শিশুদের প্রাচীন পত্রিকা মাসিক মুকুল

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:২৪
পাঠ্যপুস্তক ছাড়া শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে শিশুতোষ পত্রিকার গুরুত্ব অপরিসীম। আজ থেকে দু’শ’ বছর পূর্বে বাংলা ভাষায় কি কোনো শিশু পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সেকালে আলাদাভাবে শিশু-কিশোরদের জন্য কোনো পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি। অনেকে বলেন, ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত মাসিক ‘দিগদর্শন’ পত্রিকাটি কিশোরপাঠ্য সাময়িক পত্রিকা ছিল এবং এ কারণেই ‘কলিকাতা স্কুল বুক বোর্ড’ পত্রিকাটি ক্রয় করে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করতো। শিশু-কিশোরদের জন্য প্রকাশিত ছোটদের পত্রিকার ইতিহাসে দিগদর্শনের পর পর্যায়ক্রমে কলিকাতা থেকে পশ্বাবলী, বিদ্যাদর্শন, সত্যপ্রদীপ, রহস্য সন্ধর্ভ, অবোধবন্ধু, বিশ্বদর্শন, বালকবন্ধু, সখা, সাথী, বালক, সখা ও সাথী, মুকুল, শিশুসন্দেশ, মৌচাক, শিশুসাথী, রামধনু, রংমশাল এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত বালিকা, সুখ পাখি, শিক্ষা, ছাত্রসহচর, রাজভোগ, বালক, আর্যকাহিনী, পাপিয়া, আঙুর, শিশু, মকতব, জমজম, আলাপনী, কচি ও কাঁচা, টাপুর টুপুর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সব পত্র-পত্রিকার মধ্যে কোনোটিই এখন আর প্রকাশিত হয় না। তবে বেশিদিন প্রকাশিত হয় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী সম্পাদিত ও প্রতিষ্ঠিত মাসিক সন্দেশ। এরপর বেশিদিন আয়ুষ্কাল লাভ করেছিল আচার্য শিবনাথ শাস্ত্রী প্রতিষ্ঠিত মাসিক মুকুল। মাসিক মুকুল প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে শতাধিক বছর আগে। মাসিক মুকুল পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতার ২১১ ব্রহ্মমিশন প্রেস থেকে শ্রী ললিত মোহন দাস কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। মুকুল পত্রিকাটির দশ বছর আগে আর একটি শিশুতোষ পত্রিকা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত হয়। এটির নাম বালক। এটির সম্পাদক ছিলেন জ্ঞাননন্দিনী দেবী। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কর্মাধ্যক্ষ। বালক ছিল স্বল্পায়ু। আর মাসিক মুকুল এক নাগাড়ে প্রকাশিত হয়েছিল ত্রিশ বছর। বাংলাসাহিত্যে বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মানস গঠনে মুকুলের ভূমিকা অপরিসীম। সেকালের নামজাদা লিখিয়েরা এতে লিখেছেন এবং হাত পাকিয়ে পরবর্তীতে বিখ্যাত হয়েছেন। এমন লেখকদের প্রথম পত্রিকা ছিল মাসিক মুকুল। সেকালে ছোটদের পত্র-পত্রিকায় কোনো ছবি বা অলংকরণ থাকত না। এমন কি লেখকদের নামও উল্লেখ থাকত না। নাম থাকত বছরের শেষে প্রকাশিত সচিত্রপত্রে এবং এতে বিষয়সূচিও থাকত। আজকাল এমনটি দেখা যায় না। মাসিক মুকুল ছবি ছাপা শুরু করেছিল। কিন্তু লেখকদের নাম বছর শেষে ছাপত। মুকুল প্রথম থেকে ছ’বছর পর্যন্ত সম্পাদনা করেছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শিবনাথ শাস্ত্রী। পরে বিভিন্নজন এই দায়িত্ব পালন করেছেন। মুকুলে সব লেখাই ছিল শিশুতোষ। লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত লেখকবৃন্দ। শিশু-কিশোরেরাও লিখে হাত পাকিয়েছেন। লেখকবৃন্দের মধ্যে রয়েছেন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, হেমলতা সরকার, রামাব্রহ্ম সান্যাল ও সম্পাদক স্বয়ং। এটি মুকুলের প্রথম সংখ্যার লেখকক্রম। পরবর্তীতে লেখেন— যোগীন্দ্রনাথ সরকার, রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী, দীন্দ্রেকুমার রায়, কামিনী রায়, কুসুমকুমারী দাশ, অবলা বসু, শশীভূষণ বসু, হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘোষ, লাবণ্য প্রভা বসু, উপেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী, বিপিনচন্দ্র পাল, সুকুমারী দাস, সুরেশ চন্দ্র সমাজপতি, রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী, অক্ষয়কুমার মৈত্র, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রাজনারায়ণ বসু, অন্নদাবরণ সেন, প্রিয়ম্বদা দেবী প্রমুখ। