দু’সপ্তাহ ধরে ২০০টি দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে সনির্বন্ধ আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে ডিসেম্বরের ৭ তারিখ কাতারের দোহা শহরে শেষ হল বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন-২০১২ বা Conference of the Parties (COP18). ডিসেম্বরের ৬ তারিখ শেষ হবার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো সমঝোতা না হওয়ায়, সম্মেলনের সময়সীমা আরো একদিন বাড়িয়ে দেয়া হয়। অবশেষে শেষ ৩৬ ঘন্টা বিরামহীন আলাপ-আলোচনা চালিয়ে অনেকটা মুখ রক্ষা করার মতো একটা চুক্তি করে সম্মেলনের সমাপ্তি টানা হয়েছে। এখন দোহার জলবায়ু চুক্তির সারকথা খুব সংক্ষেপে নীচে তুলে ধরছি:
কিয়োতো প্রটোকল:. কার্বন নিঃসরণ কমানোর আইনগত চুক্তি কিয়োতো প্রটোকলের মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় জানুয়ারী ১, ২০১৩ সাল থেকে ২০২০ সালের শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন: স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ২০২০ সাল থেকে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থ প্রদানের ব্যাপারে পোল্যান্ডের ওয়ারশতে আগামী বছরের জলবায়ু সম্মেলনে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
লস এন্ড ড্যামেজ: জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাড়তি অর্থ বরাদ্দের জন্য ওয়ারশতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছে উন্নত বিশ্ব।
নতুন আইনগত চুক্তি: ২০১৫ সালের মধ্যে সব দেশের অন্তর্ভুক্তিসাপেক্ষে আইনীভাবে বাধ্যতামূলক একটি নতুন চুক্তি সম্পন্ন করার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেছে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সব দেশ। ২০২০ সালের পর এই চুক্তি কিয়োতো প্রটোকলকে প্রতিস্থাপন করবে।
তবে দোহার ফলাফল বিশ্বের জন্য খুব খুশির খবর বয়ে আনতে পারেনি। ইউরোপ ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশ, অস্ট্রেলিয়া এবং সুইজারল্যান্ডসহ কেবল ১০টি শিল্পোন্নত দেশ, কিয়োতো প্রটোকলের দ্বিতীয় মেয়াদের এই চুক্তি প্রতিসরণ (Ratifz) করতে সম্মত হয়েছে। যা সত্যিই হতাশাব্যঞ্জক। আমেরিকার কানেক্টিকাট ওয়েসলিয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল ডরসি দোহা চুক্তিকে আমাদের প্রিয় পৃথিবীর জন্য রীতিমত একটি “কফিন” বলে সতর্ক করে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কার্বন নির্গমনের হার ৩.২ শতাংশ বেড়ে গিয়ে এ বছর রেকর্ড ৩১.২ গিগাটনে এসে দাঁড়িয়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ বর্তমান হারে বাড়তে থাকলে, পৃথিবীর উষ্ণতা এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ শিল্পবিপ্লব পূর্বের তুলনায় প্রায় ৩.৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেশি হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশি বাড়লে মানব জাতির জন্য তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হল বাংলাদেশ। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী সমুদ্রতল প্রতি বছরে গড়ে ১ ইঞ্চি করে বেড়ে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে ৩০০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এক-চতুর্থাংশ ভূমি সমুদ্রের গর্ভে হারিয়ে যাবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে লাখ লাখ মানুষ। সুন্দরবনে গরান গাছের সারি সাইক্লোন ও ঝড়ের সময় প্রতিবন্ধক হিসাবে কাজ করে। সমুদ্রতল বেড়ে যাবার ফলে বাংলাদেশের অহংকার সেই সুন্দরবন ২২০০ সালের মধ্যে তলিয়ে যাবার আশংকা করছেন বিজ্ঞানীরা। দোহা সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সংগঠন “Climate Vulnerable Forum (CVF)”-এর বৈঠকে ফোরামের বর্তমান চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ দাবী করেছে এবং পরিবেশজনিত ক্ষতি পুষিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় অভিযোজন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত অর্থায়ন করার তাগিদ দিয়েছে।
দোহা জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের সরব উপস্থিতি এবং অর্জন ছোট করে দেখার মত নয়। “লস্ এন্ড ড্যামেজ”-এর ক্ষেত্রে ফোরামের নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ। “লস্ এন্ড ড্যামেজ”-এর উদ্দেশ্য হল জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়-ক্ষতি থেকে আলাদা করে স্বল্পমেয়াদী বিপর্যয়গুলোর ক্ষেত্রে একটি বিশেষ তহবিল থেকে দ্রুত অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। উন্নত দেশগুলো এই যুক্তি মেনে নিয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের সাফল্যই বলতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হল বাংলাদেশ। তাই জলবায়ু তহবিল থেকে বড় অংকের অর্থ পাওয়াটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু সম্প্রতি পদ্মা সেতু নিয়ে যা ঘটে গেলো, সেই প্রেক্ষিতে জলবায়ু তহবিল থেকে প্রাপ্ত অর্থ দুর্নীতির কালো থাবা থেকে রক্ষা করে সঠিক প্রকল্পে যথাযথ ব্যয় করাটাই এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে হচ্ছে।
লেখক :সিডনী প্রবাসী প্রকৌশলী
