কাঠের বাক্সে মৌমাছি পালন জনপ্রিয় হচ্ছে

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৫৪
সাতক্ষীরায় সরিষা ক্ষেতের পাশে কাঠের বাক্সে মৌমাছি পালন করে মধু উত্পাদন ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এই জনপদে মৌমাছির চাক থেকে মধু সংগ্রহের মাধ্যমে তিল তিল করে মধু চাষ শিল্পকে এগিয়ে নিয়েছে। চাষী থেকে চাষীতে এই শিল্পের সম্প্রসারণের প্রক্রিয়াটি চলছে। সাতক্ষীরায় সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছি পালন ও মধু উত্পাদনে অনেক বেকার তরুণ নিজের অর্থ, উদ্ভাবনী চিন্তা ও আত্মবিশ্বাসকে বিনিয়োগ করছে। সরেজমিনে মধু চাষ শিল্পকে ঘিরে এমনটি জানা গেছে। সাতক্ষীরায় ৭,৩৭৩ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ৭,১৬৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এ বছর সারাদেশে সরিষা ক্ষেতের পাশে কাঠের বাক্সের মাধ্যমে মধু চাষ করে প্রায় ৫ হাজার টন মধু উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার টন। কিন্তু প্রাকৃতিক কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হয়ে উত্পাদিত হয়েছিল আড়াই হাজার টন। কাঠের বাক্সে মৌমাছি পালন করে মধু উত্পাদন পেশা হিসাবে সাতক্ষীরায় প্রায় তিন সহস্রাধিক ব্যক্তি বেছে নিয়েছে। মধু চাষ অনেক লাভজনক হওয়ায় এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছি পালনের কারণে ক্ষেতে কোন কীটনাশক ব্যবহার করা লাগে না। এছাড়া সরিষা ক্ষেতের পাশে কাঠের বাক্সে মৌমাছি চাষ করলে কোন বাধা ছাড়াই ফুলের পরাগায়ন সম্ভব হয়। একই সাথে তুলনামূলকভাবে ফসলের বেশি ফলনসহ দ্বিতীয় ফসল হিসাবে ক্ষেতের পাশে বাক্সে মৌমাছি পালন করে নির্বিঘ্নে মধু উত্পাদন হচ্ছে। তাই ক্রমেই সাতক্ষীরার সর্বত্রই সরিষা ক্ষেতের পাশে কাঠের বাক্সে মৌমাছি পালন করে মধু চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এভাবে মধু আহরণ করার পর তা সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় এসব মৌচাষীকে স্বল্প মূল্যে মধু বাজারে বিক্রি করে দিতে হয়। এতে করে একশ্রেণীর মধ্যস্বত্বভাগীরা লাভবান হচ্ছে। সাতক্ষীরায় অন্যান্য পণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগারসহ অন্য ব্যবস্থা থাকলেও মধু সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে চাষীদের উত্পাদিত মধু চাক থেকে আহরণের পর পরই স্বল্প মূল্যে বাজারে বিক্রি করে দিতে হয়। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ব্রজবক্স গ্রামের সফল মৌ-চাষী ও বাংলাদেশ মৌচাষী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবাদুল্লা আফজাল সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। তিনি আরো জানান, প্রায় ১৫/১৬ বছর যাবত্ তিনি আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে কাঠের বাক্সে মৌ-চাষ করছেন। প্রতি মৌসুমে তিনি ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন মধু উত্পাদন করেন। যার আনুমানিক মূল্য ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা। তার ভ্রাম্যমাণ মৌ-খামার দেশের বিভিন্ন এলাকাতে নিয়ে যাওয়া হয়। তার উত্পাদিত মধুর মধ্যে রয়েছে—সরিষা ফুলের মধু, কালো জিরার মধু, ধনিয়ার মধু, রাইসরিষা ফুলের মধু, লিচু ফুলের মধু এবং সুন্দরবনের খলিষা, গরান, কেওড়া বাইন গাছের ও ফুলের মধু। জেলার আশাশুনি উপজেলার কুল্যা বুধহাটা গ্রামের আরেক মৌ-চাষী আইয়ুব আলী জানান, আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে গত ১০/১২ বছর ধরে তিনি কাঠের বাক্সে মৌ-চাষ করে আসছেন। স্থানীয় জেলা ছাড়াও তার ভ্রাম্যমাণ মৌ-খামার মধু আহরণের জন্য উত্তরবঙ্গে নিয়ে যান। প্রতি মৌসুমে তিনি ১৪/১৫ মেট্রিক টন মধু উত্পাদন করেন। তিনি বলেন, সরকারের সহায়তা পেলে সাতক্ষীরার মধু বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে। মৌ-চাষী কল্যাণ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, দেশে মধুর চাহিদা রয়েছে বছরে ৬ হাজার মেট্রিক টন। এই চাহিদার বিপরীতে উত্পাদন হয় ৩ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে সুন্দরবন থেকে আসে ৫০০ মেট্রিক টন এবং আধুনিক পদ্ধতিতে ভ্রাম্যমাণ মৌ-খামারের মাধ্যমে উত্পাদন ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। সূত্রটি জানায়, এই ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন মধুর সিংহভাগই সাতক্ষীরার ভ্রাম্যমাণ মৌ-চাষীরা উত্পাদন করে। সাতক্ষীরা বিসিকের অতিরিক্ত উপ-ব্যবস্থাপক আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় কমপক্ষে ২ শতাধিক ভ্রাম্যমাণ মৌ-খামার গড়ে ওঠেছে। এসব মৌ-চাষীকে আধুনিক পদ্ধতিতে মধু উত্পাদনের ওপর বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেয়া হয়। তিনি আরো বলেন, ভ্রাম্যমাণ মৌ-চাষ অত্যন্ত লাভজনক একটি শিল্প। দেশের মধু উত্পাদনের সিংহভাগই সাতক্ষীরার মৌয়াল বা মৌ-চাষীরা যোগান দেয়। ইতিমধ্যে সরকার ৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সাতক্ষীরা জেলাকে এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।