মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:২০
বঙ্গবন্ধুর ডাকে এক হয়েছিল বাংলার সব সন্তান। এক হয়েছিল ছাত্র, শিক্ষক, যুবক, কৃষক, শ্রমিক, তাঁতী, জেলে, কামার-কুমোর, রাজনীতিক, চিকিত্সক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, তথা স্বাধীনতাকামী সকল বাঙালি। দেশমাতৃকার টানে পাকিস্তানি বাহিনীতে কর্মরত সৈনিকেরাও বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন অবসরপ্রাপ্ত দুই বাঙালি কর্নেল আতাউল গনি ওসমানি ও মো. আব্দুর রব এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে খন্দকার। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার দায়িত্ব নেন তত্কালীন মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর রফিক-উল-ইসলাম, মেজর এটিএম হায়দার, মেজর নূরুজ্জামান, মেজর সি আর দত্ত, মেজর মীর শওকত আলী, উইং কমান্ডার কে. এম বাশার, মেজর কাজী নূরুজ্জামান, মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, মেজর এম. এ মনজুর, মেজর এম. এ জলিল, মেজর আবু সালেক চৌধুরী, মেজর আবু তাহের ও ফ্লা. লে. এম হামিদুল্লাহ। নয় মাসে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রায় এক লাখ মানুষ প্রিয় ভিটা-মাটি ফেলে উদ্বাস্তু হয়েছিল ভারতে। রক্তপিপাসু হায়েনারা রক্তের নেশায় ছিল মত্ত। এদেশের বিবেকহীনদের হাত করে সৃষ্টি করে দালাল। যারা বাংলার মাটির কলঙ্ক, তারা নানাভাবে তাদের সহায়তা করে। এদেশের সোনার সন্তানদের ধরিয়ে দিয়েছিল পাকসেনাদের হাতে। আর পাকসেনারাও নারী, শিশু, কিশোর নির্বিশেষে হত্যা করেছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের। একজন নয়, দুই জন নয় একেবারে ত্রিশ লাখ বাঙালি। আর এ জন্যই বাংলার প্রতিটি অঞ্চলে, প্রতিটি গ্রামে একাত্তরের স্মৃতিসৌধ মাথা উঁচু করে গৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের অন্তরের ঘৃণা ও ধিক্কার আজও জ্বলছে সেদিনের মতো। স্বাধীনতা শত্রুদের আজও আমরা ধিক্কার জানাই। আর কখনোই ভুলতে পারবো না স্বদেশের জন্য প্রাণপ্রিয়, বীর সন্তানদের। মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ উত্সর্গ করেছেন ত্রিশ লাখ মানুষ। বিশ্বের ইতিহাসে এমন ঘটনা আর কোথাও দেখা যায় না। এদের মধ্যে পুলিশ, ইপিআর, ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, আনসার, মুজাহিদ, ছাত্র, শিক্ষক— শিক্ষিকা, শ্রমিক, কৃষক, রাজনীতিক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী তথা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ রয়েছেন। নিখোঁজ হয়েছেন বাংলার বহু কৃতী সন্তান। আমাদের দেশে নারী শিক্ষার জন্য অগ্রপথিক রণদা প্রসাদ সাহা ও তার পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহাকে হানাদার বাহিনীরা নিয়ে যায়। আজ অবধি তারা ফেরেননি। এমনিভাবে ফেরেননি বাংলার এক অমূল্য রতন জহির রায়হান। প্রতিবাদ করেছেন বলে প্রাণ হারিয়েছেন ডা. জোহা ও কিশোর মতিউর। আরও কত বাংলার সোনার সন্তান প্রাণ দিয়েছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। পাকিস্তানিরা জানতো কোনো দেশকে নিঃশেষ করতে সর্বপ্রথম তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে হয়। তাই তো বাংলার শিক্ষক-ছাত্রদের সমূলে ধ্বংস করতে চেয়েছিল পাকসেনারা। আজ সেই মহান শহীদদের রক্তের বিনিময়েই আমরা স্বাধীনতা ভোগ করছি। আমাদের এই যে পতাকা, এই যে মানচিত্র ও স্বরাজ, তা কিন্তু ত্রিশলাখ তাজা রক্তেরই দান। এ রক্তের পতাকা যতদিন বাংলাদেশে উড়বে, বাঙালি থাকবে, ততোদিন ঋণী হয়ে থাকতে হবে। এ ঋণ অপরিশোধ্য। তাইতো আজও আমরা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধে শাহীদ বুদ্ধিজীবীদের। আজও গভীর শ্রদ্ধাভরে পালন করি ১৪ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালে দেশ শক্রমুক্ত হওয়ার পর, মুক্তিযুদ্ধে যারা বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন, আত্ম উত্সর্গ করেছেন এবং বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছেন, তাদের জাতির পক্ষ থেকে আলাদাভাবে সম্মান ও মর্যাদা দেয়া হয়। আমরা জানি, ‘মুক্তিযোদ্ধারা বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তান’। বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিতকরণ এবং তাদের স্মৃতি ও স্মরণে নির্মাণ করা হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও অপরাপর স্মৃতিসোধৗ এবং ভাস্কর্য। এক্ষেত্রে বেশকিছু মুক্তিযোদ্ধাদের নানা উপাধি দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেয়া হয়। উপাধিগুলো হল বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক। এই উপাধিগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অমর প্রতীক। তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারই এগুলো প্রদান করেন। তার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ বিলিয়ে দেন। তাঁরা হলেন ঃ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, সিপাহী হামিদুর রহমান ও নায়েক মুন্সী আবদুর রউফ, ন্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ, সিপাহী হামিদুর রহমান ও স্কোয়ার্ডের ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ রুহুল আমিন। বীর উত্তম উপাধি পেয়েছিলেন ৬৮ জন, বীর বিক্রম ১৭৫ জন এবং বীর প্রতীক ৪২৬ জন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি যেসকল বন্ধু সহযোগিতা করেছিলেন, তাদের বর্তমান সরকার মর্যাদাসহকারে সম্মাননা প্রদান করেন। আর যারা বাঙালি হয়েও হাত মিলিয়েছিল পাকসেনাদের সাথে তাদের প্রতি বাঙালি সন্তানদের ক্ষোভ এখনো শেষ হয়নি। মানবতাবিরোধী রাজাকার, আলশামস ও আল বদরদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। তাদের কেন বিচার হয়নি। তারা পরাজিত শত্রু। বাংলার শাক্তিপ্রিয় মানুষ এখনো তাদের উপযুক্ত বিচার আশা করে। অবশ্যই বাংলার মাটিতে তাদের সুষ্ঠুবিচার হবেই। আমরা স্বজন হারানোর বেদনা ভুলতে চাই।