যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, আগামী নির্বাচন এবং দেশে অস্থিতিশীলতা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে নানা উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, দেশকে অস্থিতিশীল করে একটি গোষ্ঠী ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা এর সঙ্গে যুক্ত। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র এখনো ক্রিয়াশীল বলেও মনে করেন তিনি। প্রধান বিরোধীদল বিএনপির হরতালের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হরতাল আহ্বানের বিষয়টিতে ক্ষমতাসীন দল ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছে। তারা মনে করে, সরকারের সামনে যে কয়টি বড় রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে সেগুলো বানচালের জন্য মাঠে একটি বিরোধী লবি কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর বাইরে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যেও উদ্বেগের কথা ফুটে উঠেছে।
গত ১৭ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিজয় দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করতে বিদেশি একটি মহল দুদকের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা মনে করেন, সরকারকে দুর্নীতিবাজ বানিয়ে হেয় করতে পারলে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করা যাবে। তিনি বলেন, রামুতে সন্ত্রাস, গার্মেন্টস-এ অগ্নিকাণ্ড এবং বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকের ক্ষমতায় যাবার খায়েশ আছে কিন্তু জনসমর্থন নেই। এজন্য তারা অপপ্রচারে লিপ্ত। তার মতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র এখনো ক্রিয়াশীল। তিনি এদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
এদিকে গতকাল ১৪ দলের এক অনুষ্ঠানে আ্ওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিএনপি-জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্র ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু যত চেষ্টাই করা হোক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই। অপর প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, গত বছর বেগম জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ ডেকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি দেশকে তাহরীর স্কয়ার বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আজ নিজেই স্কয়ারে আবদ্ধ হয়ে গেছেন। যারা মনে করে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁঁচানো যাবে, তারা আহাম্মকের স্বর্গে বাস করছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই হবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সব ষড়যন্ত্র নস্যাত্ করে খালেদা জিয়াকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হবে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার যশোরের ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী অরাজকতা সৃষ্টি করে দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে চান। কিন্তু যারা যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যা করে জনগণ তাদের কোনদিনই ক্ষমতায় দেখতে চায় না।
১৯ ডিসেম্বর মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে সামরিক বাহিনী এবং সরকারি কর্মকর্তাসহ দেশপ্রেমিক সকল শক্তির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা যেখানেই দায়িত্ব পালন করেন না কেন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি যাতে আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নস্যাত্ করে দিতে না পারে সে ব্যাপারে আপনাদের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
এদিকে গত ২৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক জনসভায় বলেন, বিরোধীদল যত জ্বালাও পোড়াও আর লাশের রাজনীতি করুক না কেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই। জাতির পিতার খুনিদেরও বিচার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে। তা সফল হয়নি। সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে একটি লবি মাঠে কাজ করছে। বিচারপতির স্কাইপে সংলাপ প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে। এরপরও সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ চলতি মেয়াদে শেষ করতে বদ্ধপরিকর। এর বিরুদ্ধে হরতাল বা জ্বালাও পোড়াও রাজনীতি কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।
এদিকে সরকার সংবিধান অনুযায়ী আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনড় অবস্থানে আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনের জন্য একটি খসড়া সময়সূচিও উল্লেখ করেছেন। তিনি ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারির মধ্যে যেকোনো সময় নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। তবে কোনভাবেই অনির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নির্বাচনে যেতে চান না তিনি। গত ১২ নভেম্বর চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকারের ৬ হাজারেরও বেশি নির্বাচনের সবগুলোই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। একটি নির্বাচন নিয়েও কেউ অভিযোগ তোলেনি। আওয়ামী লীগ যে জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করে তা এসব নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। জনগণ নিজেদের পছন্দ মতো প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছে, যা অতীতে কোনদিন হয়নি।
১৩ নভেম্বর যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মালিক জনগণ। বঙ্গবন্ধু একটি সংবিধান রেখে গেছেন। জনগনেনর ক্ষমতায়নের বিষয়টি আমরা শিখেছি সংবিধান থেকে, জনগণের কাছ থেকে। ক্ষমতায় কারা যাবে তা জনগণই নির্ধারণ করবে।
এর একদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে আগামী নির্বাচন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক জনগণ। তাদের ভোটের অধিকার রয়েছে। অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে জনগণকে তাদের পছন্দসই প্রতিনিধি নির্বাচিত করার সুযোগ করে দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
‘আবার ক্ষমতায় আসলে দেশের চেহারা পাল্টে দেবো’- বিরোধী দলীয় নেত্রীর এমন বক্তব্যের জবাবে গত ২২ নভেম্বর গণভবনে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি ক্ষমতায় আসলে দেশের চেহারা পাল্টে দিয়ে দেশকে আবারো সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের দেশে পরিণত করবেন। দেশে আবারো বোমা ও গ্রেনেড হামলা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, খালেদা জিয়া রাজাকার আল-বদরদের আবার ক্ষমতায় এনে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
