সারা বিশ্বের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিকে বিশ্লেষকরা নিম্নমানের রাজনীতি হিসাবেই দেখে থাকেন। যেখানে ক্ষমতা নিয়ে খুনাখুনি এবং রাজনীতিতে পেশিশক্তি/কালো টাকার প্রভাব দেখানো অতি সাধারণ একটা চিত্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সেই নিম্নমানের রাজনীতির মাত্রা বেড়েই চলছে। সুস্থ মস্তিষ্কের চিরতারুণ্যের প্রতীক এবং জাতির বিবেক বলে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে সেই অসুস্থ রাজনীতির চর্চা। সাধারণ স্বার্থেও জাতির মধ্যে এত বিভ্রান্তি যে, তার উত্সমুখ খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রিটিশদের ২০০ বছরের শোষণে আমাদের মধ্য থেকে সাধারণ চিন্তার জগত্টাও হারিয়ে গেছে।
সাধারণভাবে ধরেই নিচ্ছি যে, ধর্মের ভিত্তিতে তারা আমাদের বিভক্ত করে দিয়ে এ সমস্যা রেখে গেছে। এটা হয়ত আংশিক সত্য। কারণ ধর্ম মানুষের মধ্যে যে শিক্ষা প্রদান করে তা কিছুতেই কল্যাণের পথে বাধা হতে পারে না। বরং সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, বৈশ্বিক ক্ষেত্রে ধর্ম সবাইকে একসূত্রে চিন্তা করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এজন্য ধর্মকে সমগ্র বিশ্বে শান্তি নিশ্চিত করার প্রধান কৌশল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ধর্ম সার্বজনীন শান্তির বার্তা বহন করে। এজন্য ধর্ম এবং মানুষ একসূত্রে বাঁধা।
ব্রিটিশরা ১৭৫৭ সালে এ উপমহাদেশে এসেছিল এবং আমাদের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে অন্ধ হয়ে মারামারির কৌশল দিয়ে গেছে, যা মীরজাফরকে অন্ধ হতে প্রভাবিত করেছে এবং সেই দ্বন্দ্ব এখনো চলছে। এখান থেকে সব নিয়ে গিয়ে আমাদের উপরই তারা নজরদারি করছে। এই স্বার্থান্ধ ক্ষমতার লড়াই ছড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের শিরা-উপশিরায় এবং তাদের শাসন থেকে মুক্তি হলেও শোষণের বলয়ে রয়ে গেছি এখন পর্যন্ত। আমাদের ঘুরে দাঁড়াবার সময় এসেছে। কারণ ক্ষমতা নিয়ে মারামারির কৌশল কখনো জাতির সামনে সুফল বয়ে আনবে না। যার ভিত্তি হচ্ছে ক্ষমতার প্রতি লোভ এবং ক্ষমতাকে নিজের ইচ্ছামত বিরোধী মত দমনে ব্যবহার করা। আমরা সেখানে কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারি, যার শুরু হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বলয় থেকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়াশোনা করে তারা আগামীকাল দায়িত্বশীলতার চেয়ারে বসবে। সেজন্য সমস্ত পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে শিক্ষাঙ্গন। জাতীয় রাজনীতির কলুষিত রক্ত কিছুতেই এখানে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। জাতীয় রাজনীতিতে যে ক্ষমতার লড়াই চলে বর্তমান শিক্ষার্থীরা সেখানে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হয়। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় পরিচয়ের রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা এবং এর পাশাপাশি ভবিষ্যত্ বিবেচনা করে তাদের মধ্যে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
সারা বিশ্বে দুই কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা দেখে তা সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং কার্যত নির্বাচিত সরকারের বিপরীতে বিরোধী দলের তেমন কিছুই করার থাকে না।
আমরা দেশ হিসাবে ছোট এবং আইনসভার দুইটি কক্ষ পরিচালনা করা অনেক ব্যয়বহুল ব্যাপার। কিন্তু সরকারের কাজের সমালোচনা করার শক্তি বিরোধী দলের না থাকায় অনিয়ম-দুর্নীতি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে পড়ে। জনগণেরও কিছুই করার থাকে না আবার নির্বাচনের অপেক্ষা ছাড়া।
ফিরে আসছি মূল আলোচনায়। আমাদের এমন এক ব্যবস্থা দরকার যেখানে সরকারের সাথে বিরোধী দলের সম্পর্ক হবে দায়িত্বশীলতার এবং ছাত্রদের কোনভাবেই সেখানে হাতিয়ার হতে দেয়া যাবে না। পাশাপাশি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ বিকশিত করতে হবে সবার মাধ্যমে।
দলের সংখ্যা বাড়লেই রাজনীতির সুস্থতা আসে না, বরং তাতে অসুস্থতা/অস্থিরতা এবং স্বার্থান্ধ হয়ে নোংরামির সংখ্যা বাড়তে থাকে। ছাত্রদের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে বিভক্তি দেখা যাচ্ছে এবং পরস্পরের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে কলুষতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। ছাত্ররা আগামীর নেতা এবং দায়িত্বশীল নাগরিক। তাদের মধ্যে এমন বিভ্রান্তি কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। এজন্য তাদের সবাইকে সাধারণ ইস্যুতে এক হয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিতে হবে।
জাতীয় রাজনীতিতে ছাত্রদের ভূমিকা হোক বিরোধী দলের এবং তাতে সরকারের জবাবদিহিতা/ দায়িত্বশীলতা নিশ্চিতে ছাত্র সংসদের কার্যকার ভূমিকা উন্নত বিশ্বের উচ্চতর আইনসভার (The Senate of USA) চাইতে বিন্দুমাত্র কম হবে না। এটা একদিকে যেমন দায়িত্বশীল ও সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা নিশ্চিত করবে, তেমনি মেধাবীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। যার অভাবে সমস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা কলুষিত হয়ে পড়ছে প্রতিদিন। আজ যারা ছাত্র-রাজনীতি করছে তারা একটা চাকরি কিংবা ক্ষমতার প্রতি আসক্ত হয়েই করছে। সুস্থ মানসিকতা থাকলে কিছুতেই নোংরামির হাতিয়ার দিয়ে আরেকজনের উপর গোলাগুলি করতো না।
কেউ চাইলে একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করার পর পছন্দমত দলে যুক্ত হয়ে জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসবে। নেতৃত্ব এভাবেই তৈরি করা উচিত, নাকি শিক্ষার্থীর হাতে অস্ত্র দিয়েই আমরা রাজনীতি শিখাবো তা পরিষ্কার করার সময় এসেছে এখন।
লেখক :জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকার ও রাজনীতি বিষয়ে লেখাপড়া শেষে বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত
