যুদ্ধের প্রস্তুতি: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে উজ্জীবিত হয়ে নোয়াখালীর স্বাধীনতাকামী মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়। ২৫ মার্চ রাজধানীতে পাক বাহিনীর ক্র্যাক ডাউনের পর ২৬ মার্চ নোয়াখালীর তত্কালীন জেলা প্রশাসক সার্কিট হাউসে সর্বদলীয় এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনায় বসেন। তারা পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলাসহ মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথ নেন। ঐদিনই টাউন হলে রফিক উল্যা কমান্ডারের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী, আনসার, পুলিশ, ইপিআর, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের সদস্যবৃন্দের সমন্বয়ে একটি দল গঠন করা হয়। দলটি প্রাথমিক পর্যায়ে ফেনী কারিগরি মহাবিদ্যালয়ে অবস্থানরত পাক বাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। স্বল্প সময়ের মধ্যে তারা পাক বাহিনীকে পরাজিত করে মাইজদীতে ফিরে আসে। মাইজদী টাউন হলে এরই মধ্যে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়। এ সময় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ থেকে তাদের পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা প্রদান করা হয়। চারদিকে শুরু হয়ে যায় যুদ্ধের প্রস্তুতি। মাইজদী পুলিশ লাইন (বর্তমানে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার) অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র দিয়ে তরুণ ছাত্র, শ্রমিকসহ সকলের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়। এমপি নূরুল হক মিয়াসহ রাজনৈতিক নেতারা জেলার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। মাইজদীর প্রাইমারী টেনিং ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) একটি, ফেনীর মিজান ময়দান ও মাদ্রাসা মিলিয়ে একটি এবং ফেনী স্কুলে একটি অস্ত্র প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা এসব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন।
প্রতিরোধ যুদ্ধ: প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ ছিল বিক্ষিপ্ত ও আঞ্চলিক ভিত্তিতে। ১৭ এপ্রিল মুজিব নগরে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হলে মুক্তিযুদ্ধে নবগতি সঞ্চারিত হয়। এসময় ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশের অধিকাংশ শহরাঞ্চল হানাদার কবলিত হলেও বৃহত্তর নোয়াখালীর সমগ্র এলাকা ছিল পাক হানাদার মুক্ত। এখানে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল এবং এখানকার প্রশাসন নোয়াখালী কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইতিমধ্যে পাক সেনাদের আগমন পথে বাধা সৃষ্টির জন্য লাকসাম, নীলকমল, চর জব্বার, শুভপুর প্রভৃতি স্থানে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। সুবেদার লুত্ফর রহমান ও সুবেদার সামছুল হকের নেতৃত্বে ৪ এপ্রিল লাকসামের উত্তরে বাঘমারায় প্রথম সংঘর্ষ হয়। এরপর ১০ এপ্রিল লাকসামে সম্মুখ যুদ্ধে মাত্র ৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা দিয়ে পরিচালিত যুদ্ধে ২৬ জন পাক সেনা নিহত ও ৬০ জন আহত হয়। ২০ এপ্রিল পেটুয়াতে, ২১ এপ্রিল সোনাইমুড়ী রেল স্টেশনের আউটার সিগন্যালের কাছে, ১ মে বগাদিয়ায় নায়েক সিরাজের নেতৃত্বে সম্মুখ যুদ্ধে ১৫/২০ জন পাক সেনা নিহত হয়। সেই যুদ্ধে ২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
