পতনের মুখে সিরিয়ার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের মসনদ। মসনদের পা গুলো যেন এক এক করে ভাঙ্গতে বসেছে। ঠিক যেন ইরাক, মিশর এবং লিবিয়ার মতোই। ৪১ বছর ক্ষমতায় থাকার পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে ছিটকে পড়তে যাচ্ছেন লন্ডনের এই জামাতা। আসাদ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে দেশটির জনগণ। চারদিকে কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই। চলছে হানাহানি। প্রতিদিনই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। আর মৃত্যু যেন সাধারণ মানুষের জন্য। অথচ এসব সাধারণ মানুষ কি কখনো ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করতে পারে? সেটা আসাদ থাকুক বা না থাকুক। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আসাদ চলে গেলেই কি সিরিয়ার সমস্যার সমাধান হবে। নাকি ইরাক, আফগানিস্তানের মতোই বিদেশি সেনাদের অধীনে থাকবে! সেই সরকার কী একটি পুতুল সরকারে পরিণত হবে?
১৯৪৬ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে সিরিয়া। ১৯৬৩ সালে দেশটির ক্ষমতায় আসে প্যান আরব ন্যাশনালিস্ট বার্থ পার্টি। ১৯৭০ সালে প্রেসিডেন্ট আসাদের পিতা হাফেজ আল আসাদ ক্ষমতা দখল করেন। পার্টির শ্লোগান ‘একতা, স্বাধীনতা এবং সমাজতন্ত্র।’ ২০০০ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর ক্ষমতায় আসেন বাশার আল আসাদ। সামপ্রতিক বছরগুলোতে সিরিয়া আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর কারণ হিসাবে বলা হয় ইরাক, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং লেবাননে দেশটির নেতিবাচক ভূমিকার জন্য। রয়েছে ইসরাইল বিরোধী ভূমিকাও। এই ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, উপসাগরীয় দেশগুলো, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন দেশটির বিদ্রোহীদের সংগঠন ন্যাশনাল কোয়ালিশন অব দ্য সিরিয়ান রেভ্যুলেশনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আসাদ যখন ২০০০ সালে ক্ষমতায় আসেন তখন তাকে একজন সংস্কারক হিসেবেই পছন্দ ছিল ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলোর। কিন্তু তার শাসনকার্যে ক্রমেই তার পিতার আচরণ প্রতিফলিত হতে থাকে। ধীরে-ধীরে সিরিয়ার উদারপন্থী তথা পশ্চিমা বিশ্বের আশা মিইয়ে যেতে শুরু করে। আর এটা চরম পর্যায়ে পৌঁছায় ২০০৫ সালে বার্থ পার্টির সম্মেলনের পর। ঐ সম্মেলনেই দেশটির উদারপন্থী ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এরপর থেকে মানুষের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। দেশটির সুন্নী মুসলমানদের ওপর দমন নিপীড়নেরও অভিযোগ আছে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে।
বিবিসি জানায়, আসাদের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কেবল জনগণই দায়ী নয়। মূলত দায়ী তার পারিবারিক কলহ, সদস্যদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি। এ যেন মিশরের স্বৈরাচারী হোসনি মোবারকের পরিবারের নকল। জানা যায়, আসাদের বড় ভাই আবদেল নুর বাসিল ছিলেন সেনাবাহিনীর মেজর। বাবা হাফেজ আল আসাদের উত্তরসূরী হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু বাসিল ১৯৯৪ সালে এক দুর্ঘটনায় মারা যান। ২০০০ সালে পিতা মারা যাওয়ার পর ক্ষমতায় আসেন আসাদ। তিনি নিজে ক্ষমতায় আসতে চাননি। সে জন্য তেমন কোনো প্রস্তুতিও ছিল না। আসাদ ক্ষমতায় আসার পর স্বাভাবিকভাবে তার স্ত্রী আসমা আসাদের ক্ষমতা বেড়ে যায়। বিবিসি জানায়, আসাদের স্ত্রী আসমা আসাদ ব্রিটেনের মেয়ে। চক্ষু বিশেষজ্ঞ আসাদ দেড় বছর ধরে ব্রিটেনে প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেছেন। এরপর তিনি বিয়ে করেন আসমা আসাদকে। আসমা আসাদ পশ্চিমা বিশ্বে তথা আসাদ সরকারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ধরে রাখতে সহায়তা করেন। এমনকি ব্রিটেনের একটি পাবলিক রিলেশন কোম্পানি ‘বেল পুতিনজার’ তার ভাবমূর্তি টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু এক্ষেত্রে তার মা এবং বোন বাদসাধে। তারা আসমার ক্ষমতাকে সহ্য করতে পারেননি। তারা আসাদকে তার পিতার ধাঁচে