স্মরণ : শোকের সাগরে হারিয়ে যাওয়া মৃত্যুহীন প্রাণ

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৭
বেনিন তীরে ২০০৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর হারিয়ে গিয়েছিল শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশের সোনার সন্তানরা। সুদূর আফ্রিকার বেনিনে সাগরপাড়ে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শোকে মুহ্যমান করে ফেলে দেশের মানুষকে। জাতিসংঘ বাহিনীর জন্যে ২৫ ডিসেম্বর একটি শোকাবহ দিন। দুর্ঘটনায় হারিয়ে যাওয়া এ সকল কর্মকর্তাগণ যুদ্ধবিধ্বস্ত আফ্রিকার সিয়েরালিয়ন, লাইবেরিয়াতে শান্তিরক্ষার জন্য দায়িত্ব পালন করছিল। দেশগুলোর জনগণের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কলহ লেগেছিল। বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, যুদ্ধরত অস্ত্রধারীদের অস্ত্র সমর্পণ, যুদ্ধফেরত অস্ত্রধারী ও বেসামরিক ব্যক্তিদের শান্তিপূর্ণ জীবনে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি, ভিটে-মাটি হারানো দুস্থ জনগণের জন্যে খাদ্য, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ শান্তিরক্ষী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল। ভেঙ্গে পড়া প্রশাসনযন্ত্রের অবকাঠামো নির্মাণ, এবং একটি সুষ্ঠু স্বচ্ছ, নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা করাও এই হারিয়ে যাওয়া সূর্য সন্তানদের অন্যতম কর্তব্য ছিল। বিভেদ ও অনৈক্য, নেতৃত্বসুলভ গুণাবলীর অভাব, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বৈরিতা, সমগ্র আফ্রিকায় শান্তিকে করেছে বিপন্ন। শিশুর হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয়েছে। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা কেউ রেহাই পায়নি সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে। যে বালকটি স্কুল ছেড়েছে, তার আর ফিরে যাওয়া হয়নি বিদ্যায়তনে, যে পরিবারটি গ্রামছাড়া হয়েছে, তারা আর ফিরে যেতে পারেননি তাদের গ্রামটিতে। লাখো মানুষের আবাসস্থল হয়েছে পরবাসে। বিপন্ন মানবতার তরে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। হূদয় দিয়ে ভালোবেসে ঝঞ্চাবিক্ষুব্ধ দেশের জনগণকে সেনা চিকিত্সক দল সেবা দিয়ে মন জয় করেছে। অবকাঠামো নির্মাণে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে সেনা প্রকৌশলী দল। বিদ্যালয়ে ফেরার পরিবেশ তৈরিতে সাহায্যে করেছেন সেনা সদস্যরা। সব পদবীর কর্মকর্তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করেছেন দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে। দেশটির নিরাপত্তা বিধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন আমাদের সেনা সদস্যরা। নিজেদের জীবন বিপন্ন করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি রোধ করেছেন। দেশমাতৃকার সম্মান রক্ষার্থে তারা ঝরিয়েছেন ঘাম, রক্ত দিয়েছেন অকাতরে। কঠোর শৃঙ্খলার মাধ্যমে পেশাগত জীবন যাপন করে অবাক করে দিয়েছেন বহুজাতিক বাহিনীর সহকর্মীদের। ২৫ ডিসেম্বর, ২০০৩ এমনি একটি দিন, যে দিনটি শান্তিরক্ষী বাহিনীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে বাংলাদেশের ১৫ জন শান্তিরক্ষীর নাম। এ দিনটিতে কর্তব্য পালন শেষে তারা ফিরছিলেন দেশে অবকাশ যাপনের জন্য। সারা বছরের কর্মক্লান্ত দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফেরার দিনটি যে এত বিষাদময় হবে, তা কখনোই লে.কর্ণেল সামছুল আরেফিন, মেজর আব্দুর রহিম, রওনক আক্তার, ইমতিয়াজ, মোস্তাফিজ, মোশারফ, বাতেন, ক্যাপ্টেন আরিফ, ফরিদ, আলাউদ্দিন, রকিবুল, জাহিদুল, রফিক, মাবুদ ও সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার শফিকুল ইসলামের পরিবার ভাবতে পারেনি। অকুতোভয় সেনা কর্মকর্তারা সে দেশের মানুষের নিবিড় পরিচর্যা করছিলেন। তাদের অসমাপ্ত কাজ ফিরে গিয়ে করারও প্রস্তুতি ছিলো। কিন্তু সে কাজ আর সমাপ্ত করা গেল না, পরিবারকে আর সময় দেয়া হলো না। যদিও তাদের মৃত্যুতে আত্মত্যাগের গাঁথা রচিত হয়েছে, কিন্তু এ মৃত্যু জাতির আত্মোত্স্বর্গকারী সূর্য সন্তানদের ছিনিয়ে নিয়েছে। শান্তিরক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তারা কর্তব্যপরায়ণতার সর্বোত্কৃষ্ঠ অবদান রেখে বাংলাদেশের পতাকা হাইতি থেকে পূর্ব তিমুর পর্যন্ত উড্ডীন করেছেন। বীর সেনানিরা লাল সবুজ পতাকা বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সুদূর আফ্রিকায় আর এই লাল সবুজ পতাকার সঙ্গে জাতিসংঘের সাদা-নীল পতাকায় আচ্ছাদ্দিত হয়ে দেশে ফিরেছেন। এই বীরদের ইহজগত্ থেকে পারলৌকিক জগতে মহাপ্রয়াণের মাধ্যমে শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের জন্যে আত্মত্যাগের এক বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তিরক্ষী বাহিনীর বাংলাদেশের সোনার সন্তানরা পেয়েছে বীরের মর্যাদা, যুগ যুগ ধরে এই মহাপ্রয়াণ অনুপ্রাণিত করবে সকলকে। হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের স্মৃতি ধারণ করে আজো শোকে ও বেদনায় কাতর হয়ে থাকে পরিবারগুলো। আজো গর্বভরে স্মরণ করে থাকে জাতি তাদের আত্মত্যাগের কথা। বেনিনে হারিয়ে যাওয়া বাবা, সন্তান, স্বামী ও ভাইয়ের বিদায় কখনও কৃতজ্ঞ জাতির বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। শোক থেকে শক্তি উত্সারিত হয় বলেই পরিবারগুলো আজও সংগ্রামমুখর দিনগুলো অতিক্রম করছে আত্মত্যাগে উদ্দীপ্ত হয়ে। লেখক :সাবেক সেনা কর্মকর্তা, কলামিস্ট যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাবলিক এ্যাফেয়ার্সে প্রর্িশক্ষণপ্রাপ্ত