৯ মে নায়েক সুবেদার ওয়ালি উল্যার নেতৃত্বে পুনরায় বগাদিয়ায় যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে সুবেদার ওয়ালি উল্যার কপালে গুলি লাগলে তিনি গুরুতর আহত হন। ১০ মে বাংলা বাজারের পূর্বদিকে পাক সেনাদের সাথে যুদ্ধ হয়, ১১ মে সুবেদার ওয়ালি উল্যাহ এবং নায়েক আবুল হোসেন, লক্ষ্মীপুরের হাবিলদার মতিনের নেতৃত্বে মীরগঞ্জে পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে কয়েকজন পাক সেনা নিহত হয় ও অন্যরা পালিয়ে যায়। সেখানে পাক সেনাদের ফেলে যাওয়া প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। এছাড়া ১৩ মে রামগঞ্জের নিকট, ১৪ মে বিপুলাশার রেল স্টেশনে, ১৫ মে বগাদিয়ায় এবং ২৬ মে দালাল বাজারে পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ হয়। ২৮ মে সুবেদার ওয়ালি উল্যা মাইন বিস্ফোরণে সাহেবজাদার পুল ধ্বংস করে দেন। এতে লাকসাম-নোয়াখালীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পাক বাহিনীর সাথে আরও যেসব স্থানে যুদ্ধ হয়েছিল তার মধ্যে ফেনাঘাটা, গজারিয়া, নদনা, জমিদারহাট, হাতিয়া, সোনাপুর, চাটখিল, বাবলী, খলিফার হাট, রামগঞ্জ, বাধের হাট, ওদার হাট, বল্লভপুর, কবিরহাট, তাল মোহাম্মদের হাট, চন্দ্রগঞ্জ উল্লেখযোগ্য।
পাক বাহিনীর নোয়াখালী দখল ও হত্যাযজ্ঞ: ৭১’র ২৩ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী নোয়াখালী জেলা দখল করে নেয়। হানাদাররা ২১ ডিসেম্বর সোনাইমুড়ীতে অবস্থান নেয়। পরদিন বেগমগঞ্জ সরকারি কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ে ও এর পরদিন জেলা শহরের পিটিআই ইনিস্টিটিউটে ক্যাম্প স্থাপন করে তারা। এরপর পাক হানাদাররা তাদের দোসর আলবদর রাজাকারদের সহযোগিতায় জেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়, অনেক নারীকে ধর্ষণ করে, বাড়িঘরে লুটপাট চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১৫ জুন নোয়াখালী পৌরসভার শ্রীপুর গ্রামে ১১৫ জন ও ১৯ আগস্ট বেগমগঞ্জের গোপালপুর বাজারে ৫১ জন নিরীহ মানুষকে গুলি করে মারে হানাদার বাহিনী। পাক মেজর বোখারীর নেতৃত্বে শ্রীপুরে হত্যাযজ্ঞ চালায় হানাদাররা।
অবশেষে শত্রুমুক্ত: নয় মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের কবল থেকে ৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী শত্রুমুক্ত হয়। বৃহত্তর নোয়াখালীর বিএলএফ প্রধান মাহামুদুর রহমান বেলায়েতের নেতৃত্বে মমিন উল্যাহ, ফজলে এলাহি, মিজানুর রহমান, ফজলুলহক বাদল, মোজাম্মেল হক মিলন, মোস্তফা কামাল, জিএস কাশেম, মাঈন উদ্দিন জাহাঙ্গীর, মোশারফ হোসেন, মোহাম্মদ উল্যাহ, কামাল উদ্দিন, জয়নাল আবেদিন চেয়াম্যান, লেদু মিয়া চেয়ারম্যান ও মোজাম্মেল হক চুন্নুসহ কয়েকশ’ মুক্তিযোদ্ধা এদিন জেলা শহর মাইজদীতে রাজাকারদের প্রধান ঘাঁটি পিটিআইসহ সবক’টি ঘাঁটির পতন ঘটিয়ে স্বাধীনতার বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন। পিটিআই ঘাঁটিতে হানাদার বাহিনীর সাথে কয়েক ঘন্টার সম্মুখ যুদ্ধে একজন সরকারি কর্মকর্তা ও একজন আনসারসহ ৩ জন শহীদ হন। আহত হন মুক্তিযোদ্ধা মাঈন উদ্দিন জাহাঙ্গীর।