পলান পাড়ই-এর ১৬ ফুট আয়তনের ঘরের উত্তর দিকের প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত অবধি প্রায় হাতখানেক ফাঁকা জায়গা দিয়ে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। তার নিচের আরও এক হাতের মতো জায়গার ফাটলটা এমন যে, মনে হয় যে কোনো সময় ঘরটি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। বাঁশের আড়ায় ঝুলছে তেল চিটচিটে কয়েকটা কাঁথা, একই রকমের কভার ছাড়া বালিশ। এক কোণে কয়েকটা হাড়িপাতিল ও কলস এবং একটা কেরোসিনের কুপিবাতি। ঘরের মধ্যে বিভাজন বলতে দুই ফুটের মতো মাটির গাঁথুনি। এর দুই পাশে স্ত্রী ও একজন করে সন্তান নিয়ে থাকেন পলান পাড়ই-এর দুই ছেলে। পলান পাড়ই নিজের স্ত্রীকে নিয়ে রাত কাটান বারান্দার একপাশে। অন্যপাশে ঘুমান যৌতুক দিতে না পারার কারণে স্বামী পরিত্যক্তা মেয়েটি। ৯ সদস্যের এই যৌথ পরিবারের দুই ছেলে গেছে কুচো চিংড়ি ধরতে। কপাল ভালো হলে কুচো মিললে তা বিক্রি করে বাজার থেকে আনা যাবে চাল-নুন। তবেই চুলো জ্বলবে, না হলে সবারই দিন কাটবে উপোসে।
পলান পাড়ই-এর ঐ ক্ষুদ্রাকৃতির বাড়িটি যশোর শহর থেকে পশ্চিমে ১৫ কিলোমিটার দূরে জগহাটি গ্রামে অবস্থিত। সদর উপজেলার জগহাটি গ্রামে বাস করেন ১২০ পাড়ই পরিবার। বংশপরম্পরায় তাদের সবাই মত্স্যজীবী হলেও প্রভাবশালীদের থাবা তাদের একমাত্র পেশাকে বিপন্ন করে তুলেছে। ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ নয়—প্রায় না খেয়ে থাকা কিংবা একবেলা বড়জোর দুইবেলা খাওয়া ছেলে-বুড়ো থেকে শুরু করে পরিবারের সবারই নিয়মিত অভ্যাস। সভ্যতা কতটা সংকটে তা পাড়ইদের জীবন যাপন না দেখলে বোঝা যাবে না।
সমপ্রতি খুব ভোরে পাড়ইপাড়ায় পৌঁছে সবাইকে দেখা গেল কাঠের কয়লা দিয়ে দাঁত মাজতে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার কাজটি তারা আগেই সেরে ফেলেছেন—ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই, পাশের খালপাড়ে। অধিকাংশের শরীরে শীতের কাপড় নেই। আগুন জ্বেলে শীত নিবারণের চেষ্টায় বয়স্ক ও শিশুরা। অপেক্ষার প্রহর গুনছেন স্ত্রীরা— স্বামী কখন ফিরবেন সওদা নিয়ে! বয়স্করা কেউ কোনোদিন স্কুলে পড়েননি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা একটি এনজিও’র স্কুলে লেখাপড়া করে। হাতেগোনা কয়েকজন জগহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়। সেখানে ছোটদের সহপাঠীরা মারধর করে পাড়ই বলে। এজন্য অনেকে লেখাপড়াও ছেড়ে দিয়েছে। যে কজন যায় তাদের বড় আকর্ষণ প্রতিদিন ৭৫ গ্রাম প্যাকেটের বিস্কুট! ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র বিষ্ণু দেব বেলা সাড়ে ১১টায় স্কুলে যায় কোনোদিন খেয়ে কোনোদিন না খেয়ে। ৪টায় ছুটির পর বাড়ি ফিরে কোন কোনদিন ভাত পেলেও অনেকদিন না খেয়েই কাটাতে হয়। এই পল্লীর সর্বোচ্চ শিক্ষিত সুবল ও কাকলী বেলতলা স্কুলের ৭ম শ্রেণীতে পড়ালেখা করে।
পাড়ই পল্লীতে বেড়ে চলেছে বিয়েযোগ্য মেয়েদের সংখ্যা। মুরব্বিদের সবারই অভিন্ন বক্তব্য: বিয়ে না হওয়ার একমাত্র কারণ যৌতুক। চাহিদামতো যৌতুক দিতে পারছে না বলেই মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে না। নিজেরা যেখানে খেতেই পান না সেখানে যৌতুক দেবেন কি করে? বিয়ের সময় প্রতিশ্রুত যৌতুক দিতে না পারার কারণেই পলান পাড়ই-এর মেয়েকে ফিরতে হয়েছে বাবার ঘরে। হরিদাসি বললেন, তার একটা মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ভারতে বিনা যৌতুকে। একটা মেয়েকে ভিক্ষে করে ৩০ হাজার টাকা পণ দিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। তার চিন্তা এখন একটাই আর একটা মেয়েকে তিনি বিয়ে দেবেন কিভাবে? আরও একটি মর্মান্তিক বিষয় জানা গেল তাদের কাছ থেকে। বিয়ে না হওয়া এসব তরুণী প্রায়ই নির্যাতিত হচ্ছে সন্ত্রাসী আর প্রভাবশালীদের দ্বারা। প্রায়ই দুর্বত্তরা হানা দেয় পাড়ইপল্লীতে। ধর্ষিতা তরুণীর হাহাকারে বাতাস ভারি হয়ে আসে। কিন্তু কিছুই যে করার নেই তাদের অভিভাবক কিংবা পল্লীর কর্তাব্যক্তিদের। রাতের জগহাটি বাঁওড়পাড় যে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য।
যেভাবে সংকটের শুরু
বংশপরম্পরায় জগহাটি বাঁওড়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন পাড়ই সমপ্রদায়ের মানুষেরা। সাজিয়ালির জমিদার রাহা বাবু ভারতে যাবার আগে বাঁওড় দাখিলা করে দিয়ে যান পাড়ইদের। কিন্তু ৬০-এর দশকে সুধীর ঘোষ নামে এলাকার প্রভাবশালী এক ব্যক্তি জালিয়াতির মাধ্যমে বাওড় বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ পাড়ইদের। বাঁওড় বেহাত হবার পর থেকেই নতুন সংগ্রাম শুরু হয় পাড়ইদের। আবাদী পাড়ই বাদী হয়ে বাঁওড় জালিয়াতির বিরুদ্ধে মামলা করেন। তিন পুরুষ হাইকোর্ট পর্যন্ত মামলা লড়ে আবাদী পাড়ই-এর নাতি হরি পাড়ই রায় পান। তবে রায় আসে সরকারের পক্ষে। বাঁওড়টি এখন সরকারি সম্পত্তি। বিএনপি সরকারের সময় বাঁওড়টি দখলে নিয়ে প্রভাবশালীরা পাড়ইদের ভিটে থেকেও উচ্ছেদের চেষ্টা চালায় বলে তারা অভিযোগ করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বাঁওড়ের দখল দেয়া হয়নি তাদের। সরকারি দলের লোকেরাই লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে। মাছ তাদের দিয়ে ধরায়। ভাগও দেয় কিছু। কিন্তু পাড়ইরা চান বাঁওড়ের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব, ‘জাল যার জলা তার’ নীতির বাস্তবায়ন।
