অর্থনীতিতে পাঁচ চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৩
বিনিয়োগ নেই, রাজনীতিতে অস্থিরতার শংকায় উদ্বিগ্ন শিল্প-উদ্যোক্তারা। সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আগামী নির্বাচনকালীন যে অনিশ্চয়তার কথা বলা হচ্ছে তা আরো বেশি ক্ষতি করছে অর্থনীতির। কিছু নীতিগত কারণেও অর্থনীতি পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরাও। তারা রাজনৈতিক সংকট বাদ দিয়েও এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতিতে পাঁচটি চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন। তাদের মতে, এসব চ্যালেঞ্জ সঠিকভাবে মোকাবিলা করার উদ্যোগ না নেয়ায় আগামীতে অর্থনীতিতে সংকট আরো বাড়বে। অর্থনীতির সামনে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে- রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা, জনশক্তি রফতানির বাজারে অস্থিরতা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কৃষিজমির ওপর অব্যাহত চাপ, দারিদ্র্য নিরসনে স্থায়ী ব্যবস্থার অভাব এবং ধনী-গরিব বৈষম্য বৃদ্ধি। চ্যালেঞ্জগুলো বর্তমান সরকারের রূপকল্প ২০২১ এর লক্ষ্য অর্জন নিয়েও সংশয় সৃষ্টি করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে ২০২১ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন ও অগ্রগতির যে একটা পর্যায়ভিত্তিক লক্ষ্য বর্তমান সরকার নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করাই মূল উদ্দেশ্য । ফলে সরকারের জন্য এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী। তিনি বলেন, বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও ভাল করছে, বিশ্বের এরকম দশটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশ একটি। অন্ততঃ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন, আমদানি-রফতানি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর দিক থেকে। কিন্তু অতিসমপ্রতি পরিস্থিতি ঠিকভাবে এগুচ্ছে না। চ্যালেঞ্জগুলোই বরং বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, সীমিত পরিসরের অর্থনীতিতে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধি অর্জন ধরে রাখার পাশাপাশি গত ১৫ বছরে গড় রফতানি প্রবৃদ্ধি করেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। ১৯৯৪ সালে দেশের রফতানি আয় ছিল ২৫৩ কোটি ডলার। যা ২০০৯-এ এসে দাঁড়িয়েছে ১,৫৫৬ কোটি ডলারে। ২০১২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এসে দাঁড়িয়েছে ১০১৩ কোটি ডলার। একইভাবে গত এক দশকে প্রবাসীদের কাছ থেকে পাওয়া রেমিটেন্সের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ দশমিক ০৩ শতাংশ। ১৯৯৪ সালে দেশে রেমিটেন্স এসেছিল ১১৫ কোটি ডলার। যা ২০০৯-এ বেড়ে হয়েছে প্রায় ১,১০০ কোটি ডলার। ২০১২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ১৪শ’ ৬৪ কোটি ডলারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ১৫ বছরে ১০০ কেটি ডলার থেকে বেড়ে ১২শ’ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশই আসছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তাও তৈরি পোশাকের রফতানি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেই সীমাবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার দেশগুলোকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ায় এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে সুবিধাজনক বাজার প্রবেশাধিকার দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরিপোশাক আরো প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়বে। ইইউতে বাংলাদেশের তৈরিপোশাক রফতানি ভালই চলছিল। ইইউ ১০ জাতির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ান এবং ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা প্রায় শেষ করে এনেছে। এদিকে ভারত ২০১০ সালেই আসিয়ানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে। চীনও আসিয়ান, ভারত ও ইইউ’র সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আফ্রিকার দেশগুলোর প্রতি ইইউ’র সহানুভূতি আরো বাড়ছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের তৈরিপোশাক দুটো বৃহত্ বাজারেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে। নতুন বাজার সৃষ্টির মাধ্যমেই কেবল এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব। তৈরিপোশাক খাতের সঙ্গে কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য নিরসন সম্পর্কিত বিধায় এটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। রফতানি পণ্য বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগও নিতে হবে সরকারকে। বর্তমান সরকারের শুরুতে ২০০৯ সালে জনশক্তি রফতানি প্রায় অর্ধেকে নেমে যায়। তারপরও রেমিটেন্স ভালই বেড়েছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের জনশক্তির নতুন চাহিদা সৃষ্টি করতে না পারলে মেয়াদ পূর্তির পর শ্রমিকরা দেশে ফিরে আসলে রেমিটেন্সও কমতে শুরু করবে। তাই নতুন বাজার খুঁজে বের করা এবং চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করা একটি চ্যালেঞ্জ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমি কমছে। কম জমিতে অধিক ফসল উত্পাদন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান অক্ষুণ্ন রাখা এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, সরকার ও এনজিওগুলোর ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে দারিদ্র্য কিছুটা কমছে। কিন্তু দারিদ্র্যের সংখ্যা হ্রাসে তা যথেষ্ট নয়। এজন্য গ্রামে-গঞ্জে স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য নিরসনের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। দারিদ্র্য এবং নিম্ন আয়ভোগী মানুষের সংখ্যা কমাতে না পারলে ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়বেই। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা সম্ভব হলেও সমাজের ৯০ শতাংশ মানুষ সাধারণ আয়ের আবর্তেই থেকে যাবে। এর ফলে ব্যাপক সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তাই ভবিষ্যত্ অর্থনীতির জন্য ছোট-বড় সবগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যেই সরকারকে পরিকল্পনা নিতে হবে। অর্থনীতির তিনটি সূচকের ভাল অবস্থা থাকলেও বিদ্যুত্- জ্বালানি, বিনিয়োগ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রত্যাশিত অর্জন হয়নি। বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে জোট সরকারের ব্যর্থতার কথা বার বার বলা হলেও বর্তমান সরকারও বিগত সময়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি ঘটাতে পারেনি। যে কারণে বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে আগ্রহী করা যায়নি। অথচ উত্পাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশের এখন বড় প্রয়োজন বিনিয়োগ। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও স্বীকার করেছেন, দেশে বিনিয়োগ মন্দা চলছে। বিনিয়োগ বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী ২০১১ সালে ১৯৭৪টি প্রকল্পে দেশি-বিদেশি মোট বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ছিল ১০,৩১,০৭৫ মিলিয়ন টাকা। আর চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১৬০১টি প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ৪,৯৮,১৮৭ মিলিয়ন টাকা। সামপ্রতিক মাসগুলোতে বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ আরও কমে আসছে। গত অক্টোবরে দেশে ১৪৩টি প্রকল্পে স্থানীয় বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ৩৬,৮৯৬ মিলিয়ন টাকা। একই সময়ে ২৩টি যৌথ ও শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৩৮৯ মিলিয়ন টাকা। অথচ চলতি বছরের জানুয়ারিতেও ১৬৫টি প্রকল্পে স্থানীয় বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৫৯৪০৩ মিলিয়ন টাকা। এ সময় ২১টি প্রকল্পে যৌথ এবং শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ৬২৫৮ মিলিয়ন টাকা। বিনিয়োগ এভাবে কমতে থাকলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব বড় হয়ে দেখা দিবে বলে মনে করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান। তিনি বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট দূর করে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এছাড়া ব্যাংক সুদের হারও নিম্নমুখী রাখতে হবে। বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারের আন্তরিকতা দেখানোর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে চাইবে না। আর বিনিয়োগ কমতে থাকলে দেশের কর্মসংস্থান কমে গোটা অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।