শিগগিরই কি পরমাণু-বিস্ফোরণ ঘটাবে পিয়ংইয়াং

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৮
দূরপাল্লার এক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উেক্ষপণে গত সপ্তাহে ‘সুপারহিরো’ হয়ে উঠলেন উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন। সেই সঙ্গে প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপান তো বটেই ‘সর্বশক্তিমান’ আমেরিকার কপালেও দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিল উত্তর কোরিয়া—সন্দেহ শিগগিরই কি পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাতে চলেছে পিয়ংইয়াং। বুধবার সকাল, উত্তর কোরিয়ার সময় অনুযায়ী ঘড়িতে তখন ১০টা। দেশের সোহা মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র থেকে উেক্ষপণ করা হয় উনহা-৩ ক্ষেপণাস্ত্র। একা নয়, দূরপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র বহন করছিল ‘কোয়াংমিয়ংসং-৩’ নামের একটি কৃত্রিম উপগ্রহও। এ দিকে, রাজধানী পিয়ং ইয়ংয়ে গত শুক্রবার হাজার হাজার সেনা এবং সাধারণ মানুষ এই সফল উেক্ষপণের আনন্দে উত্সবে মেতে ওঠে। রাজধানীর কিম-ইল সুং চত্বরে সব শ্রেণীর মানুষ সমবেত হন। তারা উেক্ষপণ সফল হওয়াকে কেন্দ্র করে দেশটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ভাষণ উল্লাস ও করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানায়। এ সময় দেশটির নেতা কিম জং উনের প্রশংসায় মেতে ওঠে সবাই। মার্কিন ব্লকের শত্রুতা, পরমাণু পরীক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা—কোনো কিছুই আটকে রাখতে পারেনি পিয়ংইয়াংয়ের তরুণ শাসককে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে একই ক্ষেপণাস্ত্রের উেক্ষপণের চেষ্টা করেছিল উত্তর কোরিয়া। কিন্তু দুই মিনিটের মাথায় রকেটটি জাপান সাগরে ভেঙে পড়ে ব্যর্থ করে দেয় সব স্বপ্ন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়ে যেভাবে সফল হলো ২৯ বছরের কিম জং উনের সরকার, তাতে বেশ চিন্তায় পড়েছে অনেকেই। এমনকি উত্তর কোরিয়ার একমাত্র ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ চীনও বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলেছে। উত্তর কোরিয়ার সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে—যুদ্ধের জন্য নয়, ওই রকেট ছোড়া হয়েছে আবহাওয়া-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা করার জন্য একটি কৃত্রিম উপগ্রহকে মহাকাশে উিক্ষপ্ত করতে। কিন্তু এই ‘আশ্বাস-বাক্য’-এ খুব একটা নিশ্চিন্ত বোধ করছে না জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া—চিন্তিত আমেরিকাও। এই তিন দেশেরই মহাকাশ-সংক্রান্ত গবেষণা বিভাগের একাধিক যন্ত্রের পাঠ জানাচ্ছে—উনহা-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা চার থেকে ছয় হাজার কিলোমিটারের মধ্যে থাকতে পারে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এরই মধ্যে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে পিয়ংইয়াং সরকারকে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—এই উেক্ষপণ উত্তর কোরিয়াকে এক ধাক্কায় এগিয়ে দিল অনেকটাই। যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী ব্লকের নতুন সম্ভাবনাময় নেতা হিসেবে উঠে এলেন উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন। অনেক দিন ধরেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল—আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গোপনে পরমাণু-অস্ত্র নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে উত্তর কোরিয়া সরকার। অন্তত গোটা ছয়েক বোমা তৈরি করার মতো প্লুটোনিয়াম উত্তর কোরিয়া জোগাড় করে ফেলেছে বলে আশঙ্কা করছিলেন অনেকেই। উত্তর কোরিয়ার সীমানার মধ্যেই ইউরেনিয়ামের বিপুল ভাণ্ডার রয়েছে বলেও অনুমান করা হয়। বুধবারের এই উেক্ষপণ তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সাম্য অনেকটাই বদলে দিল বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া আমেরিকার ভরসায় এখন পর্যন্ত অনেকটাই লাগাম দিয়ে রেখেছে নিজেদের মহাকাশ গবেষণায়। এ দিকে উেক্ষপণের পরই জাতিংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের এক বৈঠক ডাকা হয়। ১৯৫০-৫৩ সাল মেয়াদে দুই কোরিয়ার যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে এখনো শেষ হয়নি। দুই পক্ষই অস্ত্রসংবরণ করে রয়েছে মাত্র। সীমা লঙ্ঘন করে যাতে পিয়ংইয়াংয়ের বাহিনী না হানা দিতে পারে দক্ষিণ দিকে, তার জন্য অন্তত ৩০ হাজার মার্কিন