আর্থিক খাতে দুর্নীতির ঘটনাবহুল বছর

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩০
আর্থিক খাতে অনিয়ম আর দুর্নীতির ঘটনাবহুল একটি বছর ছিল ২০১২ সাল। সোনালী ব্যাংকে দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে এ বছর। রাষ্ট্র মালিকানাধীন অন্য ব্যাংকে এবং কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকেও বড় অংকের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আলোচনায় ছিল ডেসটিনি ও পদ্মা সেতুতে বড় অঙ্কের দুর্নীতির ঘটনা। বীমা খাতেও ধরা পড়েছে বড় অঙ্কের দুর্নীতি। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর এ বছর ব্যাংক ও বীমা খাতের বড় বড় দুর্নীতিতে গোটা আর্থিক খাত নিয়েই শঙ্কা জেগে উঠে। ফলে ব্যাংকের আমানত, আস্থা এবং দেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতির উপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এদিকে বছরের শুরুর দিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান তারল্য সংকটের মধ্যে এগুলোর কার্যক্রম শুরু করা নিয়ে ছিল সংশয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে সোনালী ব্যাংকে দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের সর্ববৃহত্ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। ব্যাংকটির রূপসী বাংলা হোটেল শাখা হতে তিন হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাত্ করা হয়। একই ব্যাংকের আগারগাঁও শাখায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রায় ১৪১ কোটি টাকার ঋণ দেয়া হয়। এছাড়া ব্যাংকটির গুলশান শাখাতেও বড় অঙ্কের অনিয়ম ধরা পড়ে। সোনালী ব্যাংকের পর রাষ্ট্রমালিকানাধীন রুপালী ব্যাংকেও বড় অঙ্কের জালিয়াতি ধরা পড়ে। ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের লোকাল শাখায় ৮০১ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতে। অগ্রণী ব্যাংকেও ধরা পড়ে দুর্নীতির ঘটনা। এসব ব্যাংকগুলোর দুর্নীতি একের পর এক প্রকাশ পাওয়ার পর বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংকে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ধরা পড়ে। বীমা খাতের সাধারণ বীমা করপোরেশনেও এ বছর বড় অঙ্কের দুর্নীতির প্রমাণ পায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিশ্লেষকরা বলছেন, আর্থিক খাতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাবই দুর্নীতির বড় কারণ। ব্যাংক কর্মকর্তারা না চাইলেও অনেক সময় অনিয়মের সঙ্গে আপোষ করতে হয় রাজনৈতিক চাপের কারণে। ঋণ পাওয়ার যোগ্য না হলেও ঋণ দিতে হয় বাধ্য হয়ে। সূত্র জানায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে যেসব ঋণ বিতরণ করা হয় তার বেশিরভাগই দেয়া হয় দলীয় বিবেচনায়। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া এসব ঋণ পরে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণে পরিণত হয়। ব্যাংক সংশ্লি¬ষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের পক্ষ থেকে এসব ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করা হলেও ব্যাংকের পরিচালক কিংবা চেয়ারম্যানের সুপারিশে ঋণ দিতে হয়। সব সরকারের আমলেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দলীয় লোকদেরকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বসানোর কারণে এ ব্যাংকগুলোতে সবসময়ই দুর্নীতির প্রকোপ থাকে বেশি। দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে আর্থিক খাতে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। অর্থনীতিবিদ খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান বলেন, কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ এবং ঋণখেলাপি নয় এমন ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দেয়া উচিত। অথচ কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি না মেনে পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আর্থিক খাতের মতো বিশ্লেষণধর্মী জায়গায় অর্থনীতি বা ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ক তেমন কোনো শিক্ষা না থাকলেও শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অনেককে পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ দেয়া হয়। এসব পরিচালকরা ব্যাংকের বিভিন্ন ফাঁক-ফোকর ধরতে পারেন না। ফলে ব্যাংক কর্মকর্তাদের দুর্নীতিও তারা ধরতে পারেন না। চলতি বছরের এপ্রিলে নয়টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সাবেক গভর্নরসহ দেশের বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদদের বারণ উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য নতুন ব্যাংক অনুমোদনের বিপক্ষে ছিলেন। আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরে কিছু সঙ্কট থাকা সত্ত্বেও নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়ায় এ সঙ্কট আরও বাড়বে। তারা বলছেন, নতুন ব্যাংক কাজ শুরু করলে এ সেক্টরে এক ধরনের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। বিদ্যমান আমানত ভাগ হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোতে তারল্য সঙ্কট প্রকট হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া একাধিক ব্যাংক এখনও লাভের মুখ দেখতে পারছে না। এ অবস্থায় নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়ায় এ ব্যাংকগুলোর উত্তরণ আরও সঙ্কটে পড়ে গেল। চলতি বছরে ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া দুর্নীতির আগে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি ডেসটিনির অর্থ আত্মসাতের ঘটনা উঠে আসে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে। ডেসটিনির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম তদন্তে গঠিত কমিটির রিপোর্টে সর্বমোট ৩ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকার তহবিল তছরূপ এবং ২ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন হয়। এমএলএম কোম্পানি হিসেবে এর আগে যুবক ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা অনিয়ম করে। ইউনিপেটু ইউ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং আইটিসিএল ১০০ কোটি টাকা আত্মসাত্ করে। তবে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ডেসটিনিসহ কয়েকটি এমএলএম কোম্পানির দুর্নীতি প্রকাশিত হওয়ায় তা আর্থিক খাতে বেশ প্রভাব ফেলে। চলতি বছরের শুরুর দিকে জনগণের বহুল প্রত্যাশিত ও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকার পাওয়া পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির বিষয়টি দেশের সর্বত্র আলোচনার ঝড় তোলে। গত ২৯ জুন দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে বিশ্বব্যাংক অর্থায়নের চুক্তি বাতিল করে। বিশ্বব্যাংকের শর্ত সাপেক্ষে ২৩ জুলাই যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন পদত্যাগ করেন। একে একে সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানও পদত্যাগ করেন। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের মামলা থেকে আবুল হোসেনের নাম বাদ দেয়ায় শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন অনিশ্চয়তায় পড়ে। পদ্মা সেতু ইস্যুতে দুর্নীতির প্রভাব আন্তর্জাতিক মহলেও পড়েছে। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে দুর্নীতির প্রকোপ কমাতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর হতে হবে। যেন কেউ দুর্নীতির সাহস না পায়। অন্যথায় বিশ্বে দেশের ইমেজ নষ্ট হবে, নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বৈদেশিক বাণিজ্যে। (কাল পড়ুন: গ্যাস বিদ্যুতের সঙ্কটে বিনিয়োগে খরা)