বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, বর্তমান সরকারের ডানে-বাঁয়ে মন্ত্রী উপদেষ্টা ও এমপিদের সবাই চোর। এই চোরদের দিয়ে দেশের কোনো উন্নয়ন হবে না। বিশ্বব্যাংক বার বার বলেছে, দুই আবুলকে (সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল হাসান চৌধুরী) ধরা হলে শর্তসাপেক্ষে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে তারা টাকা দেবে। কিন্তু প্রকৃত অপরাধী দুই আবুলকে বাদ দেয়া হয়েছে। কারণ কান টানলে মাথা চলে আসবে বলেই দুই আবুলকে ধরা হয়নি। ৪২তম বিজয় দিবস উপলক্ষে বিএনপির উদ্যোগে গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব অভিযোগ করেন।
নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না, হতেও দেয়া হবে না। তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে আন্দোলন চলছে, আন্দোলন চালিয়ে যাব। তিনি বলেন, এই আন্দোলন করতে যাওয়ায় আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) জেলে নেয়া হয়েছে, রিজভী (বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী) এখনো কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ। খোকাসহ (সাদেক হোসেন খোকা) বিরোধী দলের ২৫ হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ মামলা দেয়া হয়েছে। এসব ‘মিথ্যা’ মামলা দিয়েও কোনো কাজ হবে না। যতোই মামলা দেয়া হোক, গ্রেপ্তার-নির্যাতন চালানো হোক, তাতে ১৮ দলের শুধু যোগ-ই হবে, বিয়োগ হওয়ার কিছু নেই। কারণ এখন বিয়োগ হতে থাকবে শুধু আওয়ামী লীগের।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, এই আওয়ামী লীগই গণতন্ত্রকে হত্যা করে দেশে একদলীয় শাসনের লক্ষ্যে বাকশাল কায়েম করেছিল। এখনও তাদের চিন্তা আজীবন ক্ষমতায় থাকার। এজন্য তারা অন্য সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করতে চায়। এই চিন্তা-চেতনার কারণেই তারা বিরোধী দলকে মিছিল ও সভা-সমাবেশের অনুমতি দেয় না, কোনো স্থান দেয়া হয় না। বিজয় দিবসে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। তাহলে দেশে গণতন্ত্র কোথায়? মনে হচ্ছে দেশটা তাদের পৈতৃক সম্পত্তি।
খালেদা জিয়া বলেন, কারও করুণায় আমরা দেশ স্বাধীন করিনি। আমি স্পষ্টভাবে বলে দিতে চাই-বিদেশে আমাদের বন্ধু রয়েছে, তবে বিদেশে আমাদের কোনো প্রভু নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগ এটা মনে করে না। আওয়ামী লীগ দেশের মানুষকে যেমন অন্যের পদানত রাখে তেমনি দেশকেও করদরাজ্য বানিয়ে তারা আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চায়। কিন্তু তা হতে দেয়া হবে না। তিনি বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও সকল কষ্ট তখনই সার্থক হবে যখন অন্যের তাঁবেদারি ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে আমরা দেশকে মুক্ত করতে পারব, যখন বিশ্বের বুকে মান-মর্যাদা নিয়ে আমরা বাঁচতে পারবো। শুধু পতাকা আর মানচিত্র থাকলেই সব সার্থক হবে না। এই পতাকা ও মানচিত্রও আজ বদলে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছে। সীমান্তে প্রতিদিন আমাদের লোকদের হত্যা করা হচ্ছে, ফেলানীর লাশ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। আওয়ামী লীগ এর কোনো জবাব দিতে পারবে না। আসুন সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। আমরা সকলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক চাই। মাথা উঁচু করে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক চাই। কোনো তাঁবেদারি, হাতজোড় করা চাই না, কারও আধিপত্য মেনে নয়, এদেশ পরিচালিত হবে এদেশেরই জনগণের নির্দেশ-নির্দেশনায়।
তিনি বলেন, গ্রামে বর্তমানে উন্নয়নমূলক কোনো কাজ হচ্ছে না। দু’একটি হলেও তা আওয়ামী লীগের লোকজনই পায়, তাও টেন্ডারও হয় না। ক্ষমতায় আসার আগে আওয়ামী লীগ কৃষকদের বিনামূল্যে সার এবং কমমূল্যে বীজ ও কৃষি উপকরণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন কৃষকরা উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনে না, বিদেশ থেকে আমদানি করে। কারণ অন্য দেশ থেকে আমদানি করলে তারা কমিশন পায়। কুইক রেন্টাল করলেও দেশে বিদ্যুত্ নেই। কুইক রেন্টালের সরকারের লোকজন নিজেদের পকেটে টাকা ভরেছে। বিদ্যুত্, পানি ও গ্যাসের অভাবে একের পর এক কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ যেমন নেই, তেমনি দেশি বিনিয়োগও হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের অপশাসন, তাদের খুন-খারাবি, গার্মেন্টস কারখানায় আওয়ামী লীগ কর্মীদের হামলা-ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনার কারণে অর্থনীতি বিপর্যস্ত। সেদিকে সরকারের দৃষ্টি নেই। সরকার ব্যস্ত কেবল কমিশন নেয়ায়। হলমার্কের নামে ব্যাংকের সব টাকা নিয়ে গেলেও আসল অপরাধীদের ধরা হয়নি। শেয়ারবাজার লুটপাটের মাধ্যমে দেড় কোটি মানুষকে পথে বসানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই শেয়ারবাজার লুট হয়ে যায়। ডেসটিনি ও অবৈধ ভিওআইপির মাধ্যমে হাজার-হাজার কোটি টাকা সরকার লুটে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়-স্বজনরা পর্যন্ত এই লুটপাটে জড়িত। একদিন প্রতিটি ঘটনার জন্য এদেরকে জবাব দিতে হবে। লুটপাটের কারণে এ সরকার পদ্মা সেতু করতে পারছে না। সেতু নির্মাণের আগেই ঘুষ নিয়ে দেশের মর্যাদা নষ্ট করা হয়েছে।
গত ৯ ডিসেম্বর ১৮ দলের রাজপথ অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে নিরীহ কর্মজীবী বিশ্বজিত্ দাসকে খুনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, সরকার পদে-পদে মিথ্যা কথা বলছে। বিশ্বজিত্ খুনের জন্য দায়ী এই সরকার ও আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রীও মিথ্যা কথা বলে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে চাচ্ছেন। কারণ ধরা পড়লে ছাত্রলীগ-যুবলীগও বলবে-আমাদের কোনো অপরাধ নেই, আমরা নির্দেশ পেয়েছি-এজন্য রাম দা, বল্লম ও কিরিচ দিয়ে হত্যা করেছি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে প্রশ্ন করতে চাই-সিরাজ সিকদারকে কারা হত্যা করেছিল? আপনারা তো শুধু অন্যের বিচারের কথা বলছেন। সিরাজ সিকদারকে হত্যার জন্য আপনাদেরও বিচার হবে। আপনারা তো একের পর এক খুন করে যাচ্ছেন। দাগি আসামিদের (সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বিকাশকে ইঙ্গিত করে) জেল থেকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের (আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক) নামে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। সরকারের দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করতে চাওয়ার কারণে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকে খুন করা হয়েছে, এখনও পর্যন্ত প্রকৃত খুনিদের ধরা হয়নি।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি ফ্যাসিস্ট দল। তারা দেশ ও মাটির কথা ভাবে না। ভাবে শুধু নিজেদের স্বার্থের কথা। দেশ স্বাধীনের পর লুটপাট-দুর্নীতির কারণে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা দিশেহারা হয়ে পড়ে, তারা সেদিন নেতার কথা শুনেনি। সেজন্য তাদের নেতা সেদিন বলেছিলেন, অন্যেরা দেশ স্বাধীন করে পায় সোনার খনি, আর আমি পেলাম চোরের খনি। সেই চোরের খনি থেকে চোর-ই বের হয়েছে। আজকের দুরবস্থার জন্য এই চোরেরাই দায়ী।
সমবেত মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, দেশ স্বাধীন করেছেন আপনারা। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিশ্বের কাছে এদেশকে আজ ‘বিশ্বচোর’ বানিয়েছে। এ অবস্থা থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। দেশের দুরবস্থা দেখে আপনারাও ঘরে বসে থাকতে পারেন না। আমি জানি আহ্বান জানালেই আপনারা দেশ রক্ষায় আবার জেগে উঠবেন। ভয় পেয়ে সরকার আজকের এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আসতে আপনাদের পদে-পদে বাধা দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে আপনাদের নাম বাদ দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে, এমনকি আপনাদের ভাতা বন্ধ করে দেয়ারও হুমকি দেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় করেছি আমরা, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও আমরাই করেছি। সুতরাং আপনাদের নাম বাদ দিয়ে কোনো লাভ হবে না, বাদ দিলেও ভবিষ্যতে তা আবার যুক্ত করা হবে। আপনাদের ভাতাও বৃদ্ধি করা হবে। একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হবে, যিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আপনাদের উন্নয়নে যা যা করণীয় সব কাজ করবেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে যেন তারা এবং তাদের সন্তানরা সেখানে চিকিত্সা নিতে পারেন।
সংবর্ধনা সমাবেশ বেলা ১টা ৪০ মিনিটে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। পরে জাতীয় সংগীত বাজানো হয় এবং দেশ, জাতির কল্যাণে মোনাজাত করা হয়।
অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে প্রবেশকালে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে লাল গোলাপ ও রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে স্বাগত জানান সংবর্ধনা কমিটির স্বেচ্ছাসেবকরা। মূল প্যান্ডেলে আসলে সবাইকে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের পক্ষ থেকে দেয়া হয় সাদা রঙের একটি করে গেঞ্জি। আর সবার মাথায় ছিল লাল সবুজের ক্যাপ। দুপুরের খাবারের মেন্যু ছিল মুরগির বিরিয়ানি। বারবার মাইকে আয়োজকদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত আয়োজনের কথা বলা হলেও খাবার পরিবেশনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীরউত্তম। বক্তব্য রাখেন এলডিপির সভাপতি কর্নেল অব. অলি আহমদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলাম, মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, আবদুল্লাহ আল নোমান, মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, শমসের মবিন চৌধুরী, মেজর জেনারেল অব. সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, মেজর জেনারেল অব. আইন উদ্দিন, নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, জয়নুল আবদিন ফারুক প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মসিউর রহমান, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবদুস সালাম, মুক্তিযোদ্ধা দলের প্রচার সম্পাদক শহীদুল ইসলাম মিলন। মঞ্চে ৩৬ জন জেলা কমান্ডার উপস্থিত ছিলেন। এই সমাবেশে জামায়াতকে আমন্ত্রণ জানায়নি বিএনপি।
