স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুল ট্র্যাজেডি

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩০
কতগুলো স্বপ্নের অপমৃত্যু। আমেরিকার কানেক্টিকাটে এক বন্দুকবাজের বেপরোয়া গুলির শিকার হলো একঝাঁক ফুলের মতো শিশু। প্রাণ হারালো ৩০ জন। এর মধ্যে নিহত শিশুর সংখ্যাই ২০। হাতের ‘বুশমাস্টার সেমি-অটোম্যাটিক’ থেকে বেরিয়ে আসছে একের পর এক পয়েন্ট ২২৩ বোরের গুলি। কোমরে গোঁজা একটা পয়েন্ট ৪৫ সিগ-স্যয়ার পিস্তল আর একটা গ্লক ১৭। ২০ বছরের অ্যাডাম ল্যানজা তখন আর নিজের মধ্যে নেই। মানসিক অবসাদগ্রস্ত এই মার্কিন তরুণের উগরে দেয়া গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের কানেক্টিকাটের ‘স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুল’-এর শিশু-পড়ুয়ারা। নিহত ২০ জন পড়ুয়ার বয়স পাঁচ থেকে দশের মধ্যে। স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়তো টেলিভিশন-সিনেমার দৌলতেই। ওই স্কুলের শিক্ষিকা ক্যাটলিন রয়েগ এ ঘটনার মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘বাইরে গুলির শব্দ শুনেই বুঝেছিলাম—কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে কোনো মতে একটা বুক শেল্ফ এনে দরজায় ঠেস দিই। বাচ্চাদের বলেছিলাম—একেবারে চুপ করে থাকতে। বলেছিলাম—বাইরে এখন দুষ্টু লোকরা এসেছে। ভালো লোকরা এসে শাস্তি দেবে। ওরাও ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছিল।’ কেমন ছিল ভেতরের প্রতিটি মুহূর্ত? ক্যাটলিনের কাছে ‘একেকটা সেকেন্ড ছিল একেক ঘণ্টার মতো।’ মুখে বাচ্চাদের আশ্বাস দিয়েছেন—‘দুষ্টু লোক’ কিছুতেই ভেতরে আসতে পারবে না। এ দিকে স্কুলের মিটিং রুম থেকে তখন পালানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন জনা সাতেক শিক্ষিকা। ক্লাস ফোরের টিচাস?র্ মিটিং চলছিল। আচমকা গুলির শব্দ তোলপাড় করে দেয় গোটা স্কুলকে। মিটিং রুমটি ভেতর থেকে বন্ধ করার ব্যবস্থা ছিল না। ত্রস্ত থিয়োডোর-এর ভাষায়, ‘কে একজন যেন স্কুলের লাউড-স্পিকারটা চালিয়ে দিয়েছিল। মৃত্যুর তাণ্ডব শুনতে পাচ্ছিলাম। লাউড-স্পিকার চুঁইয়ে বেরিয়ে আসছিল আতঙ্কের প্রহর। ভাবছিলাম—এটাই বুঝি শেষ দিন।’ চোখের সামনে দুই সহকর্মীকে মৃত্যুর দিকে ছুটে যেতে দেখেছেন স্কুলের থেরাপিস্ট ডায়ান ডে। আতঙ্ক আর শোকে চোখের পানি তখনো নামছে দুগাল বেয়ে, ‘প্রিন্সিপাল ডন হচস্প্রাং আর স্কুলের মনোবিদের সঙ্গে বৈঠক করছিলাম। আচমকা গুলি চলার শব্দ...!’ এভাবেই কেটেছে মৃত্যুর প্রহর গোনা। একসময়ে সব শান্ত হয়েছে। পুলিশ এসে নৃৃশংসতার ভয়াবহ অধ্যায়ে যবনিকা নামিয়েছে। টাটকা রক্তের স্রোত তখনো গড়াচ্ছে। বাচ্চাদের সে দৃশ্য দেখাতে চাননি শিক্ষিকারা। চোখ বন্ধ করতে বলেছিলেন সবাইকে। তার পর সার বেঁধে মৃত্যুপুরী থেকে বের করে এনেছেন সবাইকে। অনেকের প্রাণ বেঁচেছে কিন্তু মৃত্যুর এমন জীবন্ত সম্প্রসারণ শৈশবের হূদপিণ্ডে আতঙ্কের ইমারত গড়ে দিয়েছে। চোখ বুজলেই ফিরে আসছে সেই মুহূর্তগুলো। কানেক্টিকাট এখন রাত জাগছে শিশুদের কান্নায়। এই আতঙ্কের স্রষ্টা বন্দুকবাজ অ্যাডাম ল্যানজা ওই স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলেরই এক ছাত্রের বাবা। অ্যাডাম ল্যানজা মারা গেছেন নিজের গুলিতে। এ ছাড়া এক সন্দেহভাজনকে আটক করেছে পুলিশ। ধারণা—বন্দুকধারী একজন নয়, দুজন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী—অন্তত ১০০ রাউন্ড গুলি চলেছে। এক ছাত্রীর মা জানিয়েছেন—মুখোশপরা বন্দুকবাজ প্রথমে প্রিন্সিপালের ঘরে গিয়ে গুলি চালান। তার পরেই শুরু হয় তাণ্ডব। পুলিশ জানায়—অ্যাডাম ল্যানজার পরনে ছিল বুলেট-প্রুফ জ্যাকেট। দুই হাতে দুই বন্দুক। আমেরিকার স্কুল-কলেজে এর চেয়ে বড় ধরনের গুলি চালনার ঘটনা আর নেই। ২০০৭ সালের ১৬ এপ্রিল ভার্জিনিয়া টেকে এলোপাথাড়ি গুলিতে ৩২ জন মারা যায়। তবে প্রাথমিক স্কুলে এ রকম হামলা এই প্রথম। কী উদ্দেশ্যে বন্দুকবাজ এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করে সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। ক্যাপিটল হিলে পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। প্রশ্নের মুখে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন যারা ডেমোক্র্যাট, তাদের বেশির ভাগই মনে করেন লাগাম পড়া উচিত আগ্নেয়াস্ত্র কেনাবেচার মুখে। আর রিপাবলিকানরা মনে করেন, সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার পূর্ণ-অধিকার রয়েছে মার্কিনদের। মার্কিন পার্লামেন্টে বহুবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে দেশের অস্ত্র আইন। ‘ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন’ এবং অন্যান্য বহু আগ্নেয়াস্ত্রধারীদের সংগঠনের ভোটের কথা ভেবে একাধিকবার কড়া হতে গিয়েও ঢোক গিলে পিছিয়ে এসেছে সরকার। ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছর কড়া আইনে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে আমেরিকার অস্ত্র কেনা-বেচা। সময়সীমা পার হতেই যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন অনেকে। ১৯৯৪ সালে মার্কিন আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন ঘোষণা করা হয়। বলা হয়—যে কোনো ধরনের সেমি-অটোম্যাটিক আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিভিন্ন রকমের পিস্তল, পাম্প অ্যাকশন শটগান এবং বেশ কয়েক ধরনের রাইফেল এর আওতায় পড়ে যায়। কিন্তু ১৯৯৪ সালের আগে কেনা কোনো আগ্নেয়াস্ত্রই এই আইনের আওতায় পড়ল না। ১০ বছর পর ২০০৪ সালে নতুন অস্ত্র আইন বিলুপ্ত হলো। এর বদলে রইল ১৯৩৪ সালে পাস হওয়া জাতীয় অস্ত্র আইন এবং ১৯৬৮ সালের আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন। এদের মধ্যে প্রথম আইনটি আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি ও বিক্রির ওপর অস্ত্রনির্মাতাদের থেকে কর আদায় প্রযোজ্য হলো। ১৯৬৮ সালের অস্ত্র আইন ঠিক করে দেয় আমেরিকার মাটিতে কাকা আগ্নেয়াস্ত্র কেনার উপযুক্ত। এই আইনের বলে ৯ ধরনের মানুষ আগ্নেয়াস্ত্র কেনার অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হলেন। এদের মধ্যে রয়েছেন—এক বছর বা তার বেশি সময় জেল খাটা কয়েদি, মানসিক রোগী, অসত্ভাবে আমেরিকায় বসবাস করছেন এমন মানুষ, পারিবারিক জীবনে হিংসাত্মক কাজের রেকর্ড রয়েছে এমন ব্যক্তি এবং সেনাবাহিনী থেকে অসম্মানজনকভাবে বহিষ্কৃতরা। দেশের প্রতিটি বৈধ অস্ত্র বিক্রেতা তাদের বিক্রীত দৈনন্দিন হিসাব সংশ্লিষ্ট দফতরকে দিতে বাধ্য থাকবে বলে নির্দেশ জারি করা হয় সরকার থেকে। বলা হয়—প্রাপ্তবয়স্করা আগ্নেয়াস্ত্র কেনার অধিকারী ঠিকই, কিন্তু ১৮ বছর বয়স হলে তারা কেবল রাইফেল বা শটগানের মতো আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে পারবেন। রিভলভার বা পিস্তলের মতো ছোট মাপের অস্ত্র কিনতে গেলে বয়স অন্তত ২১ হতে হবে। ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ যে ১০ বছর আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ জারি ছিল, সেই ১০ বছরে বেপরোয়া গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা আমেরিকায় মাত্র একবারই ঘটেছিল। ১৯৯৯ সালের ২০ এপ্রিল এরিক হ্যারিস (১৮) ও ডিলান ক্লেবোল্ড (১৭) লিটলটনের কলম্বিয়ান হাইস্কুলে গুলি চালিয়ে খুন করে ১২ জন ছাত্রকে। পরে নিজেরাও আত্মহত্যা করে। এই ঘটনায় আহত হন ২৬ জন। অস্ত্র আইনের বাধা উঠে যাওয়ার পর ফের বাড়তে থাকে এই ধরনের অপরাধ। ২০১২ সালে এমন ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকটি। কলোরাডোর সিনেমা হলে, উইসকনসিনের গুরুদ্বারে, ওরেগনের শপিং মলে এবং কানেক্টিকাটের এই স্কুলে—তালিকা বাড়ছে ক্রমশই।