ব্যাংকিং খাত থেকে নগদ টাকার প্রবাহ কমিয়ে নিতে নতুন কৌশল নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই কৌশলের কারণে এমনিতেই তারল্য সংকটে থাকা দেশের ব্যাংকিং খাত আরো বেশি তারল্য সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নতুন নির্দেশনা কার্যকর করার কয়েকদিন পর ফ্যাক্স মারফত ব্যাংকগুলোকে তা জানানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে আটটি বাণিজ্যিক ব্যাংক নগদ জমা সংরক্ষণ বা সিআরআর সংকটে পড়ে যায়। এমনকি ভাল কিছু ব্যাংকও সিআরআর সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়নি বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র বলেছে, বাস্তবতা বিবেচনা না করে নানা রকম নির্দেশনা দেয়ায় ব্যাংকিং খাতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে । তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সুধীর চন্দ্র দাস বলেছেন, ব্যাংকগুলোর প্রণোদনার সময় কমিয়ে দেয়ার বিষয়ে যে সার্কুলার দেয়া হয়েছে তা অত্যন্ত সাময়িক। মুদ্রা বাজার স্থিতিশীল রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মুদ্রানীতিতে রিজার্ভ মানি যতটুকু থাকবে বলে মনে করা হয়েছিল তারচে বেড়ে যাওয়ার কারণে নতুন এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি জড়িত। এছাড়া টাকার তুলনায় ডলারের মান ঠিক রাখাও আরেকটি উদ্দেশ্য। আর নতুন সার্কুলারের কারণে সিআরআর রাখতে সমস্যা হচ্ছে এ রকম কোন তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নেই বলে জানান তিনি। এক-দুই সপ্তাহ পরে এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে। তখন পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে বলেও তিনি জানান।
সূত্র মতে, এ বছরের ৩০ জানুয়ারি জারি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেজারি বিল ও বন্ডের ফেস ভ্যালু বা অভিহিত মূল্যের উপর যথাক্রমে ১৫ শতাংশ ও ৫ শতাংশ মার্জিন প্রয়োগ করে অভিহিত মূল্যের অবশিষ্ট অর্থ তারল্য সহায়তা হিসাবে ডিলার ব্যাংকগুলোকে প্রদান করবে। কিন্তু গত ১২ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৫ ও ৫ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ মার্জিন রেখে দিচ্ছে। অর্থাত্ ১শ’ টাকার ট্রেজারি বিলের বিপরীতে ৫ শতাংশ মার্জিন রেখে ৯৫ টাকা এবং ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে ১৫ শতাংশ মার্জিন রেখে ৮৫ টাকা ব্যাংকগুলোকে সরবরাহ না করে ২০ শতাংশ মার্জিন রেখে ৮০ টাকা দিচ্ছে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগাম কিছু জানায়নি। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়। এ সিদ্ধান্তের কথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগেভাগে না জানানোয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অর্থ সংকটে পড়ে যায়। সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, সিআরআর রাখতে ব্যর্থ হয় ৮টি ব্যাংক।
একইভাবে প্রাইমারি ডিলার (পিডি) ও ননপিডি ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে সময় কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে যেখানে ট্রেজারি বিল বা বন্ড নিলামে সফল দরদাতাদের প্রণোদনা হিসাবে এক নাগাড়ে দুই মাস ১৫ দিন পর্যন্ত তারল্য সহায়তা দিত; বাংলাদেশ ব্যাংক এখন তা কমিয়ে দুই মাস করেছে। সিকিউরিটিজের বিপরীতে ইস্যুর তারিখ থেকে এক নাগাড়ে সর্বোচ্চ দুই মাস পর্যন্ত তারল্য সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দিয়ে বলা হয়, সাময়িক এ ব্যবস্থা শিগগিরই কার্যকর হবে। গত ১২ জানুয়ারি থেকে এ ব্যবস্থা কার্যকর করা হলেও ব্যাংকগুলোকে গতকাল ১৭ ডিসেম্বর ফ্যাক্সযোগে জানানো হয়েছে। ফলে সংকটাপন্ন তারল্য বাজারে যতটুকুই স্থিতিশীলতা ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর প্রভাব পড়বে ব্যাংকগুলোর ক্যামেলস রেটিংয়েও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, মূলত ব্যাংকগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে চাপে রাখতেই এটি করা হয়েছে। যারা সিআরআর সংরক্ষণ করতে পারেনি সেসব ব্যাংক চাপে থাকবে। পরবর্তীতে যেকোন অভিযোগে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে। এমনকি ওইসব ব্যাংককে মার্জার ও ইকুইজিশন নীতি বাস্তবায়নেও চাপ দিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তথ্য মতে, সরকারের যখন ঋণের প্রয়োজন হয় তখন ব্যাংকগুলো থেকে নিলামের মাধ্যমে সরকার ঋণ নিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ নিলামের ব্যবস্থা করে। আর সরকারের ঋণ চাহিদার বিপরীতে যেসব ব্যাংক নিলামে অংশ নিয়ে ঋণ সরবরাহ করে তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে শুধুমাত্র প্রাইমারি ডিলার (পিডি) ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কেউ ওই নিলামে অংশ নিতে পারতো না। তবে চলতি বছরের ২৪ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকগুলো ছাড়া সব ব্যাংককেই বাধ্যতামূলক সরকারের ঋণ দেয়ার নির্দেশনা দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে বলা হয়, সরকারের ঋণ চাহিদা মেটাতে প্রথমে ১২টি পিডি ব্যাংকের মধ্যে নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে পিডিরা ব্যর্থ হলে অনার্জিত অংশের ৬০ শতাংশ আবার বাধ্যতামূলক পিডিদের সরবরাহ করতে হবে। যার ৩০ শতাংশের জন্য আবার নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। বাকী ৩০ শতাংশ সবার মধ্যে বণ্টিত হবে। অনার্জিত অংশের বাকি ৪০ শতাংশ দিতে হবে নন-পিডি ২৫টি ব্যাংককে। তবে পিডিদের মধ্যে যে ৩০ শতাংশের নিলাম অনুষ্ঠিত হবে সেখানে নন-পিডিরাও অংশ নিতে পারবে। এজন্য তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ তারল্য সুবিধা নিতে পারবে। প্রসঙ্গত, সরকারের সিকিউরিটিজ (ট্রেজারি বিল ও বন্ড) ক্রয়ের নিলামে অংশগ্রহণের জন্য যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হয় সেগুলোই পিডি হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে ১২টি ব্যাংক ও ৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিডি হিসেবে কাজ করছে।
