রাজনৈতিক ব্যক্তি বাদ দিয়েই দুর্নীতির ষড়যন্ত্র মামলা

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৫
দীর্ঘ নাটকীয়তার পর রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়েই পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র মামলার এজাহার দায়ের হয়েছে। এজাহারে তিনজন বিদেশি এবং পদ্মা সেতু প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত চার সরকারি কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। তবে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, এসএনসি লাভালিনের সাবেক কর্মকর্তা রমেশ শাহ্র নোটবুকে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে পারসেন্টেজ (কমিশন) প্রদানের বিয়ষটি উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু পরিপূরক সাক্ষ্য সংগ্রহ করতে না পারায় এজাহারে তাদের নাম রাখা হয়নি। এজাহারে আরো বলা হয়, তাদের অপরাধের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তকালে খতিয়ে দেখা হবে। এদিকে বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল গত ৫ ডিসেম্বর ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের জন্য দুদক কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেয় এবং একই সাথে জানিয়ে দেয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ‘সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ’ তদন্ত না করা পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন করবে না বিশ্ব ব্যাংক। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব ব্যাংকের ওই পরামর্শকে আমলে না নিয়েই দুদক এজাহার দায়ের করলো। গতকাল সোমবার বেলা আড়াইটায় রাজধানীর বনানী থানায় সাতজনের বিরুদ্ধে এ মামলাটি (১৯ নম্বর) দায়ের করা হয়। দুদকের সিনিয়র উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আবু জাহিদ এ মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, আসামিরা পারস্পরিক যোগসাজশে ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্র করার মাধ্যমে পদ্মা সেতু প্রকল্পের তদারকি পরামর্শকের কাজ এর অন্যতম দরদাতা এসএনসি লাভালিন ইন্টারন্যাশনালকে পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে। এসএনসি লাভালিন ওই কার্যাদেশ পেলে ‘ঘুষ লেনদেন সম্পন্ন হতো’ বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় আসামিরা হলেন- সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র মূল্যায়নে গঠিত কমিটির সদস্য সচিব কাজী ফেরদৌস, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের, এসএনসি-লাভালিনের স্থানীয় এজেন্ট মো. মোস্তফা এবং এর ৩ কর্মকর্তা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস, আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ ও সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইল। এই সাতজন আসামির ব্যাপারে এজাহারে বলা হয়, আসামিরা ১৬১ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় অপরাধ করার অভিপ্রায়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করেন। যা দণ্ডবিধির ১২০ (বি) ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মামলার এজাহারে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে, দরপত্র প্রক্রিয়াকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে তত্কালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, কানাডিয়ান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিন ও অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাক্ষাত্ দেন। এসএনসি লাভালিনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাবেক মন্ত্রীর সাক্ষাতের ক্ষেত্রে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী যোগাযোগ স্থাপনকারীর ভূমিকা পালন করেন। তাছাড়া রমেশ শাহ’র নোটবুকে কাজ পাওয়ার পর পদ্মা পিসিসি (প্রজেক্ট কমার্শিয়াল কস্ট/প্রজেক্ট কমিটমেন্ট কস্ট) হিসাবে দরপত্র মূল্যের বিভিন্ন পার্সেন্টেজ (কমিশন) প্রদানের হিসাবে তাদের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। তবে আলোচ্য ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত অপরাধ সংঘটনে আবুল হোসেন চৌধুরী ও সৈয়দ আবুল হাসানের ভূমিকা রাখার বিষয়ে অপরাপর সাক্ষীদের সাক্ষ্য বা পরিপূরক সাক্ষ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। অপরাধ সংঘটনে সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল হাসান চৌধুরীর অপরাধ সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তকালে খতিয়ে দেখা হবে। মামলার বাদী দুদকের সিনিয়র উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আবু জাহিদ বলেন, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে বারবার কমিটি পরিবর্তনকে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। এক্ষেত্রে সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া দাফতরিক ক্ষমতাবলে কমিটি পরিবর্তন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, অনৈতিক অভিপ্রায়ে বারবার কমিটি পরিবর্তন করা হয়েছে। তাছাড়া সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র মূল্যায়নে গঠিত কমিটির সদস্য সচিব কাজী ফেরদৌস, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের এসএনসি লাভালিনকে কাজ দেয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে ইমেলে তথ্য আদান প্রদান