একাত্তরের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:২১
রংপুর শহরের উপকণ্ঠে ছায়াঢাকা পাখি ডাকা সুনিবিড় সবুজ-শ্যামলিমায় ঘেরা একটি ছায়াপল্লী গ্রাম। নাম তার ‘আরাজি তামপাট’। এই গ্রামের এক কৃষিজীবী মোহাম্মদ ফইমউদ্দিন মিয়া। তাঁর প্রথম স্ত্রী রহিমননেসার কোল জুড়ে আসে ১৯৪৬ সালের ২ এপ্রিলে এক পুত্রসন্তান। মা-বাবা নবজাতক শিশুপুত্র সন্তানের চোখে-মুখে দেখতে পেলেন আশার আলো। এই ছেলেটির নাম রাখলেন মকবুল হোসেন। দু’মায়ের ঘরে সাত ছেলে চার মেয়ের মধ্যে মকবুল হোসেন দ্বিতীয় সন্তান। চাঁদের মত ফুটফুটে ছোট্ট ছেলেটি এক মায়ের বুকে মাথা রেখে আরেক মায়ের কোলে নরম তুলতুলে পা নেড়ে খেলা করে। মায়েদের আদর-সোহাগে এক পা দু-পা করে চাঁদের মতো বেড়ে ওঠে মকবুল হোসেন। মা আর মাটি পরম মমতায় জড়ানো। যেন একই সূত্রে গাঁথা। মকবুল হোসেনের বড় মা রহিমননেসা সাংসারিক দেখাশোনা করেন আর ছোট মা জোবেদা খাতুনের ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার দিকে নজর দেয়াই তার কাজ। ছোটবেলায় মকবুল হোসেনের বর্ণমালায় হাতেখড়ি তাঁর ছোট মায়ের কাছে। বর্ণমালার লেখাপড়ায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন মকবুল হোসেন। ধাপে ধাপে তিনি প্রাইমারী ছাড়িয়ে নাম লেখালেন হাইস্কুলে। আফানউল্লাহ হাইস্কুল থেকে ১৯৬১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মকবুল হোসেন ভর্তি হন কারমাইকেল কলেজে। এই কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অর্জন করেন বিএসসি ডিগ্রী। মকবুল হোসেন ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। লেখাপড়ার পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে তাঁর ছিল পদচারণা। তিনি স্কুল ও কলেজ ম্যাগাজিনে লিখতেন সায়েন্স ফিকশন। সম্পাদনা করতেন হাতে লেখা ‘পদক্ষেপ’ নামে দেয়াল পত্রিকা। এই দেয়াল পত্রিকাটি পরবর্তীতে ‘পদক্ষেপ’ নামেই স্কুলবার্ষিকী হিসেবে প্রকাশিত হয়। এতে তার লেখা ‘কয়লা’ ও ‘চিকিত্সার পাশে বিজ্ঞানের অগ্রগতি’ নামে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে সুধীমহলে প্রশংসিত হয়। মকবুল হোসেন ছাত্রজীবনে রাজনীতি সচেতন ছিলেন। আফানউল্লাহ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক সাহেব ছিলেন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর সংস্পর্শে এসে মকবুল হোসেন আরও সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। ছাত্রলীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মিছিলে, সভায় অংশগ্রহণ করেন। ছয় দফা ও এগার দফা আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। এছাড়াও খেলাধুলার প্রতি তার ঝোঁক ছিল। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে খেলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বিজয়ী ও বিজিতদের মধ্যে শীল্ড-কাপ উপহার দিয়ে করতেন পুরস্কৃত। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধকালীন সময় মকবুল হোসেন ‘ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি’-তে কাজ করেন একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি তিনি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। সমাজে কুচক্রী মহল যুদ্ধের অজুহাতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাঁধিয়ে এবং চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি করে যাতে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে সেদিকে তিনি ছিলেন অতন্দ্র প্রহরীর মত সজাগ। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বজায় রাখতে তিনি পালন করেন অগ্রণী ভূমিকা। মকবুল হোসেনের মন-প্রাণ ছিল জ্ঞানপিপাসু। তিনি ছিলেন আলোর অভিসারী। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের মধ্যে জ্ঞানের অনির্বাণ শিখা প্রজ্বলিত করার মানসে তিনি কিছুদিন ‘বড় রংপুর কারামাতিয়া মাদ্রাসা’ ও ‘আফানউল্লাহ হাইস্কুলে’ দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষক হিসেবে। সহজ-সুন্দর উপমায় নিরস বিজ্ঞানশাস্ত্রকে প্রাণবন্ত সরস উপস্থাপনার মাধ্যমে উত্সাহী করে তুলেন ছাত্রছাত্রীদের। আপন প্রতিভাবলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে তিনি প্রিয় হয়ে ওঠেন ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও সহকর্মীদের কাছে। কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষকের স্থায়ী পদ না থাকার দরুন এখানে তার বেশিদিন থাকা সম্ভব হয়নি। একদিন পত্রিকার পাতায় ‘ইস্ট পাকিস্তান ফায়ার সার্ভিস’-এ (বর্তমান বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স) স্টেশন অফিসার পদে লোক নিয়োগের একটি বিজ্ঞাপনের দিকে দৃষ্টি পড়ে মকবুল হোসেনের। ‘গতি-সেবা-ত্যাগ’—এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ১৯৬৮ সালে যোগদান করে চাকরিতে। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি নীলফামারী ফায়ার স্টেশনে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে। কালের চক্রে ঘনিয়ে আসে একাত্তরের ২৫ মার্চ। পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী গভীর কালরাতে ‘অপারেশন সার্স লাইট’ নামে বাঙালি নিধনযজ্ঞে নেমে পড়ে। হানাদারবাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে বাঙালি ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতিরোধ যুদ্ধ। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে বাঙালি ইপিআর সৈনিকদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন এক অকুতোভয় বীর অগ্নিসেনা মকবুল হোসেন। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর হানাদারবাহিনীর ভারি অস্ত্রশস্ত্রের তীব্র আঘাতে প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে। ফলে পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী ঢুকে পড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে। ইত্যবসরে মকবুল হোসেন তাঁর উইলিক্স ২১২ নম্বর টিভি সবুজ জীপ গাড়িতে বাঙালি ইপিআর সৈনিকদের অস্ত্রশস্ত্রসহ পৌঁছে দেন নিরাপদ স্থানে। আর মকবুল হোসেন সীমান্ত অতিক্রম করে চলে যান ভারতে। তাঁর স্কুলজীবনের শিক্ষক, তত্কালীন মাননীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে ছয় নম্বর সেক্টরে দেখা করেন। মকবুল হোসেন একজন সুশৃঙ্খল ইউনিফর্মধারী বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে তাঁকে ‘শারীরিক প্রশিক্ষক’ হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি আন্তরিকভাবে দেশ ও জাতির মুক্তির লক্ষ্যে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। মে মাসের প্রথমদিকে হাইকমান্ডের নির্দেশে হানাদারবাহিনীর তথ্য সংগ্রহের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফিরে আসেন। তথ্য সংগ্রহ করে ফেরার পথে ধরা পড়েন হানাদারবাহিনীর হাতে। তারপর তাঁকে মহানন্দা নদীর পাড়ে বর্বর বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। একজন দেশপ্রেমিকের রক্তে রঞ্জিত হয় মহানন্দার জলরাশি। একজন অগ্নিবীর মকবুল হোসেন দেশ ও জাতির জন্য উত্সর্গ করেছেন নিজের অমূল্য জীবন। তাঁর বুকের রক্তে খচিত হয়েছে সবুজ জমিনে লালসূর্য। দীর্ঘ নয় মাস মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাঙালির ললাটে সূচিত হয়েছে বিজয় তিলক। রচিত হয়েছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। একাত্তরের এক বীর মকবুল হোসেনের রক্ত-ঋণ কোনদিন শোধ হবার নয়।