তারুণ্যের সমকালীন চিন্তা

বিশ্বজিত্ তোমার মৃত্যুর জন্য আমিও দায়ী

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫১
শিরোনামটা কীভাবে লিখলে তোমার আত্মা একটু শান্তি পেতো, তা আমি জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি বাঁচার জন্য তোমার কোনো আকুতিই আমাদের পাষাণ হূদয়ে স্থান হয়নি। যে কারণে আমরা কেউ তোমাকে বাঁচানোর জন্য শেষ চেষ্টাটুকু করিনি। টেলিভিশনের পর্দায় যে দৃশ্য দেখেছি তা সিনেমার কাল্পনিক দৃশ্যকেও হার মানিয়েছে। ছাত্রাবস্থায় আরবের জাহেলিয়া যুগের ইতিহাস পড়েছিলাম তা অনুভূতিতে তেমন সাড়া দেয়নি। কারণ জাহেলিয়া যুগ সম্পর্কে আমার বাস্তব কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না । এখন আধুনিক যুগ শুধু নয়— ডিজিটাল যুগ বলেও আমরা অহংকার করি। এখন মানুষের প্রতিটি মুহূর্েতর মূল্য অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবতা কতটা নির্মম! প্রিয় পাঠক, আমি একজন শিক্ষক। অনেকে মানুষ গড়ার কারিগরও বলে থাকে। আর এ জন্যেই আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। যখন দেখি কতিপয় শিক্ষার্থী একজন বিশ্বজিেক অর্থাত্ একজন জীবন্ত মানুষকে দিনের আলোয় কুপিয়ে হত্যা করছে। কী নির্মম, কী পাশবিক, কী বীভত্স, কী নারকীয় দৃশ্য! সাধারণ দর্শক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে— যেন ম্যাজিক অনুষ্ঠান অথবা যাত্রাপালা দেখছিলাম। আমরা কিছুক্ষণের জন্য উপভোগ করলাম। মনে হচ্ছিল জাদু দেখানো শেষ হলে কিছুক্ষণ পর বিশ্বজিত্ আবার হাসিমুখে সালাম দিয়ে জনসম্মুখে দাঁড়াবে। বাস্তবতা হলো আমরা দর্শকরা দাঁড়িয়ে একটি সম্ভাবনাময় উঠতি তরুণের নির্মম হত্যাকাণ্ড দেখলাম। অতঃপর নিথর দেহটির ওপর যখন কেউ আর লাঠি অথবা রড দিয়ে আঘাত করছে না তখন ঘাতকদের সঙ্গে আমরা দর্শকও ঘটনাস্থল ত্যাগ করলাম। কিন্ু্ত এগিয়ে এলেন একজন রিকশাওয়ালা। যাঁর বিবেক তাঁকে স্থান ত্যাগ করতে দেয়নি। প্রতিরোধ করতে না পারলেও তিনি বিশ্বজিেক হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। বিশ্বজিত্ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কোনো তথাকথিত মেধাবী ছাত্র নন। তিনি নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য। অভাব-অনটনের কারণে পড়ালেখার পাট চুকিয়ে মা-বাবা তথা পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য দর্ির্জর কাজ বেছে নিয়েছেন। তিনি পারতেন কোনো ছাত্রসংগঠনের আশ্রিত চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী হতে। এটা হলে হয়তোবা তাঁকে এভাবে মরতে হতো না। আমার ভাবতে লজ্জা লাগে যে বিশ্বজিতের হত্যাকারীরা সবাই কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না; কারণ আমি একজন শিক্ষক। আমরা শিক্ষকরা কি শুধুই এদের বই মুখস্ত করিয়েছি? মনুষ্যত্ববোধ কি একটুও জাগাতে পারিনি? তাদের মধ্যে শেখাতে পারিনি পরমতসহিষ্ণুতা! আমরা শেখাতে পারিনি মানুষের জীবন একটাই। আমরা শেখাতে পারিনি বাঁচার অধিকার সকলের সমান। এতগুলো মানুষের সামনে নিরীহ বিশ্বজিতের প্রাণ সংহার করলো মাত্র কয়েকজন খুনি। পত্র-পত্রিকায়, টেলিভিশনে যাদের ছবি দেখে হার্টবিট বন্ধ হওয়ার উপক্রম। হাসপাতালে জরুরি বিভাগও বিশ্বজিতের বাঁচার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সমাজের সকল স্তরে বিবেকের এমন অবক্ষয় হলে সাধারণ মানুষেরা কোথায় যাবে? তাহলে কি বলব— মুমূর্ষু বিশ্বজিেক বহনকারী অশিক্ষিত রিকশাওয়ালা আমাদের দৃষ্টান্ত হওয়া উচিত? বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস গৌরব উজ্জ্বল। অতীতের সঙ্গে বর্তমান ছাত্ররাজনীতির পার্থক্য হলো অতীতে কুলাঙ্গারদের পরিহার করা হতো। বর্তমানে এদের সমাদর করা হয়। এসব কারণে গোটা রাজনৈতিক পরিবেশ আজ হুমকির সম্মুখীন। গুটি কয়েক কুলাঙ্গারকে বহিষ্কার করলে রাজনৈতিক দল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে পারে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রস্থল। এ কাজটি করতে পারলে আমাদের আর ধর্ষক শিক্ষার্থীর সেঞ্চুরি উত্সব দেখতে হতো না। টিএসসির সড়ক দ্বীপে ইংরেজি নববর্ষ উত্সবে কোনো তরুণীকে কুলাঙ্গার কর্তৃক নগ্ন করার দৃশ্য দেখতে হতো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচতলা ভবন থেকে কোনো শিক্ষার্থীর লাশ নিচে পড়তো না। বিশ্বকাপ জয়ের উত্সবে কোনো নারীর শ্লীলতাহানি হতো না। শুনেছি মানুষ মানুষের জন্য। আর শিক্ষাই মানুষকে মানুষ করে। শিক্ষিত এই আমরাই আজ মাতৃভূমিকে নরকে পরিণত করছি। শিক্ষার হার যখন বাড়ছে তখন শিক্ষিতের বিবেক ক্রমশ লোপ পাচ্ছে। হায়েনার বিরুদ্ধে আমরা শিক্ষিত মানুষরা বিশ্বজিেক বাঁচানোর জন্য কেউ এগিয়ে যাইনি। আমি শিক্ষক অথচ আমারই আদর্শে গড়া তথাকথিত মেধাবী ছাত্ররা তোমাকে বাঁচতে দেয়নি। আমাদের দুর্বলতার কারণে ধর্ষকরা আমাদেরই সম্মুখে সেঞ্চুরি উত্সব পালন করে। শিক্ষক হিসেবে আমার ব্যর্থতার জন্য আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাই। তোমরা আমাকে ক্ষমা করবে তো? ঢাকা