করেছেন। এসব প্রমাণ দুদকের কাছে থাকায় দুদক তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। তিনি আরো বলেন, রমেশ শাহ্র ডায়েরিতে কি লেখা রয়েছে, তা আমরা শুনে থাকলেও এ সংক্রান্ত কোন তথ্য সংগ্রহ করতে পারিনি এমনকি রমেশ ও ইসমাইলের সঙ্গে আমরা কথা বলতে পারিনি। এসব কারণে মামলায় ‘সন্দেহভাজন’ বলে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘সন্দেহভাজন’ শব্দটি এজাহারে না থাকলে কেন বলা হচ্ছে, জানতে চাইলে উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আবু জাহিদ বলেন, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর ব্যাপারে মৌখিক অভিযোগ রয়েছে; তবে কোন দালিলিক প্রমাণ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার তদন্তকালে তাদের দুইজনের ব্যাপারে অধিকতর খতিয়ে দেখা হবে বলেই সন্দেহভাজন শব্দটি বলা হলো। মামলার তদন্ত কতদিনে শেষ হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুদকের নিয়ম অনুযায়ী ৪৫ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ৪৫ কার্যদিবসের সঙ্গে আরো ১৫ কার্যদিবস যোগ হতে পারে। এ কারণে বলা যায়, আগামী ৬০ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ হবে। এদিকে দুদকের আইনজীবী আনিসুল হক বলেন, গত ৫ ডিসেম্বর বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের জন্য দুদক কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেন। কানাডীয় কোম্পানি এসএনসি লাভালিনের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে ২৯১ কোটি ডলারের পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্থগিত করে বিশ্ব ব্যাংক। এরপর আবুল হোসেনের পদত্যাগ, প্রকল্পের ইন্টেগ্রিটি অ্যাডভাইজার ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মসিউর রহমান এবং সেতু বিভাগের তত্কালীন সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়াকে ছুটিতে পাঠানোসহ সরকারের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করায় বিশ্বব্যাংক সিদ্ধান্ত বদলায়। এদিকে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ার পর অনুসন্ধান পর্যায়ে সৈয়দ আবুল হোসেন, আবুল হাসান, মোশাররফ হোসেনসহ ২৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুর্নীতি দমন কমিশনের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন প্রকল্পের ইন্টেগ্রিটি অ্যাডভাইজর ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মসিউর রহমান, সাবেক প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম, জাতীয় সংসদের হুইপ নূর আলম চৌধুরী লিটনের ভাই নিক্সন চৌধুরী ও এসএনসি-লাভালিনের স্থানীয় এজেন্ট জিয়াউল হক। এছাড়া প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন কমিটির প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. আনম সফিউল্লাহ, পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ, সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী তরুণ তপন দেওয়ান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মকবুল হোসেন, ইস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের পরিচালক মো. দলিল উদ্দিন ও সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (নদী শাসন) কাজী মো. ফেরদৌসও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন। তদন্ত শুরুর পর দুদক দীর্ঘদিন দুর্নীতির কোনো তথ্য প্রমাণ না পাওয়ার কথা বললেও গত ২৭ নভেম্বর তদন্তকারী এ সংস্থার চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সাংবাদিকদের বলেন, পদ্মা প্রকল্পের কাজ পেতে ‘ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রে’ প্রমাণ পেয়েছেন অনুসন্ধানকারী প্যানেল। দুদকের জ্যেষ্ঠ উপ-পরিচালক আবদুল্লাহ-আল জাহিদ, মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী, গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী ও উপ-পরিচালক মির্জা জাহিদুল আলমকে নিয়ে গঠিত ওই ‘অনুসন্ধান প্যানেল’ গত ৪ ডিসেম্বর কমিশনে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, তাতে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করা হয়। ঠিক কতোজনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ এসেছে- সে সময় তা না জানালেও গোলাম রহমান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ওই সংখ্যা ১০ এর কম। অনুসন্ধান প্যানেলের ওই প্রতিবেদন নিয়ে গত ৫ ডিসেম্বর বিশ্ব ব্যাংকের তিন পর্যবেক্ষকের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেন দুদক কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকের পর দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, দুর্নীতির ‘ষড়যন্ত্র’ যে হয়েছিল, সে বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংক ও দুদক ‘একমত’ হলেও কার কার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে- সে বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি। শেষ পর্যন্ত ঐকমত্য ছাড়াই ঢাকা ছাড়েন বিশ্ব ব্যাংকের পর্যবেক্ষক ওকাম্পো ও তার সঙ্গী টিমোথি টং ও রিচার্ড অল্ডারম্যান। এরপর ৮ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে বিশ্ব ব্যাংক সাফ জানিয়ে দেয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ‘সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ’ তদন্ত না করা পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন করবে না বিশ্ব ব্যাংক।