বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর উন্নত দেশের অর্থনীতির সংগ্রাম আজও শেষ হয়নি। আগামী বছর ২০১৩ সালে বৈশ্বিক চাহিদা ও প্রবৃদ্ধিতে আগের চেয়েও তাদের কম ভূমিকা থাকবে। এখন প্রশ্ন হল, অন্যান্য দেশের অর্থনীতি কি বিশ্ব অর্থনীতির সেই শ্লথগতি কাটিয়ে উঠতে পারবে? বিশেষ করে থাইল্যান্ডের মতো উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক জিএনপির ( গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাকশন) প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কিন্তু এসব দেশ কোন্ পথে এগুবে তাই এখানে প্রধান আলোচ্য বিষয়। তারা কি সংরক্ষণবাদ বা নিজেদেরকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে না পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক যোগাযোগ বাড়ার কাজে ভরসা রাখবে?
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। এই মুহূর্তে শুধু রফতানির জন্য বাজার ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে ভাবলে চলবে না, সামগ্রিকভাবে বাণিজ্য অংশীদারদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও গতিশীলসম্পন্ন এমন দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য অংশীদার খুঁজে বার করতে হবে, যাতে নিজেদের কল্যাণ সাধিত হয়। বর্তমানে ইউরো জোনের অর্থনীতির গতিধারা বদলে যাচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তি, আবিষ্কার, সৃজনশীলতা ও ডিজাইনের ক্ষেত্রে এখনও তারা প্রধান উত্স। তাদের এই অবদান দীর্ঘমেয়াদে আমাদের জন্যও সমানভাবে তাত্পর্যপূর্ণ। আসলে আমরা একে অন্যের পরিপূরক ও গ্রাহক এবং সমৃদ্ধির জন্য পরস্পর নির্ভরশীল।
যদি এভাবে চিন্তা করা যায়, তাহলে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্কোন্নয়নের জন্য অধিকতর ভাল মডেল বা আদর্শ আমরা পেতে পারি। একে অপরের দেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে পারস্পরিক প্রবৃদ্ধিই শুধু অর্জিত হবে না, বাড়বে কর্মসংস্থানও। মূলত ভাল খাতে প্রবৃদ্ধি ও ভাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হাত ধরাধরি করে চলে। এরপরই কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হতে পারে। আনতে পারে দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক স্থিতিশীলতা। ২০১৩ সালে বিনিয়োগই অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গভীর করতে পারে। এখানে আমি বিনিয়োগকে কানেকটিভিটি বা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দেখতে চাই। যেমন উচ্চ গতিসম্পন্ন রেলওয়ে চালুর ফলে থাইল্যান্ডের সাথে উত্তর-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ ঘটতে যাচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী দাউই ও লেমচাবাং গভীর সমুদ্রের কাছে একটি সেতু তৈরি হলে তা ভারত মাহসাগরকে প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত করবে। এ ধরনের সংযোগ পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মূল্য বাড়াতে সহায়তা করবে। এতে নিশ্চিত হবে অধিক কর্মসংস্থান। তবে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে আমাদের বিভিন্ন দেশের ‘জনগণের সাথে জনগণের’ সংযোগ স্থাপনও দরকার। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় এটা হচ্ছে প্রধান দাওয়াই। অনুরূপভাবে জ্ঞান ও সৃজনশীলতার অংশিদারে কানেকটিভিটি অব আইডিয়াজ বা চিন্তাধারার ক্ষেত্রেও সংযোগ স্থাপন আবশ্যক।
২০১৫ সালের মধ্যে অধিক উত্পাদনশীল এলাকা হিসেবে পরিগণিত হতে এই কানেকটিভিটিকেই প্রধান অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছে আশিয়ান দেশসমূহ। উল্লেখ্য, এতদঞ্চলে ৬০ কোটি লোকের বসবাস। এটা আসিয়ান অঞ্চলের সংহতিও রক্ষা করবে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও পরিকল্পিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশিদারিত্বের ভিত্তি হবে এই পারস্পরিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান। এভাবে একসময় এশিয়া-প্যাসেফিক অঞ্চলের ১৬টি দেশ উপকৃত হবে। এসব দেশের জনসংখ্যা ৩ বিলিয়ন এবং জিডিপির পরিমাণ ১৭ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অন্যান্য অঞ্চলের উন্নয়নের জন্যও এই কানেকটিভিটি দরকার। তবে এই নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কার্যকর হতে পারে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সমুদ্র ও স্থল সীমানা বিরোধ, সম্পদের প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক ও আদর্শগত মতপার্থক্য এসব দেশের মধ্যে দ্বন্দ্বও সৃষ্টি করবে। এক্ষেত্রে যদি কূটনীতি ব্যর্থ হয়, তাহলে নেমে আসবে বড় ধরনের বিপর্যয়। তবে আসিয়ান রিজিওনাল ফোরাম ও জাতিসংঘের মতো বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর সমাধান করতে হবে।
পরিশেষে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে পারস্পরিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সবচেয়ে দরকার আভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা। পৃথিবীতে এখন কোটি কোটি মানুষ ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে। এমতাবস্থায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে জনগণের প্রত্যাশা উপেক্ষিত হতে পারে না। যদি আমরা এই সময়ের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চাই, তবে জনগণকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে অবশ্যই।
লেখক : প্রধানমন্ত্রী, থাইল্যান্ড
ইকোনমিস্ট থেকে ভাষান্তর : ফাইজুল ইসলাম
