আগেভাগে কোনো খবর না দিয়া আকস্মিকভাবে নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতাল পরিদর্শন করেন নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় ক্রিকেট দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। গত বুধবার বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে তিনি এই হাসপাতালটি পরিদর্শনে আসিয়া কর্মরত ১৫ জন চিকিত্সকের মধ্যে মাত্র একজনকে কর্মস্থলে দেখিতে পান। ৭৩ জন নার্সের মধ্যে দেখিতে পান মাত্র দুইজনকে। তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরিয়া দেখেন এবং চিকিত্সক, নার্স ও রোগীদের সহিত কথা বলেন। ফোনে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও একজন চিকিত্সকের সহিতও কথা বলেন তিনি। ইহাতে তাহার যে করুণ অভিজ্ঞতা হয়, তাহাতে তিনি বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ না করিয়া থাকিতে পারেন নাই। তাহার এই ক্ষোভের কথা প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে ও পরে গণমাধ্যমের কল্যাণে সর্বত্র ছড়াইয়া পড়ে। গতকালের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী দায়িত্বে অবহেলার কারণে এই হাসপাতালটির চার চিকিত্সকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
ইংল্যান্ডে ওয়ানডে বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজনের আর বেশিদিন বাকি নাই। ইহারই মধ্যে এমপি ও ক্যাপ্টেন মাশরাফি বিন মুর্তজা তাহার বোলিং অ্যাকশনের মতো জনকল্যাণে একটি চমক দেখাইলেন। এমপিরা হইলেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। জনগণের দুর্ভোগ-দুর্দশায় তাহাদের পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়ানোটা তাহাদের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু অনেক জনপ্রতিনিধিকে অনেক সময় এই কাজে সম্পৃক্ত থাকিতে দেখা যায় না। গ্রাম-নগর সবখানে আজ বড় সমস্যা হইল শিক্ষা, চিকিত্সা, কর্মসংস্থান ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অভাব। বিশেষ করিয়া স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরিয়া যে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করিতেছে তাহার কোনো সমাধান হইতেছে না। খোদ প্রধানমন্ত্রী গ্রাম-গঞ্জে ডাক্তার ও নার্সদের অনুপস্থিতি নিয়া বিভিন্ন সময় তাহার ক্ষোভের কথা বলিয়াছেন। বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দিয়াছেন। তাহারপরও এই পরিস্থিতির যে আশাব্যঞ্জক উন্নতি হইতেছে না, মাশরাফির ঝটিকা হাসপাতাল পরিদর্শনের মাধ্যমে তাহা আবারও প্রমাণিত হইল। জনগণ ট্যাক্স দেওয়ার পরও একদিকে সরকারি হাসপাতাল হইতে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাইতেছেন না, অন্যদিকে তাহাদের প্রাইভেট হাসপাতালগুলিতে চিকিত্সাসেবার জন্য গলাকাটা মূল্য পরিশোধ করিতে হইতেছে। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের পরও ভুল বা নিম্নমানের চিকিত্সা সেবা দেওয়া হইতেছে। এই পরিস্থিতি মোটেও কাম্য নহে।
সরকারি হাসপাতালগুলিকে বিরাণভূমি বানাইয়া বেসরকারি হাসপাতালের বিকাশ আমরা মোটেও চাই না। মাশরাফিকে ধন্যবাদ এই কারণে যে, তিনি আসলে একজন ক্রিকেটার হইয়াও রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করিলেন। তবে এইখানেও কথা থাকিয়া যায়। একটি সদর হাসপাতালে ৩৯ পদের বিপরীতে কর্মরত রহিয়াছেন মাত্র ১৫ জন ডাক্তার। অর্থাত্ অর্ধেকেরও বেশি পদ শূন্য। এই শূন্য পদগুলি পূরণে পরবর্তীকালে তিনি সংসদ ও সংসদের বাহিরে কী ভূমিকা পালন করেন তাহা দেখিবার অপেক্ষা রহিল আমাদের। তাহার মতো সকল এমপি যদি স্থানীয় জনগণের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ-খবর নেন, তাহা হইলে সারাদেশের চিত্র যে বদলাইয়া যাইবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।
