ্রিয়তাই তার বড় প্রমাণ। শুভর অনেক ভালো কাজের মধ্যে রয়েছে কনার ‘ধিম তা না’, এটি এখন শহর গ্রামের সবার কাছে সমানভাবে সমাদৃত। অনেক নতুন নতুন প্রযুক্তি আর ধারণা সন্নিবেশ করেছিলেন তিনি ভিডিওটিতে। তরুণ সংগীত পরিচালক জুয়েল মোর্শেদের ‘বল তুই আমায় ছেড়ে কোথায় যাবি’ গানটারও চিত্রায়ন করেন তিনি। এ ছাড়া শফিক তুহিনের ‘সুস্মিতা’, ইবরার টিপুর ‘চাই তোমায়’, নওমীর ‘তোমায় দেবে’ গানগুলোর দৃশ্যায়ন ও সম্পাদনায় তিনি মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। এভাবেই মিউজিক ভিডিওর মাঝে তিনি ডুবে গেলেন। সম্প্রতি শেষ করেছেন কনার ‘সিম্পলি কনা’ অ্যালবামের প্রায় ছয়টি গানের দৃশ্যায়ন। এই প্রজন্মের কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে শুভ বলেন, ‘সবাই-ই বেশ আগ্রহ নিয়ে এখানে কাজ করতে আসছেন, মিডিয়াতে ডিরেক্টিং বা এডিটিং দুটি ক্ষেত্রেই কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে সেই সম্ভাবনা আরও বাড়বে বৈ কমবে না। দিনকে দিন আমাদের দেশে এই ধরনের কাজের চাহিদা ও মান দুটোই বাড়ছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী দশ বছর অনেক ভালো একটা পর্যায়ে পৌঁছে যাবে আমাদের এই নির্মাণশিল্প। সেখানে কাজের জন্য দক্ষ আর সৃজনশীল মানুষের খুব প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মের দিকেই তো সবাই চেয়ে থাকে।’ শুভ বিশ্বাস করেন, নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই আমাদের এই শিল্প আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাবে। নতুন যারা এই ক্ষেত্রে কাজ করতে চান তাদেরকে হাতে কলমে শিক্ষার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার উপরেও জোর দিতে বলেন তিনি, কারণ দুটি জিনিসই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাথে নিজের আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য দাঁড় করানো উচিত, হুবহু কাউকে অনুকরণ না করে ভালো ভালো অনেক কাজ দেখলে নিজের দক্ষতা আপনাআপনিই বৃদ্ধি পেতে থাকে বলে মন্তব্য শুভর। শুভর শৈশব-কৈশোর কেটেছে দইয়ের জন্য খ্যাত শহর বগুড়াতে, সেখানেই স্কুল-কলেজের পাঠ চুকিয়েছেন। তার বাবা সরকারি আযিযুল হক কলেজের ভুগোলের অধ্যাপক পদ থেকে অবসরে গেলেন অল্প কিছুদিন হলো, আর মা পুরোদস্তুর গৃহিণী। একমাত্র বড় বোন চিকিত্সক। তার কাজ নিয়ে পরিবারের সবাই খুব খুশি, এ নিয়ে তাদের উত্সাহ অনুপ্রেরণা সবসময়ই পান তিনি। মেধাবী এই নির্মাতা স্বপ্ন দেখেন একদিন আমাদের নির্মাণশিল্প দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিজের যোগ্যতায় বাইরের বিশ্বে সুনাম অর্জন করবে, সে পথ ধরে এই অগ্রযাত্রায় নিজের অবস্থানে থেকে সামিল হতে চান তিনি।