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা: যুদ্ধে যে সব মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন তাদের মধ্যে রয়েছেন, নূর নবী বীর বিক্রম, নূর মোহাম্মদ, রুহুল আমিন, নায়েক মুজাফ্ফর হোসেন, নায়েক নূরুজ্জামান, সিপাহী আবুল বাশার, নূরুল হক, এরশাদ আলী, অহিদুর রহমান ওদুদ, সালেহ আহমেদ মজুমদার, আবদুর রব বাবু, মোস্তফা কামাল পাশা, আমান উল্যা ফারুকসহ অনেকে। স্বাধীনতার পর এ জেলায় ৩২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন খেতাবে ভূষিত হন।
যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন যারা: বৃহত্তর নোয়াখালীর বি এল এফ প্রধান মাহমুদুর রহমান বেলায়েত, মোস্তাফিজুর রহমান, এডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান লুতু, এডভোকেট মমিন উল্যা, এডভোকেট মো. শাহজাহান, রুহুল আমিন ভুঁইয়া, একরামুল হক, আবদুর রাজ্জাক, মোশারফ হোসেন, সুবেদার লুত্ফুর রহমান, সামছুল হক, ওয়ালী উল্যা, সিরাজুল হক, মোঃ এছহাক, তোফাজ্জল হোসেন, সুবেদার মেজর জোবেদ আলী, আবু ইউসুফ, মোঃ আনসার, নায়েক সুবেদার দেলোয়ার হোসেন, হাবিলদার সিরাজুল হক, সিরাজুল ইসলাম, সিপাহী দেলোয়ার হোসেন, লেন্স নায়েক শাহজাহান, ইব্রাহিম ও আব্দুল হক প্রমুখ। এ সময় থানা পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন সুধারামের অহিদুর রহমান ওদুদ, বেগমগঞ্জে আব্দুল মান্নান, রামগঞ্জে সাকায়াত উল্যা, কোম্পানীগঞ্জে ওবায়দুল কাদের, সেনবাগে শৈলেন অধিকারী/মোঃ ফারুক ও হাতিয়ায় অধ্যাপক ওয়ালী উল্যাহ।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক: মরহুম আব্দুল মালেক উকিল, নূরুল হক, শহীদ উদ্দিন এস্কান্দার কচি, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ, এডভোকেট শাখাওয়াত উল্যা, আব্দুর রশিদ, গাজী আমিন উল্যা, অধ্যাপক মোঃ হানিফ, হাজী মোঃ ইদ্রিস, এম এ আজিজ, জয়নাল আবেদীন, মমিন উল্যা, সারোয়ার-ই-দ্বিন, আবু সাঈদ, মৃণাল কান্তি মজুমদার প্রমুখ।
ভালো নেই মুক্তিযোদ্ধারা: যারা আমাদের এই প্রাণপ্রিয় দেশটিকে স্বাধীন করলো, সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশই আজ ভালো নেই। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অভাব অনটনে কাটছে তাদের জীবন। আর স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারগুলোর অবস্থা তো আরও করুণ। স্বাধীনতার পর থেকেই অভাব লেগে আছে তাদের সংসারে। আর্থিক সংকটে অনেকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াও করাতে পারেননি। সদর উপজেলার অশ্বদিয়ার শহীদ হারিছ মিয়ার পরিবার, বিনোদপুরের মুক্তিযোদ্ধা মকবুল আহম্মেদ, আব্দুল গফুর, পূর্ব অশ্বদিয়ার আবুল কালাম, রামকৃষ্ণপুরের তোফায়েল আহম্মেদসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। মুক্তিযোদ্ধা ভাতার সামান্য অর্থে তাদের সংসার চলে না। তারা আক্ষেপ করে জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খাওয়ার জন্য। কিন্তু তাও আমাদের কপালে জুটছে না। বেগমগঞ্জের অনন্তপুরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসেম আজো শহীদের স্বীকৃতি পাননি। তার মেয়ে হাছিনা আক্তার মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে বহুবার ধর্ণা দিয়েও পিতার শহীদ স্বীকৃতি আদায় করতে পারেননি। পাননি মুক্তিযোদ্ধার ভাতা। (এই লেখার কিছু তথ্য জেলা তথ্য বাতায়ন থেকে সংগৃহীত)
