বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চরিত্রের যে ধারাবাহিকতা তা আবার লক্ষণীয়। বিএনপি জামায়াতসহ সমমনা রাজনৈতিক দল নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলে। ঘটনার পরিক্রমায় বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিএনপি তথা চার দলীয় ঐক্য জোট ক্ষমতায় বসে। এই জোটের মেয়াদ শেষ হতে না হতে তারা অর্থাত্ ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনকে তাদের অনুকূলে নেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসনকে মনের মাধুরি দিয়ে সাজিয়ে তোলে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগসহ সমমনা রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন করেন এবং শুরু হয় নতুন মহাযজ্ঞ রাজনৈতিক লীলা-খেলা।
সিইসি আজিজ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইয়াজ উদ্দিন আহমেদকে প্রধান ইস্যু হিসেবে গ্রহণ করে লগী ও বৈঠার সমন্বয়ে আন্দোলন বেগবান করে। দুটি বৃহত্ দল নিরপেক্ষতার প্রশ্নে যখন এক হতে না পারে তখন দেশে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি দেখা দেয়। ক্রমান্বয়ে যখন অবস্থা শোচনীয় তখন রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি করেন। স্থিতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে বহিঃশক্তির প্রভাবে, দেশের সুশীল সমাজের ভূমিকায় গঠন হয় ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যার পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে সামরিক বাহিনীসহ দেশি-বিদেশি উচ্চমহল।
এর ঠিক কয়েক মাস আগে সাবেক প্রভাবশালী মর্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস ঘোষণা দিয়েছিলেন, দুটি বৃহত্ দলের ঐকমত্য না হলে তৃতীয়শক্তি আসার আশু সম্ভাবনা। এর ধারাবাহিকতায় অদৃশ্য মহলের প্রভাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় চেষ্টা চালিয়েছিল মাইনাস ওয়ান ও মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নে তৃতীয় শক্তির আগমন।
গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী দুই নেত্রীকে বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে নেয়া হয় কারাগারে। বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে আসা হয় বড় বড় দুর্নীতবাজদের। সামরিক বাহিনীর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে ফখরুদ্দীন সরকার যদিও জনমনে আশার সঞ্চয় জাগিয়েছিল তথাপি নির্বাচন ও মাইনাস ফর্মুলা নিয়ে। দুই নেত্রীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বহিঃশক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেশের প্রথিতযশা ও সুশীল সমাজের সমাজপতিদের দ্বারা ভিন্নধারা বা তৃতীয়শক্তির আগমন লক্ষ্য করা যায়। অবশেষে বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ফখরুদ্দীন সরকার ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন দিতে প্রস্তুত হয়। উক্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার ঐতিহাসিক রেকর্ডকৃত ৩০৫টি আসন নিয়ে সংসদে বিশাল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর মহাজোট সরকার মন্ত্রিসভা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনায় স্বীকার হন। মহাজোট সরকারের অন্যতম আলোচনার বিষয়বস্তু হল পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলুপ্তি ঘোষণা করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনী বিল পাস। এই বিষয়কে কেন্দ্র করে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ইস্যু করে বিএনপি সমমনা দল রাজপথ প্রকম্মিত করে তুলছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে যখন বৃহত্ দুই দলের অনড় অবস্থান ঠিক তখন বাংলার রাজনীতির আকাশে ধূমকেতুর মত আবির্ভাব হয় ভিন্ন ধারার জোট গঠনে তথা তৃতীয় শক্তির। বিভিন্ন দলের দলছুট নেতারা সুযোগ কাজে লাগানোর প্রয়াসে অনুসন্ধিত্সু। গণফোরামের সভাপতি ও বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম রূপকার ড. কামাল হোসেন, বিকল্পধারার সভাপতি ও বিএনপির সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদদোজ্জা চৌধুরী, এলডিপির অলি ও সমমনা দল নিয়ে জোটের ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে (কামাল ও চৌধুরী) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন হোটেল র্যাডিসনে। কিন্তু জনগণের সেবা, সাংগঠনিক ক্ষমতার প্রসার, তৃণমূলের নেতৃত্ব ইত্যাদি না করে র্যাডিসন হতে তাদের কাঙ্ক্ষিত বাণী কতটুকু জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে তা আজ সচেতন নাগরিক হিসেবে ভাবনার বিষয়।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বৃহত্ দুই দল যদি সিদ্ধান্তে না আসে তা হলে উদ্ভূত পরিস্থিতি কি আমাদের তৃতীয় শক্তির দিকে সহায়তা করবে নাকি ঐতিহ্য মেনে চলবে জাতির বিবেকের নিকট একটি প্রশ্ন? এরশাদের পৃথক আসন বণ্টন, জামায়াতের যুদ্ধাপরাধের বিচারে আটকে রাখা, বিএনপির শরীক দল জামায়াত নিয়ে সংশয়, ভারত সফরে প্রতিশ্রুতি। মহাজোট সরকারের ভূমিকা সর্বোপরি সব দলের ঐকমত্য না হওয়া ও নির্বাচন নিয়ে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের প্রশ্নে জনমনে আতংক। এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবার কি কোন ১/১১ আবির্ভাব আমাদের তৃতীয় কোন শক্তির অশনি সংকেত নিয়ে আসতে পারে?
লেখক :রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, কবি জসিমউদ্দীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Email: [email protected]
