সরে যাচ্ছে রাশিয়া, পাল্টে যাচ্ছে আসাদের হিসাব

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩১
সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের মেরে শেষ করতে এবার চরম পথ বেছে নিল প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকার। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট আসাদের বাহিনী রাজধানী দামেস্ক থেকে স্কাড মিসাইল ছুঁড়েছে বিরোধীদের দিকে। এই হামলা সত্ত্বেও সিরিয়ায় বিরোধীশক্তি আরও মজবুত। এর কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে—সরকারের সঙ্গে থাকা একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী যোগ গিয়েছে বিদ্রোহীদের সঙ্গে। অবস্থা এমন বেগতিক দেখেই আসাদ কি আরও হিংসাত্মক হয়ে মিসাইল হানা শুরু করেছেন? গত শুক্রবার সকালেও সরকারি বিমানবাহিনী রাজধানী দামেস্কর বাইরে দারায়া ও মোয়াদামিয়েহ এলাকায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। তবে, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে বিদ্রোহীদের ওপর স্কাড মিসাইল ফেলার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছে সরকার। বিরোধীরাও ক্রমশ দামেস্কর বিভিন্ন এলাকার দখল নিতে শুরু করেছে। তবে এখনো রাজধানীর বেশির ভাগই রয়েছে আসাদের হাতে। কিছু দিন ধরে গুঞ্জন উঠেছে—সিরিয়ার আঘাত-প্রতিঘাতে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহূত হতে পারে। তাহলে কি মিসাইলেই মিশে আছে রাসায়নিক বিষ? এখনো অতটা আশঙ্কা করার মতো কিছু ঘটেনি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে জানা গেছে—প্রায় সাত-আটটা স্কাড মিসাইল এরই মধ্যে ছোড়া হয়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে—উত্তর কোরিয়ার তৈরি ‘হাসং-৬’ ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যবহার করা হচ্ছে। নিজেদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে উত্তর কোরিয়া গোপনে বেশ কয়েকটি দেশকে অস্ত্র বিক্রি করছে বলে আগেই জানতে পেরেছিলেন মার্কিন গোয়েন্দারা। সিরিয়ায় কোরীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহূত হওয়ার পর সেই সন্দেহ আরো জোরদার হলো। স্কাড ঘরানার এই ‘হাসং-৬’ মিসাইল ‘স্কাড’-এর প্রাথমিক সংস্করণের চেয়েও উন্নত। একেকটির ওজন প্রায় ৮২০ কিলোগ্রাম—৪৫০ মাইল দূরের কোনো লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করতে সক্ষম। নিজেদের বিমান বাহিনী থাকা সত্ত্বেও বিদ্রোহীদের দমন করতে কেন সিরিয়া যুদ্ধবিমান থেকে বোমা না ফেলে একেবারে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করল, তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। এ দিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। ১৩ নভেম্বর, ১৯৭০। সে দিন ‘কারেকটিভ রেভ্যুলেশন’ বা সংশোধনী বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বাবা হাফেজ আল-আসাদ। এর মাধ্যেমে সিরিয়ায় শুরু হয় আসাদ পরিবারের শাসন—যেটা এখনো চলছে। এই পরিবারের শাসনের প্রতিবাদে প্রায় দুই বছর আগে শুরু হয়েছে আন্দোলন। সিরিয়ার কারেকটিভ রেভ্যুলেশনের ৪২তম বার্ষিকী উপলক্ষে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন প্রেসিডেন্ট আসাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘কারেকটিভ রেভ্যুলেশনের ৪২তম বার্ষিকীতে আপনি ও আপনার দেশের মানুষকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আপনার চেষ্টার সফলতা কামনা করছি।’ আন্তর্জাতিক বিশ্ব সিরিয়া-সমস্যা সমাধানে একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সিরিয়ার কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসাদ সরকারের উপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। আপাতত সিরিয়ার সঙ্গ ত্যাগ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় দেখছে না রাশিয়া। আসাদের পতন আর দেয়ালের লিখন—দুটিই বেশ স্পষ্ট পড়তে পারছে তারা। চিন্তা একটাই—বহু কোটি মার্কিন ডলারের অস্ত্র ব্যবসা হয়তো লাটে উঠবে, পশ্চিম এশিয়ায় রুশ প্রভাবও কমে যাবে অনেকটাই। দুই ক্ষেত্রেই