জ্বালাও পোড়াও, সংঘর্ষ

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩১
ট্রাকে আগুন, পুলিশের গাড়িতে হামলা ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়েছে। হরতালের সময় দুই বিভাগেই স্থানীয়ভাবে যানবাহন চলাচল করেছে। তবে দূরপাল্লার কোনো বাস চলাচল করেনি। ট্রেন চলাচল ছিল স্বাভাবিক। সময়মত বিমানও উঠানামা করেছে। আটক হয়েছেন জামায়াত-শিবিরের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী। রাজশাহী অফিস জানায়, পুলিশের গাড়িতে হাতবোমা নিক্ষেপ, বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপের মধ্য নিয়ে গতকাল বুধবার রাজশাহীতে জামায়াত আহুত অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়েছে। ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতালে নগরীর কাজলা, বিনোদপুর, সিএন্ডবি ও নওদাপাড়ায় পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসময় পুলিশ ১২ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীকে আটক করে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক অধ্যাপক তাসনিম আলমকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে এ হরতাল আহবান করা হয়। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল ভোর সাড়ে ৬টার দিকে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে নগরীর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর ও কাজলা এলাকায় ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে মিছিল করে এবং টায়ারে আগুন দেয়। হরতাল সমর্থকরা পুলিশ ও তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ১০/১২টি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। পুলিশ জানায়, সংঘর্ষের ৪টি পয়েন্ট থেকে জামায়াত-শিবিরের ১২ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। হরতাল চলাকালে রাজশাহী থেকে দূরপাল্ল?ার এবং আন্ত:জেলার যানবাহন চল?াচল বন্ধ ছিল। নগরীর দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। তবে রিক্সা-ভ্যান, ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক, বাইসাইকেল ও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। সকালে ঢাকাগামী সিল্ক সিটিসহ সকল ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রাজশাহী ছেড়ে যায়। বগুড়া প্রতিনিধি জানান, রাজশাহী বিভাগে জামায়াত-শিবিরের ডাকা আধাবেলা হরতাল চলাকালে বগুড়ায় পুলিশের সঙ্গে পিকেটারদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, পরিবহন ভাংচুর, ট্রাক পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানো গ্যাস নিক্ষেপ করে। পুলিশের রাবার বুলেটে জামায়াত-শিবিরের তিনজন আহত হয়েছে। এরমধ্যে সদর থানা জামায়াতের আমীরকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার সকালে বগুড়ার শাহাজাহানপুর উপজেলার ফটকি ব্রিজ এলাকায় পিকেটাররা ৩টি ও বগুড়া শহরের তিনমাথা রেলগেল এলাকায় ১টি পরিবহন (গাড়ি) ভাংচুর করে। হরতালের সমর্থনে শিবিরের নেতাকর্মীরা শহরের বাইরে বেশ কয়েকটি স্থানে পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে রাস্তার মাঝে টায়েরে আগুন লাগিয়ে সড়ক অবরোধ ও মিছিল করে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরতলীর সাবগ্রাম এলাকায় দ্বিতীয় বাইপাস সড়ক অবরোধ করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে পিকেটারদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। একই সময় সদর উপজেলার লাহিড়ীপাড়া এলাকায় ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক অবরোধ করে গাড়ি ভাংচুর শুরু করলে পুলিশ পিকেটারদের ধাওয়া করে। তারা পার্শ্ববর্তী দীলকান্দি মাঝিপাড়ায় আশ্রয় নিয়ে পুলিশের ওপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করলে পুলিশ উপর্যুপরি রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস সেল ছুঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। সেসময় বুলেটবিদ্ধ অবস্থায় আটক হন সদর থানা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক রফিকুল আলম। এছাড়া জামায়াত নেতা ইমরান হোসেনসহ আরও দু‘জন বুলেট বিদ্ধ হয়েছেন বলে জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। বেলা পৌঁনে ১২টার দিকে বগুড়া শহরতলীর সিলিমপুর এলাকায় ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে একটি ঝুট বোঝাই ট্রাক আটকিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। খবর পেয়ে বগুড়া দমকল বাহিনীর সদস্যরা গিয়ে দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন নিভিয়ে ফেলে। হরতাল চলাকালে বগুড়া থেকে কোন দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। তবে ট্রেন এবং শহরে ছোট পরিবহণ চলাচল ছিল স্বাভাবিক। শহরের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। সিলেট অফিস জানায়, সিলেটে গাড়ি ভাংচুর ও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্য দিয়ে জামায়াত-শিবিরের অর্ধ-দিবস হরতাল গতকাল ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা সিলেট-তামাবিল সড়ক এবং নগরীর বাগবাড়ী এলাকায় কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে। একাধিক স্থানে পিকেটাররা ককটেল ফাটিয়ে জনমনে আতংক ছড়ায়। পিকেটিং নিয়ে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। পুলিশ গ্রেফতার করেছে ৭ জনকে। সকাল বেলা জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে পিকেটিং করতে দেখা গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা আত্মগোপনে চলে যায়। তবে সকালেই বেশ কয়েকটি স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা। কয়েকটি অটোরিকশা ও ট্রাকের গ্লাস ভাংচুর করে। পুলিশ অবরোধ তুলতে গেলে তারা পুলিশের উপর হামলা চালায়। এ সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। হরতাল সমর্থনে জামায়াত-শিবির সিলেট শহরতলীর তেমুখী, নগরীর ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল রোড, মিরাবাজার, শিবগঞ্জ, মজুমদারি ও দক্ষিণ সুরমায় পিকেটিং ও মিছিল করে। এ সময় তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকলে পুলিশও কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। নগরীতে রিকশা, অটোরিকশা চলাচল করলেও দূরপাল্লার বাস ও ভারী যানবাহন চলেনি। তবে ট্রেন ও বিমান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় গতকাল বুধবার ঢিলেঢালা অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। ছাত্র শিবির গাইবান্ধা জেলা শাখা জেলার গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ীতে এই অর্ধদিবস হরতাল ডাক দেয়। হরতাল চলাকালে পিকেটারদের দেখা যায়নি। তবে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পলাশবাড়ী ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। সকালে পলাশবাড়ী একটি ট্রাক ও গোবিন্দগঞ্জে একটি বাসের গ্লাস ভাংচুর করা হয়। এছাড়া হরতাল চলাকালে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জামায়াতের ডাকা অর্ধদিবস হরতাল ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয়। হরতাল চলাকালে গতকাল সকালে জেলার ভোলাহাট উপজেলার ইমামনগর বাজার থেকে শিবিরের থানা সভাপতি মাসুদ রানা (২৩), সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা সুমন (১৯) ও মুশরিভুজা গ্রামের ফজলুর রহমান (২০)-কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে সকাল ১১টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার শিবতলা মহল্লার নতুন স্টেডিয়াম এলাকা থেকে আজিজুর রহমান নামে এক শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, আটক নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর সিলেট বিভাগে ডাকা হরতাল সুনামগঞ্জে শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। হরতালের কারণে শহরের দোকানপাট বন্ধ ছিল। পুলিশের বাড়তি নিরাপত্তার কারণে হরতালের সমর্থনে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা মিছিলও করতে পারেনি। তবে সকাল ১০টায় শহরের ধোপাখালি এলাকায় পিকেটিং করার সময় কয়েকজন শিবির কর্মীকে ধাওয়া করে স্থানীয় এলাকাবাসী। এ সময় একজনকে আটক করে পুলিশে দেয় তারা। এদিকে হরতালের কারণে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে যান চলাচল বেলা ২টা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী ডা. শফিকুর রহমানের মুক্তির দাবিতে গতকাল হরতাল চলাকালে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া ও জুড়ি থেকে জামায়াত- শিবিরের ৫ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। হরতাল চলাকালে পিকেটিং করার সময় পুলিশ কুলাউড়া উপজেলা সদর থেকে মোঃ মোস্তফা, রিয়াদ ও জামি এবং জুড়ি উপজেলা সদর থেকে আব্দুল কাদির ও তানভীর আহমদকে আটক করে। হরতাল চলাকালীন দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করেনি। ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের মুক্তির দাবিতে জামায়াতের ডাকা অর্ধদিবস হরতাল ছাতকে বিচ্ছিন্নভাবে পালিত হয়েছে। সকালে জামায়াত-শিবিরের পিকেটাররা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের গোবিন্দগঞ্জ ও ধারনবাজারে টায়ার পুড়িয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। পরে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পিকেটাররা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। হরতালের সমর্থনে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ছাতক পৌর শহরে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্টে দু’টি অটোটেম্পু ভাংচুরের ঘটনা ঘটে।