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বাংলা শিশুসাহিত্যের অমর রচনা শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘রামতনু লাহিড়ী’, জগদীশচন্দ্র বসুর, ‘গাছের কথা’, উপেন্দ্রকিশোর রায়, চৌধুরীর ‘ছেলেদের রামায়ণ’ এবং জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারীর ‘আদর্শ ছেলে’ এই মুকুলেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। মুকুল পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যাটিতে সম্পাদক শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছিলেন— ‘মুকুল নামটি বেশ! মুকুল বলিলেই অনেক কথা মনে হয়। প্রথমে মনে হয়, আশা। যাহা আজ মুকুলে আছে, কালই তাহা ফুটিবে। মুকুল আসিয়াছে আসিয়াছে, পশ্চাতে ফুল ও ফল আসিতেছে। এই জন্যই মুকুল দেখিলেই সকলের আনন্দ। মুকুল দেখিলেই বোঝা যায়, এ বত্সর ফলটা কেমন হইবে। যে বত্সর ফাল্গুন-চৈত্র মাসে আমের মুকুলটা বের হয়, লোকে বলিতে থাকে—‘ওঃ, এবার আমটা যে আসবে, তা আর কি বলবো। এখন ঝড় বাদলে নষ্ট না করিলে হয়।’ অতএব মুকুলের সঙ্গে সঙ্গেই আশা। এই আশাটা একটা সামান্য জিনিস নয়। জগতের বারআনা কাজ আশার উপরে চলিতেছে। মানব-মুকুলদিগকে ফুটাইবার পক্ষে সাহায্য করাই মুকুলের উদ্দেশ্য। মানুষকে ভাল কথা বলিবার একটা সময় আছে। ভাল কথা সকল কালেই উপাদেয়, কিন্তু শৈশব ইহার অনুকূল সময়। তুমি আমি যে সত্পথে আছি, ভাবিয়া দেখ, পিতা-মাতা শিক্ষক প্রমুখ গুরুজনের কত ভাল কথা তাহার মূলে আছে। শিশুদিগকে এমন কথা যাহারা শোনান, যে কথা অন্তরে প্রবেশ করে, শক্তিরূপে হূদয়ে বাস করে, চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষাতে মিশিয়া থাকে এবং উত্তরকালে জীবনের গতিকে নিয়মিত করে, তাহারা সমাজের মহোপকারী বন্ধু। মুকুলের লেখক ও পরিচালকগণ শিশুদিগকে এরূপ কথা শুনাইবার জন্য ব্যগ্র। কতদূর কৃতকার্য হইবেন, বলিতে পারি না। আমরা মানব-মুকুলদিগের হস্তে জ্ঞানের মুকুল দিব, যাহা তাহাদের জীবনে ফুটিয়া ফুল ফলে পরিণত হইবে।’ মুকুল পত্রিকার সম্পাদক শিবনাথ শাস্ত্রী ‘রামতনু লাহিড়ী ও তত্কালীন বঙ্গসমাজ’ গ্রন্থের জন্য বিখ্যাত হলেও বাংলার নবজাগরণে তিনি ছিলেন স্পর্ধিত ব্যক্তি। তিনি ছিলেন সমাজমনষ্ক ও মনুষ্যত্বের জয়গাথা নির্মাতা। মুকুল পত্রিকায় ছোটদের জন্য তাঁর অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বড়দের জন্য রচিত আত্মচরিত, প্রবন্ধাবলি: নির্বাসিতের বিলাপ, পুষ্পমালা, নয়নতারা, বিধবার ছেলে, সেজো বৌ, হিমাদ্রী কুসুম, পুষ্পাঞ্জলি, যুগান্তর ও ধর্মবিষয়ক বক্তৃতার বইগুলো আজো মানুষ আগ্রহ সহকারে পাঠ করে থাকেন। আচার্য শিবনাথ শাস্ত্রী ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি দক্ষিণ ২৪ পরগনার মাতুলালয়ে (বঙ্গাব্দ ১২৫৩, ১৯ মাঘ) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হরানন্দ ভট্টাচার্য। মায়ের নাম গোলকমনি দেবী। তিনি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ৩০ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। শিবনাথ শাস্ত্রীর জীবনাদর্শ, মানবপ্রীতি ও চারিত্রিক দৃঢ়তা নতুন প্রজন্মকে আশার আলো দেখাবে।