ক্ষমতা চালানোর পরামর্শ দেন। পরিবারের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়তে থাকে। আসাদের ভাই মাহের সেনাবাহিনীর রিপাবলিকান গার্ডের প্রধান। তার অধীনে ব্রিগেডগুলো তার নির্দেশকে উপেক্ষা করতে পারে না। আসাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু আইমান আবদেল নূর বলেন, দেশটির সমস্ত ক্ষমতা পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত। আসাদের আশেপাশের সবাই কম বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। আসাদের পরিবার জানে তাদের পরিবারের একজনের পতন হলে তাদের সবার ক্ষমতার পতন হবে। গুজব ছিল মাহের আসাদের কাছ থেকে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করতে পারেন। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, আসাদের চাচা ১৯৮৩ সালে হাফেজ আল আসাদের কাছ থেকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেছিলেন। মাহেরের বিরুদ্ধে লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনেও তার জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আসাদের চাচাত ভাই রামি মাখলুফের হাতে বন্দী দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনীতি। দেশি বিদেশি যে কোনো কোম্পানিই হোক না কেন সিরিয়ায় ব্যবসা করতে হলে তার অনুমতি ছাড়া সম্ভব না। আসাদ দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও রামি যেন দুর্নীতির মধ্যেই নিমজ্জিত। আর এর ভার বহন করতে হচ্ছে আসাদকে।
গত ১১ নভেম্বর কাতারে দেশটির বিদ্রোহীদের সংগঠনকে স্বীকৃতি দেয় পশ্চিমা দেশগুলো। এর নেতৃত্বে আছেন ভূতত্ত্ববিদ শেখ আহমেদ মোয়াজ আল খতিব। তিনি একজন আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত। তিনি দামেস্কের উমায়াদ মসজিদের সাবেক ইমাম(পিতার উত্তরসূরী)। একজন উদারপন্থী হিসাবে সিরিয়ায় তার সুনাম রয়েছে। তিনি আসাদের পিতার সময় থেকেই নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন। তার কার্যক্রমকে আসাদের পিতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। কিন্তু আসাদ সরকার তার উপর নির্যাতন শুরু করলে তিনি গত এপ্রিলে মিশরের কায়রো পালিয়ে যান। তার বন্ধুরা তাকে জানায়, তিনি দেশে থাকলে হয় নিহত বা নিখোঁজ হয়ে যেতে পারেন।
সিরিয়ায় পশ্চিমা বাহিনী আক্রমণ করতে পারে এমন গুজব শোনা যায়। কারণ ইরাকে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের বুশ প্রশাসন অভিযোগ করেছিল সাদ্দামের কাছে রাসায়নিক অস্ত্র আছে। আর সাদ্দাম সেটা বরাবর অস্বীকার করেছিল। এর পরিণতিও ভোগ করতে হয় তাকে। বর্তমানেও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আসাদ সরকার স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র এবং রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে বা চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। তবে আসাদ সরকার সাদ্দাম হোসেনের মতো রাসায়নিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তিনি বলেছেন, এসব অস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে সিরিয়ায় পশ্চিমা বাহিনীর আক্রমণের কোনো সুযোগ নেই। ব্রিটেনে বসবাসরত সাংবাদিক মালিক আবদেহ বলেছেন, সিরিয়ায় পরিস্থিতি যতোই খারাপ হোক না কেন জনগণ বিদেশি সৈন্যদের কখনো মেনে নেবে না। ইউএস হাউস কমিটি অন ইন্টেলিজেন্স এর চেয়ারম্যান মাইক রজার্স বলেন, রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌছাতে না পারলেও এ অঞ্চলের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেবে। বিশেষ করে এগুলো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে পড়লে সেটি ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে।
