বিশ্বজিত্ হত্যার ঘটনায় পুলিশের তৈরি সুরতহাল রিপোর্টে চরম অসঙ্গতি দেখা গেছে। সুরতহাল রিপোর্টটি ছিল ভুলে ভরা। বাক্য গঠন থেকে শুরু করে বিশ্বজিতের দেহের বিবরণ সবই ছিল দুর্বল। দায়সারা গোছের ছিল রিপোর্টটি। এমনকি দেহের কোথায় কোথায় আঘাত লেগেছে তা লেখা হয়েছে আঞ্চলিক শব্দে। স্পষ্ট করে জখমের বর্ণনা করা হয়নি।
অথচ এ রকম একটি আলোচিত হত্যাকান্ডের ঘটনায় এমন হবে আশা করেননি কেউ। বিভিন্ন হত্যা মামলা তদন্ত করেছেন ও সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেছেন এমন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, সুরতহাল রিপোর্ট হলো যে কোন অপঘাতে মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের প্রথম ধাপ। সুরতহাল রিপোর্ট দেখে নিহত ব্যক্তির মৃত্যুর ব্যাপারে প্রাথমিক বিষয়টি জানা যায়। যা মামলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায় বিচার নিশ্চিতে সুরতহাল রিপোর্টের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু বিশ্বজিতের ঘটনায় ময়না তদন্ত রিপোর্টও সুরতহাল রিপোর্টে নানা অসঙ্গতি দেখা গেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে কেন নিরীহ পথচারী বিশ্বজিতের হত্যাকাণ্ড নিয়ে এমন করা হচ্ছে?
প্রখ্যাত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাহারুল হক বলেন, সুরতহাল রিপোর্ট ময়না তদন্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ময়না তদন্ত রিপোর্টের গুরুত্ব অনেক। এক্ষেত্রে ত্রুটি কিংবা অসঙ্গতি হলে হত্যার সঙ্গে জড়িতরাই লাভবান হবে। স্বজনহারারা ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক স্টেপিং ইনজুরির কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাত্ ওই ইনজুরিতে বিশ্বজিত্ মারা গিয়েছে। এখন প্রশ্ন ওই ইনজুরিটা কে করেছে? কার হাতে ছোরা ছিল। তাকে গ্রেফতার করে কাঠগড়ায় দাড় করাতে হবে। বিশ্বজিতকে যে ভাবে চাপাতি, ছোরা ও রড দিয়ে দেহে আঘাত করা হয়েছে সে ক্ষেত্রে তার পরিহিত শার্ট ও প্যান্টের বর্ণনাটাও গুরুত্বপূর্ণ আলামত। কাপড়েও কোপের চিহ্ন থাকবে বলেও উক্ত বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বিচার কারো চেহারা দেখে হয় না। হয় সাক্ষী প্রমাণ ও আলামতের ভিত্তিতে। পুলিশের সুরতহাল ও ময়না তদন্তে অসঙ্গতির কারণে অনেক খুনি রক্ষা পেয়ে যায়। এমন বহু দৃষ্টান্তও রয়েছে বলে তিনি জানান।
বিশ্বজিতের সুরতহালে
যা উল্লেখ রয়েছে
বিশ্বজিত হত্যার ঘটনারয় মামলা হওয়ার আগে সুত্রাপুর থানার এসআই জাহেদুল হক সুরতহাল রিপোর্টটি তৈরি করেন। যারা জিডি নম্বর ৩৪৬। তারিখ ৯ ডিসেম্বর।
সুরতহাল রিপোর্টে জাহেদুল তিনি উল্লেখ করেন, ‘বিশ্বজিতের পিঠে ও কোমরের হালকা ফোলা জখম ছিল। ডান হাতের বোগলের নিচে আনুমানিক ৩ ইঞ্চি কাটা রক্তাক্ত জখম। বাম পায়ের হাটুর নীচে ছেড়া জখম এবং সমস্ত শরীর রক্তাক্ত। ’
আরো বলা হয়,‘৯ ডিসেম্বর অবরোধ চলাকালে সকাল ৯টায় বাহাদুর শাহ পার্কের (ভিক্টোরিয়া) উত্তর পাশে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটলে বিশ্বজিত দৌড়ে যাচ্ছিল। ঐ সময় কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল মিছিলকারী তাকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় রিকশা চালক রিপন সরকার মিটফোর্ড হাসপাতাল জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। হাসপাতাল জরুরি বিভাগে মারাত্মক জখম ও রক্তক্ষরণে ঐ দিন সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে বিশ্বজিতের মৃত্যু হয়।’
সুরতহাল রিপোর্ট ছিল ভুলে ভরা। জরুরি বিভাগে সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে নেয়া হয়। ৯টা ৫৫ মিনিটে বিশ্বজিতের মৃত্যু হয়। ২৫ মিনিট বিশ্বজিত বেঁচে ছিলেন বলে ডেথ সার্টিফিকেটে উল্লেখ করা হয়। সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসাবে ক্যাজুয়েলটি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার উল্লেখ করেছেন যে, গুরুতর প্রহারে প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে সে ‘শকে’ যায়। পরে হূদযন্ত্র ও ফুসফুস অকার্যকর হয়ে বিশ্বজিত মারা যায়। ডেথ সার্টিফিকেট আর সুরতহাল রিপোর্টে অসঙ্গতিপূর্ণ ছিল বলে ফরেনসিক বিভাগের একজন চিকিত্সক জানিয়েছেন। এ কারণে বিশ্বজিতের হত্যা মামলায় ঘাতকদের বিরুদ্ধে ঘটনা প্রমাণ করা নিয়ে বড় ধরনের ফাঁক থেকে যাবে। এর মাধ্যমে ঘাতকদের বের হয়ে আসার রাস্তা করে দেয়া হয়েছে বলে খ্যাতিমান ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানিয়েছেন।
পরিকল্পিত না
ইচ্ছাকৃত ষড়যন্ত্র
ঘাতকদের আইনের ফাক-ফোকর দিয়ে সাজা থেকে রক্ষা করার বিষয়টি কোন কোন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা গভীর ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যেহেতু এটি হত্যাকাণ্ড সেহেতু সংশ্লিষ্ট চিকিত্সক শুধু হত্যাজনিত মতামত দিয়ে ময়না তদন্ত রিপোর্ট সম্পন্ন করেছে। তার সঙ্গে অন্যান্য ফাইনডিং ও আলামত প্রয়োজন সেইদিকে গুরুত্ব দেয়নি। এক ধরনের অবহেলা কিংবা অজ্ঞতার কারণ হতে পারে। অপরদিক মোটা অংকের উেকাচ নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। বিশ্বজিেক প্রকাশ্যে রাজপথে স্মরণকালের বর্বরোচিত ও নির্দয়ভাবে কুপিয়ে, ছুরিকাঘাত ও রড লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার দৃশ্য বিশ্ববাসী দেখেছে। এক্ষেত্রে ময়না তদন্ত ও সুরতহাল রিপোর্টে ব্যাপক অসঙ্গতি থাকার বিষয়টি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ অনেকের দাবি।
ময়না তদন্তকারী
চিকিত্সকের বক্তব্য
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগের বিশ্বজিতের ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক ডা. মোঃ মাকসুদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, পুলিশ তো অনেক কাটা, জখম, ও ফোলার কথা মিডিয়ায় বলছে। কিন্তু সুরতহাল রিপোর্টে তো একটি জখমের এবং দুটি ছোট খাটো জখমের কথা উল্লেখ করেছে। বিশ্বজিতের পিঠে স্টেপিং জখমটি ছিল সাড়ে তিন ইঞ্চিন গভীর। বড় আর্টরি কেটে গেছে। ঐ একটি জখম তার মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। আর ছোট ২/১ খাটো জখম ছিল সেইগুলো মৃত্যুর জন্য সহায়ক নয়। যতই আঘাত থাকুক না কেন তাকে হত্যাজনিতই মতামত দিতে হবে। বিশ্বজিেক হত্যা করা হয়েছে। এই মতামতই দেয়া হয়েছে। কারা হত্যা করেছে তাদের পুলিশ চিহ্নিত করবে। তিনি সঠিক ময়না তদন্ত রিপোর্ট দিয়েছেন বলে দাবি করেন। এর আগে ৭০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে ধর্ষণের যে রিপোর্ট দিয়েছেন তা সঠিক নয় বলে তিনি জানান।
