শীর্ষ সন্ত্রাসী ও বহু অপহরণের নায়ক দুখু এখন গাংনীর সীমান্তবাসীর কাছে এক মূর্তিমান আতংক। যার নাম শুনলে নাকি কোলের শিশুরা ঘুমিয়ে পড়ে। সেই দুখু বর্তমানে ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ন্ত্রণ করছে তার বাহিনীর কর্মকাণ্ড। যার প্রমাণ মিলেছে ১২ অক্টোবর র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া দুখু বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড আব্দুর রহমানের জবানবন্দী থেকে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে,গাংনী উপজেলার সীমান্ত সংলগ্ন গ্রাম ধলার আতিয়ার রহমানের ছেলে মিনহাজউদ্দিন ওরফে দুখু। একসময়ের এ মেধাবী যুবক গ্রামের মসলেমউদ্দিনের ছেলে জাহাঙ্গীরের সাথে গড়ে তোলে বন্ধুত্ব। এরই মাঝে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিদেশে যাবার প্রস্তুতি গ্রহণ করে ৫ লাখ টাকা তুলে দেয় কাজীপুরের আদম ব্যবসায়ী জনৈক শওকত আলীর হাতে। কিন্তু বিদেশ যেতে পারেনি ও টাকাও উদ্ধার করতে পারেনি। শেষ- মেষ টাকা উদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে দুখু। এদিকে বন্ধু জাহাঙ্গীর ও তার ৪ ভাই ঐ টাকা উদ্ধার করে দেয়ার আশ্বাস দেয়। কিন্তু এ টাকা উদ্ধার করে দিতে না পারায় তাদের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়। তাদের খুন করার হুমকি দেয়। দুখু চোরাচালানের পাশাপাশি সঙ্গীদের নিয়ে আদম ব্যবসায়ী শওকতের মুখোমুখি হয়। দুখু হাতে তুলে নেয় অস্ত্র। দুখু ভুলে যায় বিদেশ যাবার কথা।
অন্যদিকে ২০০৩ সালে সীমান্তবর্তী খাসমহল রংমহল মাঠে অবৈধ পশুহাট বসানো হয়। যার নিয়ন্ত্রক ছিলো দুখু নিজে ও তার বাহিনীর ক্যাডাররা। দুখু বাহিনী দু’গ্রুপে বিভক্ত হয়। এ সময় দুখুর নামে মামলা হয়। আত্মগোপন করে দুখু। এদিকে পুলিশের অব্যাহত চাপে নিজেকে মুক্ত রাখতে দুখুর মা শাহানুর বেগম দুখুকে ত্যাজ্যপুত্র করেন ২০০৭ সালে। দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে থাকার পর দুখু তত্কালীন পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলমের নিকট উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। এসময় তার ১০ সহযোগীর সবাই ছাড়া পেলেও দুখুকে প্রেরণ করা হয় কারাগারে। কারাগার থেকে দীর্ঘদিন পর ছাড়া পাবার পর দুখু সত্ভাবে জীবন যাপন করার চেষ্টা করে। কিন্তু রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে আবারও যেতে হয় অন্ধকার জগতে। শুরু হয় নানা অপকর্ম ও অপরাধ। দুখুর হাতে এ পর্যন্ত অন্তত ৫ শতাধিক অপহূত হয়েছে। খুন হয়েছে একডজন।
একাধিক সূত্র জানায়, দুখু হাট-ঘাট ইজারা, টেণ্ডার ছিনতাইর নেতৃত্ব দিতো। তার দলে ক্যাডার হিসেবে ছিল ধলা গ্রামের খোদা বক্সের ছেলে সিদ্দিক, আকবতের ছেলে শহিদ, হোসেনের ছেলে আজিমু্দ্দিন, আজিজুলের ছেলে মোমিনুল, নওয়াপাড়া গ্রামের আলামিন, রামকৃষ্ণপুরের অহম, রহিদুল, বাহারুল, তাহাজ, কাবুল, কামরুল, শাহিন, হারুন, কালু, জাকির, জিয়া, সাবদার, রশিদ, বাবু, বকুল, মালেক, তোযাম্মেল, সিদ্দিক মালিথা, মোফাজ্জেল, আজমাইল, ওবায়দুল, মোয়াজ্জেল প্রমুখ। অভিযোগে প্রকাশ, দুখুর হাতে যে সকল খুনের ঘটনা ঘটেছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- শ্যামপুর গ্রামের ইনামুল, নওয়াপাড়া গ্রামের তাহের ও হাফিজুল, বেলতলা পাড়ার স্বপন ও সুজন, সহগলপুর গ্রামের হারান ও আতিয়ার, রঙমহল গ্রামের আয়ুব, উজলপুর গ্রামের মান্নাফ মেম্বার, শিশিরপাড়ার নবীছুদ্দিন, রাধিকানগরের মারফত, ভবানীপুর গ্রামের আমজাদ, কুলবাড়িয়ার হামিদুল। দুখুর সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ধলা গ্রামের তিন খুন। ২০০৮ সালে এমদাদ মেম্বার, জাহিদুল এবং রুহুল আমিনকে অপহরণের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ায় এদেরকে নির্মমভাবে গুলি ও জবাই করে হত্যা করে। একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, দুখু ও তার বাহিনীর লোকজন সীমান্ত এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় ভারত থেকে সহজেই এদেশে প্রবেশ করে অপরাধ সংঘটিত করে নির্বিঘ্নে কেটে পড়ে। আরও জানা যায় দুখু ভারতের কাঠালিয়া, ধাড়া এলাকায় দু’টি বিয়ে করেছে এবং ঐ এলাকার এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়ে থেকে পুলিশের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে নানা অপরাধ সংঘটিত করছে। দুখুকে গ্রেফতার করার ব্যাপারে একাধিকবার ভারতের বিএসএফ ও বাংলাদেশের বিডিআর পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। ভারত সরকার দুখুকে গ্রেফতারের সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দেয়। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে মেহেরপুরের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, দুখু বাহিনীর লোকজনদের গ্রেফতারের জন্য প্রশাসন তত্পর।
