পাবনার বেড়ায় ঋণের ফাঁসে অভাবী মানুষের প্রাণ যায়

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৮
পাবনার বেড়া উপজেলায় চড়াসুদের ঋণে জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অভাবীরা। সুদের কারবারীরা ব্যক্তি উদ্যোগে অথবা অনুমোদনহীন সমিতি গড়ে চালিয়ে যাচ্ছেন রমরমা সুদের ব্যবসা। লাগামহীন সুদের কারবারে নিঃস্ব হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অনেক অভাবী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পৌর এলাকার অর্ধশতাধিকসহ উপজেলার দেড় শতাধিক সুদখোর মহাজন চালিয়ে যাচ্ছেন সুদের ব্যবসা। ঋণ গ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রতি হাজার টাকায় মাসে ৩০০ টাকা সুদ নেয়া হয়। এমন ব্যাপক হারের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে চোখে সর্ষে ফুল দেখেন ঋণগ্রহীতারা। যারা ঋণ শোধ করতে পারেন না তাঁদের প্রতি মাসের সুদ জমা হয় আসলের সঙ্গে। এক পর্যায়ে সুদ আসলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায় আসলের পরিমাণ। সুদ বা আসল পেতে দেরি হলে মহাজনরা ঋণগ্রহীতাদের বাড়িতে চড়াও হয়ে আসবাবপত্র, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ জিনিসপত্র নিয়ে যায়। বেড়া বাজারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাঁচামাল ব্যবসায়ী জানান, বছর দুয়েক আগে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দোকানে লাগিয়েছিলেন। এই দুই বছরে জমি বিক্রি করে লক্ষাধিক টাকা সুদ দিয়েও ঋণ শোধ হয়নি। ঋণের ফাঁদে পড়ে ব্যবসার অবস্থাও শোচনীয় তার। চক্রবৃদ্ধির সুদের খাঁড়ায় পড়ে বসতভিটাসহ সহায়-সম্বল বিক্রি করেছেন অনেকে। বেড়া পৌর এলাকার শেখপাড়া মহল্লার রেখা খাতুন, শিরি বেগম, নজরুল ইসলাম, নাজমা খাতুন, সিরাজুল ইসলাম মৈত্রবাঁধা মহল্লার তাজেম আলী, চম্পা বেগম, আমির আলী তাদেরই কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে নজরুল ও সিরাজুল সর্বস্বান্ত হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। পৌর এলাকার শেখপাড়া মহল্লার শিরি বেগম জানান, সুদখোর মহাজনের ঋণ শোধ করতে বাড়ি-ঘর এমনকি হাড়ি-পাতিল-শাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। তারপরও ঋণ শোধ হয়নি। নিঃস্ব হয়ে এখন অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে থাকেন তিনি। একই মহল্লার রেখা খাতুন জানান, বিশেষ প্রয়োজনে এক সুদের কারবারীর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। শোধ করতে না পারায় কয়েক মাসে সেই ঋণ সুদ-আসলে লাখ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। পাওনাদারের অত্যাচারে বাধ্য হয়ে সেই ঋণ শোধ করতে আরেক সুদের কারবারির কাছে হাত পাততে হয়। এভাবে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় বসত ভিটাসহ সবকিছু বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হতে হয়েছে তাঁকে। তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ টাকা সুদ দিয়েও ঋণ শোধ হয়নি তার। কলেজ শিক্ষক ও সমাজকর্মী আবুল কালাম জানালেন, ‘সুদের কারবারীদের সুদের হার যেমন অস্বাভাবিক তেমনি তাদের পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়াও অমানবিক। এভাবে অনেক অভাবীর সবকিছু চলে যাচ্ছে সুদ কারবারীদের ঘরে।’ উপজেলার হাট-বাজারে নামে-বেনামে গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য ‘সমিতি’। নিবন্ধনহীন এসব সমিতির কাজ সুদের কারবার ছাড়া আর কিছুই নয়। স্থানীয় সুদের কারবারীরাই এসব সমিতির উদ্যোক্তা। সমিতিগুলো কিস্তিতে পরিশোধের শর্ত দিয়ে অভাবীদের মাঝে ঋণ বিতরণ করে। হিসাব কষে দেখা যায়, এদের সুদের হার অনেক বেশি। বেড়া বাজারের হোটেল ব্যবসায়ী এনামুল হক বললেন: ‘বাজারে ১০ থেকে ১৫টি সমিতি ঋণ বিতরণ করে কিস্তি আদায় করে। কিছুদিন আগে একটি সমিতি থেকে ৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে পরদিন থেকেই দৈনিক ৬০ টাকা করে ১০০ দিনে ৬ হাজার টাকা শোধ করেছি।’ বেড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মুত্তালিব সরকার বললেন: ‘সুদখোর মহাজনদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রশাসনের সহায়তায় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ বেড়া উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বললেন: ‘নিবন্ধনহীন সমিতিগুলো আমাদের আওতাভুক্ত নয়। কাজেই সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই।’