বাংলাদেশে অন্যায় অবিচার রুখে দেয়ার প্রত্যয়ে শুরু হয়েছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ১৮তম জাতীয় সম্মেলন। ‘জেগে আছি অহর্নিশ অতন্দ্র প্রহর, দেবো না গড়তে ঘাঁটি ভিড়তে নৌবহর’—এ শ্লোগান নিয়ে গতকাল শুক্রবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উদীচীর জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন করেন ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলায় পঙ্গুত্ববরণকারী শিল্পী-কর্মীরা। এরা হলেন-হরেন গোসাই, সুকান্ত দাস, মোহাম্মদ নাহিদ, সমীর বিশ্বাস ও লিয়াকত আলী। এ সময় সম্মেলনের প্রধান অতিথি ইমেরিটাস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর, আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফসহ বিভিন্ন জোটবদ্ধ সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উদীচীর কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ ইদু ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুল আলম, প্রবীর সরদার, জামশেদ আনোয়ার, অমিত রঞ্জন দে’সহ আরো অনেকে। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে শহীদ মিনার থেকে বের হয় শোভাযাত্রা। এতে অংশ নেন সারাদেশ থেকে আগত উদীচীর ৩০১টি শাখা ও সংসদের শিল্পী-কর্মীরা। শোভাযাত্রায় উঠে আসে সমসাময়িক নানা বিষয়। তাদের উপস্থাপনায় বাস্তব হয়ে উঠে সম্প্রতি কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও চট্টগ্রামের পটিয়ায় সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী গোষ্ঠীর তাণ্ডব, স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার-আল বদরদের যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায় ঘোষণা ও শাস্তি কার্যকর করার দাবিসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শোভাযাত্রাটি দোয়েল চত্বর ও অন্য প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে সম্মেলনের মূল ভেন্যু-সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের চত্বরে এসে শেষ হয়।
শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় উদ্বোধনী অধিবেশনের কার্যক্রম। আলোচনা পর্বে গোলাম মোহাম্মদ ইদুর সভাপতিত্বে বক্তারা বলেন, দেশে স্বাধীনতা বিরোধী চক্র চরম ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বানচালের অপচেষ্টা করছে। দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাকামী মানুষকে একজোট হয়ে এই ষড়যন্ত্র রুখতে হবে। বক্তারা আরো বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য জামায়াত-শিবির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করার আহ্বান জানান হয়। একই সঙ্গে ’৭২ এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিও জানান বক্তারা।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমাদের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা ছিল শ্রেণী সংগ্রামকে স্পষ্ট করার জন্য। জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে আমরা জিতেছি। শ্রেণী সংগ্রামকে আমরা এখনো স্পষ্ট করতে পারিনি। এর জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
উদীচী বোমা হামলায় পঙ্গুত্ববরণকারীদের পক্ষে সুকান্ত দাস বলেন, যখনই অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন ও সমাজের সকল বৈষম্য, বঞ্চনা, অন্যায়-অত্যাচারের আন্দোলন হয়েছে তখনই আঘাত হেনেছে সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী গোষ্ঠী। তিনি বলেন, এতে উদীচী ভয় পায় না। যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটি থেকে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িক শক্তির মূলোত্পাটন না হবে, ততদিন পর্যন্ত উদীচীর সংগ্রাম চলবে।
আলোচনা সভা শেষে শুরু হয় সম্মেলনের সাংগঠনিক অধিবেশন। এ অধিবেশনে উদীচীর নানা গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বিষয়ে আলোচনা করেন সম্মেলনে উপস্থিত এক হাজারেরও বেশি প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক প্রবীর সরদার। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন আজ শনিবার সকাল ৯টায় শুরু হবে সাংগঠনিক অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্ব। বিকালে নতুন কমিটি ঘোষণা ও শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হবে সম্মেলনের সাংগঠনিক অধিবেশন। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা।