লাভ আমেরিকার। এ দিকে জাতিসংঘের হিসাবে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যাওয়া সিরীয় শরণার্থীর সংখ্যা পাঁচ লাখ পেরিয়ে গেছে। ব্রিটেনের ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ পত্রিকা তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে—সিরিয়ার বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের আকাশ ও নৌপথে সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা করছে ব্রিটেনসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব। এ জন্য ব্রিটেনের সামরিক প্রধান জেনারেল ডেভিড রিচার্ডস সম্প্র্রতি ফ্রান্স, তুরস্ক, জর্ডান, কাতার, আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে পত্রিকাটি তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে। কূটনীতিক পর্যায়ে সিরিয়া-বিরোধীদের এই তত্পরতার খবরের সঙ্গে যোগ হয়েছে মাঠপর্যায়ের বিদ্রোহীদের একটি সাফল্যের খবর। লন্ডন ভিত্তিক ‘সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস‘ জানিয়েছে—বিদ্রোহীরা আলেপ্পোর সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ সেনাঘাঁটিটি দখল করে নিয়েছে। রাশিয়ার নতুন অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা : সিরিয়া প্রসঙ্গে রাশিয়ার অবস্থান নিয়ে একাধিক সূত্রে ভিন্ন খবর প্রকাশ হয়েছে। কোনো কোনো সংবাদ সংস্থা বলছে—রাশিয়া তার অবস্থান পরিবর্তন করছে এবার। আবার কোথোও বলা হচ্ছে— আসাদকে সরানোর পক্ষে নয় রাশিয়া। রাশিয়া যদি সত্যিই সিরিয়ার সঙ্গত্যাগের পথে এগিয়ে যায়, তবে আসাদের জন্য ভয়াবহ ব্যাপার হবে। সেটা হবে সিরিয়া আর রাশিয়ার মধ্যে চার দশকের ‘মিত্রতা’র অবসান। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বাবা হাফিজ আসাদের আমলে শুরু হয়েছিল ওই ‘বন্ধুত্বের’ সম্পর্ক। গৃহযুদ্ধে সিরিয়ার বর্তমান সরকারের পরাজয় যে কেবলমাত্র সময়ের অপেক্ষা তা প্রকারান্তেরে স্বীকার করেই নিয়েছে রাশিয়া। ফাঁস ক্রমশ চেপে বসছে সরকারের ওপর। রাজধানী দামেস্কর সর্বত্রই শোনা যাচ্ছে কামানের প্রবল গর্জন। এমন অবস্থায় সিরিয়ার সঙ্গত্যাগ করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে আলোচিত হয়েছে। গত চল্লিশ বছরে সিরিয়াকে অন্তত কয়েক শ কোটি মার্কিন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে রাশিয়া। ভূমধ্যসাগরে সিরিয়ার বন্দর তারতুস এতদিন ছিল রাশিয়ার নৌ-ঘাঁটি। রাশিয়ার মাটির বাইরে তারতুস-ই ছিল একমাত্র রুশ নৌ-ঘাঁটি। এবার সব কিছুর মায়া কাটিয়ে মার্কিন চাপের কাছে নতি-স্বীকার করার মুখে রাশিয়া। প্রায় দুই বছরের গৃহযুদ্ধে বহুবার রাশিয়াকে সিরিয়ার সঙ্গত্যাগ করার অনুরোধ করেছেন মার্কিন কূটনীতিকরা। রাশিয়ার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মিখাইল বগদোনভ জানিয়েছেন—সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে এরই মধ্যে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ মারা গেছে। এত মানুষের জীবনের বিনিময়ে একজন প্রেসিডেন্টকে টিকিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। আসাদের উত্তরসূরি : দামেস্কর ইমাম মুয়াজ আল-খাতিবকেই আপাতত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের উত্তরসূরি বলে বেছে নিয়েছে একাধিক ইউরোপীয় দেশ। আল-খাতিবের পেছনে পূর্ণ সমর্থন রয়েছে আমেরিকারও। কয়েক দিন আগেই কাতারে আসাদ-বিরোধীদের এক বৈঠক হয়েছে। সেখানেও মান্যতা পেয়েছে বিরোধী জোট। তবে, রাশিয়া এই জোটকে সমর্থন করেনি। এমনকি, পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার যে দেশগুলোতে আমেরিকা-বিরোধী সরকার চলছে, তার অনেকগুলেতেই রাষ্ট্রপ্রধানদের এক এক করে ক্ষমতাচ্যুত করছে আমেরিকা এই বলে তীব্র নিন্দা করছে রাশিয়া। তবে আসাদের উত্তরসূরি বলে যাকে ভাবা হচ্ছে—সেই মুয়াজ আল-খাতিব অবশ্য রাশিয়ার সঙ্গে ‘আগের মতো’ সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী। কিন্তু পশ্চিমা মদতে তিনি মসনদে উঠলে কতটা স্বাধীনভাবে সরকার চালাতে পারবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন।