কে হচ্ছেন রংপুরের প্রথম মেয়র?

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৫
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল কাঙ্ক্ষিত এই নির্বাচন। সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। শুধু নগর পিতা নন, একই সঙ্গে নির্বাচিত হবেন ৩৩ জন সাধারণ কাউন্সিলর এবং ১১ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর। একাধিক মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করলেও ভোটাররা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। মেয়র ও কাউন্সিলর পদের প্রার্থীরা এতদিন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে, প্রতিশ্রুতি আর অঙ্গীকার করে যে ভোট প্রার্থনা করেছেন তার ফলাফল নির্ধারণ হবে এই ভোটে। নির্বাচন নিয়ে সাজ সাজ রব পড়লেও কিছুটা উদ্বেগ-আতংকও রয়েছে। এই জন্য গ্রহণ করা হয়েছে নগর জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা। গত মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে প্রার্থীদের প্রচারণা শেষে এখন চলছে জয়ের হিসাব-নিকাশ। সবার মনে একটাই প্রশ্ন কে হচ্ছেন রংপুরের নগর পিতা ? কে পরবেন বিজয়ের মালা? আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, প্রিজাইডিং অফিসারদের কাছে নির্বাচনী ব্যালট পেপার, বাক্স ও নির্বাচন কাজে ব্যবহূত অন্যান্য সামগ্রী হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল নির্বাচনী সকল সামগ্রী প্রতিটি কেন্দ্রে চলে গেছে। রংপুর সিটি করপোরেশনের এই নির্বাচনের ১৭৮টি ভোট কেন্দ্রে ১৭৮ জন প্রিজাইডিং অফিসার, দুই হাজার ১৪০ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, সমানসংখ্যক পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। ২০৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে নবগঠিত দেশের দশম সিটি করপোরেশনের মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৭৪২ জন। এর মধ্যে একলাখ ৭৯ হাজার ১২৮ জন পুরুষ এবং একলাখ ৭৮ হাজার ৬১৪ জন মহিলা ভোটার। নির্বাচনে মেয়র পদে ১২ জন, কাউন্সিলর পদে ৩২৭ জন ও সংরক্ষিত নারী আসনে ৯১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনে ১২ মেয়র প্রার্থী থাকলেও লড়াই হবে ত্রিমুখী। তিন প্রার্থীর মধ্যে হবে হাড্ডাহাড্ডি ভোটযুদ্ধ। তাদেরকে ঘিরেই থাকবে ভোটে জয়-পরাজয়ের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তারা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সাবেক এমপি শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু (প্রতীক মোটর সাইকেল), জাতীয় পার্টি (এ) থেকে বহিষ্কৃত নেতা সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা (প্রতীক হাঁস) ও জাতীয় পার্টি (এ) থেকে বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক পৌর মেয়র একেএম আব্দুর রউফ মানিক (প্রতীক চশমা)। প্রার্থীদের শেষ প্রচারণা :গতকাল শেষদিনে মেয়র প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় প্রচারণা চালিয়েছেন। শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু মোটর সাইকেল প্রতীক নিয়ে গুপ্তপাড়া, শালবনসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন। হাঁস প্রতীক নিয়ে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা খামারপাড়া, সেনপাড়া, গ্র্যান্ড হোটেল মোড়ে ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করেছেন। একেএম আবদুর রউফ মানিক চশমা প্রতীক নিয়ে মুন্সিপাড়া, কেনারীপাড়াসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেছেন। আনারস প্রতীক নিয়ে কাওছার জামান বাবলা মাহিগঞ্জ, সাতমাথা, ফতেপুর, কলেজ রোডে প্রচারণা চালিয়েছেন। সাফিউর রহমান সাফি নগরীর রাধাবল্লভ, মেডিক্যাল মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের কাছে তার প্রতীক দোয়াত কলমে ভোটটি চেয়েছেন। ভাসমান ভোটারাই ফ্যাক্টর :রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩ লাখ ৫৭ হাজার ভোটারের মধ্যে পৌর এলাকায় রয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ভোট। অপরদিকে পৌর এলাকার বাইরে সমপ্রসারিত সিটি করপোরেশনের উপকণ্ঠে সোয়া ২ লাখ ভোটার। এই ভোটারাই নির্ধারণ করবেন কে হবে নগর পিতা। এক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির (এ) বহিষ্কৃত নেতা মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ও আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর মধ্যে এই ভোট ভাগাভাগি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেহেতু জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ কাউকে সমর্থন দেননি সে কারণে এরশাদ ভক্তরা রয়েছেন অন্ধকারে। রাজেন্দ্রপুর এলাকার এরশাদ ভক্ত জুলফিকার হায়দার কোয়েল জানান, মুই কাক ভোট দিম সেটা এলাও ঠিক কইরবার পারো নাই। (আমি কাকে ভোট দিবো সেটা ঠিক করতে পারিনি)। ইভিএম নিয়ে শংকিত কর্মকর্তারা :ইলেকট্রনিক ভোটিং সিসেষ্টম (ইভিএম) নিয়ে ভোটারদের আগ্রহ থাকলেও শংকিত কর্মকর্তারা। তুমুল সমালোচনার মুখে কমিশন এই নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলেও খোদ কমিশন কর্মকর্তারাই এর বাস্তবায়ন নিয়ে শংকিত রয়েছেন। এই পদ্ধতি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ইসি সচিবালয় থেকে একটি বিশাল টিম গত সোমবার রাতেই রংপুরে পৌঁছেছেন। যদিও এই কর্মকর্তাদের মধ্যে কারোরই ইভিএম-এ ভোট গ্রহণের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। রংপুরবাসীর জন্য ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ার নতুন এই পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই ভোটারদের। ইতিমধ্যেই কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বাচনী এলাকার রাজেন্দ্রপুর ইউনিয়নের ১১ নং ওয়ার্ডের চারটি কেন্দ্রের সাধারণ ভোটারদের ও কেন্দ্রের দায়িত্ব প্রাপ্তদের নিয়ে মক ভোটিং সম্পন্ন করেছে ইসি। যে কোন সময়ে এই পদ্ধতি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে এমন আশংকায় ইভিএম-এর পাশাপামি ব্যালট পেপারও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, পূর্ব রাজেন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, কামদেবপুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেরানীর হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কেরানীর হাট স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রের ভোটারদের ইভিএম পদ্ধতির মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হবে। এই চার কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা সাত হাজার ৭২৩ । সেনা মোতায়েনের দাবি বিএনপি’র প্রার্থীর :অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি নেতা ও গণমঞ্চের প্রার্থী আলহাজ্ব কাওছার জামান বাবলা (আনারস প্রতীক)। গতকাল সকালে নগরীর সিটি প্লাজা মার্কেটের নির্বাচনী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এই দাবি জানান। নির্বাচনে কোন সহিংস ঘটনা ঘটলে আপনি নির্বাচন বয়কট করবেন কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এই জবাব আমি আজ বৃহস্পতিবার দিবো। নির্বাচনে কঠোর নজরদারি :রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য দুটি টহল দল থাকবে। একটি টহল দলে আটজন র্যাব সদস্য থাকবে। এরই মধ্যে তিনশ’ র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবিলায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর আটটি দল রিজার্ভ রাখা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের ঝুঁকিপূর্ণ ১০৪টি ভোট কেন্দ্র গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এজন্য সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে শাপলার মোড়ে র্যাব-৫ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়?ার লতিফ খান এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। পুলিশ সুপারের সাংবাদিক সম্মেলন :গতকাল সকালে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে রংপুর জেলা পুলিশ। এ সময় পুলিশ সুপার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর সাংবাদিকদের জানান, ৩৩টি ওয়ার্ডে ২০৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ৪টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি সেক্টরের নেতৃত্বে থাকবেন ১ জন করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। নির্বাচনে ১শ’ ৭৮টি ভোট কেন্দ্রকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ১শ’ ২২টি ও সাধারণ ৫৬টি। প্রতিটি কেন্দ্রে অস্ত্র ও গুলিসহ পুলিশ এবং অতিরিক্ত আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। মেয়র প্রার্থীরা কোথায় ভোট দেবেন :শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু লায়ন্স স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেবেন। মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ভোট দিবেন কলেজিয়েট স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রে। একেএম আবদুর রউফ মানিক কেরামতিয়া স্কুল কেন্দ্রে, কাওছার জামান বাবলা দেওয়ানটুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, কাজী মাজিরুল ইসলাম লিটন সেনপাড়া স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিবেন বলে জানা গেছে। তীব্র শীত :রংপুরে শুরু হয়েছে হাড় কাঁপানো শীত। দিনের বেশিরভাগ সময় সূর্যের দেখা পাওযা যায় না। কনকনে ঠাণ্ডার সাথে হিমেল হাওয়া কাবু করে ফেলে শীতার্ত মানুষকে। কিন্তু ভোটের উত্তাপে শীত যেন কারো গায়ে লাগছেই না। রংপুর আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা নাজিমুদ্দিন জানান, আজ বৃহস্পতিবার ভোটের দিনসহ আরো কয়েকদিন এ ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করবে। তিনি জানান ঠাণ্ডার পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। সাধারণ ছুটি ঘোষণা :আজ সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ভোটাররা যাতে ভোট দিতে পারেন সে জন্য এ ছুটি ঘোষণা করা হয়। সরকারি আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকায় সবাই নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে কোন্ প্রার্থীকে ভোট দিবেন তা ভেবে নিচ্ছেন। এছাড়া বড় বড় মার্কেটগুলোতে গতকাল কিছু সময়ের জন্য খোলা থাকবে দোকান মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে।