যে জীবন হারায় পথে

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩৫
ছোট্ট পলিথিনের ভেতর ময়লাযুক্ত একটা মলিন মুখ। মনে হয় চারপাশের এই আবর্জনার স্তূপের সঙ্গে তার আজন্ম ঘরবসতি। রাতের ল্যাম্পপোস্টের অস্পষ্ট আলোকরেখা ডাস্টবিনের পাশে ঐ পথবাসী মানুষটির নাক, মুখ, কপালে ঠিকরে পড়ছে। আহা! এমন করে কখনো কি ঠিকরে পড়বে পলিথিনের ভেতর ‘ড্যান্ডি’র (এক ধরনের সহজপ্রাপ্য ও কম দামি নেশা) ঘ্রাণে সস্তায় জীবন বিকিয়ে দেয়া পথবাসী এই মানুষগুলোর অন্ধকার জীবনাকাশে? নাকি জীবনের ভাঁজে ভাঁজে কেবলই লুকিয়ে থাকবে না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস! এই পথবাসী মানুষগুলো শুধু প্রয়োজনীয় সামাজিক সেবামূলক কার্যাদির সুযোগ-সুবিধা কিংবা বেকারত্ব, পীড়া, অক্ষমতা, বৈধব্য, বার্ধক্য অথবা অনিবার্য কারণে জীবনযাপনে অন্যান্য অপরাগতার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অধিকার থেকে বঞ্চিত নয়; বঞ্চিত জীবনের মৌলিক অধিকার থেকেও। যদিও মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ২৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে—“নিজের ও নিজ পরিবারের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের নিমিত্ত পর্যাপ্ত জীবনমানের অধিকার প্রত্যেকটি মানুষের রয়েছে”। যে অধিকারের ভেতর অন্তর্ভুক্ত আছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিত্সার অধিকার। এই পথবাসী মানুষগুলোর বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ে দু’বেলা অখাদ্য জুটলেও জোটে না সারাদিনের পরিশ্রম শেষে ঘুমানোর একটু জায়গা। এভাবেই আবাসহীন হয়ে চলেছে তারা বংশ পরম্পরায়। অথচ জাতিসংঘ ১৯৮৫ সালেই ‘সবার জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত’ করার ঘোষণা দিয়েছে। এজন্য প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব বসতি দিবস। আমরা জানি, মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মোদ্দীপনা, স্বাচ্ছন্দ্য ও পার্পাির্শ্বিক অবস্থার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে আবাসন বা বসতি। এজন্য দরকার সুপরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব বসতি। কিন্তু এই পথবাসী গৃহহীন মানুষগুলোর কাছে আজো তা স্বপ্নের মতো। এই জনগোষ্ঠী প্রধানত নদী ভাঙন ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গ্রামে তাদের জমি, আবাসন ও কাজের সুযোগ হারিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে নিঃস্ব অবস্থায় আশ্রয় নেয় রাস্তার পাশে কোনো স্থানে। তাদের অধিকাংশকে দেখা যায় উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোর বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, মাজার, পার্ক ও ফুটপাতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াও আরো নানাবিধ কারণে গৃহহীন এই পথবাসী মানুষগুলোর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক বা রাজনৈতিক কারণে উচ্ছেদ, চাকরি বা ভূমিহীন হয়ে, স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে শুধু নয়, নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হয়েও পথে আসতে অনেকে বাধ্য হয়। আবার কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ সূত্রেই পথবাসী। কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের সহযোগিতায় ২০০৮ সাল থেকে ‘আমরাও মানুষ’ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা শহরে চারটি সংগঠন প্রায় ১২ হাজার পথবাসী পরিবার নিয়ে কাজ করছে। তারা অনুমান করছে, ঢাকা শহরে পথবাসী মানুষের সংখ্যা হতে পারে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার। দেখা যায়, শহরে বসবাসরত বস্তিবাসী, পথবাসী শিশু, মাদকদ্রব্য ব্যবহারকারী ও যৌনকর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার ও উন্নয়ন সংস্থা কাজ করলেও পথবাসী পুরো পরিবার নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থা খুবই সীমিত। ঢাকা শহরের এই আবাসহীন মানুষগুলো আবর্জনা পরিষ্কার, বাজারগুলোতে ট্রাকের মালামাল ওঠানো-নামানো, কাঁচাবাজার থেকে সবজি কুড়িয়ে বিক্রি, রিকশা ও ভ্যান চালানো, দালানকোঠা তৈরিতে নির্মাণ শ্রমিক, বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তাদের উপার্জনের পুরোটাই ব্যয় করে খাবার, পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশন ও অন্যান্য কাজে। গুণগত ও মানসম্পন্ন খাবার, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ইত্যাদি তারা ব্যবস্থা করতে পারে না। তাদের সবচেয়ে সমস্যা পরিবারের উপার্জনকারী সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়লে তখন পুরো পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় ও নিম্ন মর্যাদার কারণে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত হয়। ভাসমান হওয়ায় নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার মনোবৃত্তি থাকে কম এবং সবচেয়ে সমস্যা হয় তাদের আচরণগত দিক নিয়ে। কিছুদিন আগে পথবাসী মানুষগুলোকে আয়বর্ধনমূলক কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত করার প্রয়াসে অনুষ্ঠিত একটি প্রশিক্ষণ পরিচালনার সুযোগ না হলে হয়তো তাদের বিষয়ে এত কিছু জানার সুযোগ আমার হতো না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পথবাসী পুরো পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা, সঞ্চয়, জীবন দক্ষতা ও কারিগরি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, পরামর্শ প্রদান ও সচেতনতা বৃদ্ধি, রাত্রিযাপন কেন্দ্র, দিনের বেলায় বিশ্রামের ব্যবস্থা, গোসল ও রান্নার সুবিধা, শিশু ও বয়স্ক শিক্ষা, মানসিক এবং শারীরিক বিকাশে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ইত্যাদির মাধ্যমে পথবাসীদের জীবনে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব, যেটা তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা পালন করবে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পাশাপাশি প্রয়োজন তাদের ঘিরে সরকারের সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা, যার শুরুতেই সারা বাংলাদেশে আবাসহীন মানুষের সংখ্যা বের করে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে Pavement Dweller Center চালু করা, যেটি তাদের ভবঘুরে ও অপরাধ মনোবৃত্তি পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। শুধু প্রতি বছর বিশ্ব বসতি দিবসের উদ্দেশ্য যেন শীতল রুমের চার দেয়ালের ভেতর সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালায় আবদ্ধ না থাকে, তার প্রায়োগিক রূপ যেন পায় বাস্তবতার নির্মম মাঠেও। প্রয়োজন তাই সরকারের সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম। কারণ বসতহীন এই জনগোষ্ঠী নির্দিষ্ট কোনো কার্যক্রম ছাড়া শুধু বিভিন্ন শুমারি ও বাত্সরিক বাজেট, ভোট দেয়ার অধিকার এবং জন্মনিবন্ধন থেকেই বাদ পড়বে না, হারিয়ে ফেলবে বৃষ্টি, শীত, নানাবিধ অত্যাচার আর নিপীড়ন থেকে চিরতরে মুক্তির পথও। কিশোরগঞ্জ