সিরিয়ার সাধারণ জনগণের মনে তথা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আসাদের পরে কে আসবে ক্ষমতায়? তিনি কি সত্যি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে না কি কোনো দেশের অধীনে পুতুল সরকারে পরিণত হবে। তবে সাধারণ মানুষ যাই ভাবুক না কেন ক্ষমতাশালী দেশগুলো কিন্তু তা নিয়ে চিন্তা করছেই। এক্ষেত্রে মোয়াজকে তাদের পছন্দ বলে মনে হচ্ছে। তবে মোয়াজ ক্ষমতায় এসে পরবর্তী পরিস্থিতিকে সামাল দিতে পারবেন সেটাই দেখার বিষয়। কারণ ইরাক, লিবিয়া এবং মিশরের অভিজ্ঞতা খুব বেশি ভাল নয়। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া এবং মিশরে এখনো সহিংসতা চলমান। সিরিয়ায় শিয়া, সুন্নী, আমের্নীয়া, আশেরিয়ান, খ্রিস্টান, দ্রুজ এবং আলাওয়াত ধর্মের অনুসারী রয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীকে সামাল দেয়া যে কঠিন হবে সেটি সহজেই অনুমেয়।
রাশিয়া আসাদের মিত্র দেশ। কিন্তু সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, প্রেসিডেন্ট আসাদের ভাগ্য নিয়ে রাশিয়া চিন্তিত নয়। দেশটির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তো বলেছেন, সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে তার বক্তব্যকে ব্যক্তিগত বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এতেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট আসাদের ক্ষমতা নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করেছে, রাশিয়া এবং চীন সিরিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘে কোনো প্রস্তাব গ্রহণে বাধা দিচ্ছে। লিবিয়ার ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে ন্যাটো বাহিনী নিয়োগ করা হয়েছিল। এতদিন রাশিয়া তেমন তোড়জোড় না করলেও রাশিয়ার হঠাত্ করে এ ধরনের মন্তব্যে দেশটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। লিবিয়ার ক্ষেত্রে দেশটি গাদ্দাফির পক্ষে অবস্থান নিলেও পরে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপে সরে যায়। অথচ লিবিয়ায় অবকাঠামোগত খাত গড়ে ওঠে রাশিয়ার সহায়তায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতাশালী দেশগুলো আসলে দেশের কোনো ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেয় না। জনগণের কাছে ব্যক্তির মূল্য শেষ হয়ে গেলে এই দেশগুলোর কাছেও তিনি মূল্যহীন হয়ে পড়েন। মূলত এরা দেশের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেন। দেশের স্বার্থ আদায় হলেই কেবল কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছান। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যতো সহিংসতা থাকবে ততো অস্ত্র বিক্রি বাড়বে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। রাশিয়ায় এ বছর সবচেয়ে বেশি অস্ত্র বিক্রি হয়েছে। চীন এখন পর্যন্ত সিরিয়া নিয়ে তেমন কোনো মন্তব্য করেনি। কেবল দুই পক্ষের সমঝোতাই তাদের কাম্য বলে জানিয়েছে।
কি আছে আসাদের ভাগ্যে? ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, না লিবিয়ার গাদ্দাফি নাকি মিশরের হোসনি মোবারকের মতো। নাকি লন্ডনের জামাই হয়ে থাকবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো এখনো মনে করে আসাদ তার আচরণ পরিবর্তন করবেন। যুক্তরাষ্ট্র আসাদের ভাই এবং তার চাচাত ভাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও আসাদের ওপর এখনো কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। আসাদের ভাগ্য নির্ভর করছে জয়-পরাজয়ের ওপর। বিদ্রোহীরা জয়ী হলে হয়তো মোবারকের পরিবারের মতো পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে তাকে এবং তার পরিবারকে। তবে বিদ্রোহীদের এখানো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আলেপ্পো শহরের অধিকাংশ বিদ্রোহীরা দখল করলেও দামেস্ক এখনো অনেক দূরে। ক্ষমতা দখল করতে রাজধানী দামেস্কই প্রধান। তবে আগামী জানুয়ারিতে সিরিয়া ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মধ্যে আলোচনা হতে পারে। ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেয়ার পর পুতিন এবং ওবামার মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন সিনেটর জন কেরি। বিবিসি জানিয়েছে, জন কেরির সঙ্গে আসাদের পরিবারের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। এর আগে তিনি মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসাদ এবং তার পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি তাদের পরিবারের বিশেষ করে আসমা আসাদের সঙ্গে ইসরাইল ইস্যু নিয়ে আলোচনাও করেছেন।