সৈন্য এখনো রয়েছে কোরীয় উপ-দ্বীপে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল এর আগে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল উত্তর কোরিয়ার ওপর। কয়েক মাস আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই লাখ ৪০ হাজার টন খাদ্য সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয় উত্তর কোরিয়া কেবলমাত্র ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের জন্য। তবু থামেনি কিম-এর ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের নেশা। তবে কি উত্তর কোরিয়ার নজরে এবার পরমাণু বোমা? বছর তিনেক আগে, ২০০৯ সালেও একবার ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উেক্ষপণ করেছিল পিয়ংইয়াং। দেশের ক্ষমতায় তখন বর্তমান শাসক কিম জং উন-এর বাবা কিম উল জং। আমেরিকাসহ পশ্চিমা দুনিয়া সেই ধাক্কা সামলানোর সুযোগ পায়নি। এক মাসের মধ্যেই পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল তারা। বুঝিয়ে দিয়েছিল—মার্কিন হুমকিকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে ‘ক্ষুদ্র’ উত্তর কোরিয়া। অতীত ‘ঐতিহ্য’ বজায় রেখে কি আবার মাসখানেকের মধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাতে চলেছে পিয়ংইয়াং? তিন পুরুষ ধরে উত্তর কোরিয়ার শাসকরা সমানে বজায় রেখেছেন তাদের মার্কিন-বিরোধিতা। বিভিন্ন সময়ে মার্কিন সরকার ও জাতিসংঙ্ঘের নিষেধাজ্ঞা ছাড়া আর তেমন কোনো বড়সড় বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে হয় না উত্তর কোরিয়াকে। কয়েক মাস আগেই হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ করায় প্রায় আড়াই লাখ টন খাদ্য সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে উত্তর কোরিয়া। অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মুখে, তবু ফেরেননি শাসক কিং জং উন। সম্প্রতি এক মার্কিন গোয়েন্দা উপগ্রহের তোলা ছবিতে দেখা গেছে—দেশের উত্তর-পূর্বের পার্বত্য এলাকার দিকে যাওয়ার পুরনো রাস্তা মেরামত চলছে। পথ থেকে সরানো হচ্ছে বরফ ও জঞ্জাল। এর আগে এই হামগিওং পার্বত্য এলাকাতেই পরীক্ষামূলকভাবে পরমাণু-বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। মাটির গভীরে যে সুড়ঙ্গ কেটে তার মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল, সেই সুড়ঙ্গ এলাকাতেও চলছে মেরামতকাজ। তাই অনেকেই ধারণা করছেন—ক্ষেপণাস্ত্রের পরই বুঝি পরমাণু-বিস্ফোরণ। উত্তর কোরিয়া সরকার যদিও শুরু থেকেই বলে আসছে—যুদ্ধের জন্য নয়, নাগরিকদের প্রয়োজনেই বিদ্যুত্ তৈরির জন্য তাদের এই পরমাণু-গবেষণা। তবে পার্বত্য এলাকায় তাদের ভারী জল তৈরির প্রকল্পকে পশ্চিম দেখেছে সন্দেহের চোখেই। মাত্র এক দিন আগে উেক্ষপণ করা এই ক্ষেপণাস্ত্র কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়ে উড়ে গেলেও তা যে পরমাণু-বিস্ফোরক নিয়েও উড়তে সক্ষম, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে ছয় হাজার কিলোমিটার পাল্লাবিশিষ্ট এই ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়তে পারে আমেরিকার মাটিতেও। আতঙ্কিত মার্কিন প্রশাসন তাই যথেষ্ট সাবধান। যে ভাষায় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে হুমকি দেয়া যায় কিংবা যেভাবে কথা বলা যায় ইরানের মাহমুদ আহমেদিনেজাদের সঙ্গে, সেই ভাষায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে না তারা। কোন পথে এগোতে পারে ‘একলা চল রে’ নীতি নিয়ে চলতে থাকা উত্তর কোরিয়া? দেশের সরকার নিজেই জানিয়েছে—তারা লিবিয়া ও সিরিয়ার সঙ্গে পরমাণু-প্রযুক্তির আদান-প্রদান করেছে। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দাদের সন্দেহ—এই তালিকায় সম্ভবত পাকিস্তানও রয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে সাপ-নেউল সম্পর্কের ইরানও উত্তর কোরিয়ার ‘বিশেষ বন্ধু’ বলে মনে করা হয়। এবার তা হলে কী-ভাবে শান্ত রাখা যাবে উত্তর কোরিয়াকে—নরম কথায়, নাকি সমানে চলতে থাকবে হুমকি? ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের পর উত্তর কোরিয়ায় রীতিমতো উত্সবের আমেজ। শাসক হিসেবে মর্যাদা বেড়েছে কিম জং উন-এর। মার্কিন হুমকির পাল্টায় হুমকি চালিয়ে গত ৬৪ বছর ধরে এই পরিবার যে বেশ সফল হয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনিতেই দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছে, তাই নতুন করে হারানোর কিছুই নেই তাদের। দুঃসাহসী কিম তাই শান্তি ভিক্ষা চান না। তিনি বিশ্বাস করেন, ‘বন্দুকের নলের শেষ প্রান্তেই থাকে শান্তি।’