বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সঙ্কটে অর্থনীতির নানা সূচক পিছিয়ে থাকলেও রফতানি ও প্রবাসী আয় আহরণে এ বছর বাংলাদেশ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। বৈদেশিক মুদ্রার আয় ভালো হওয়ায় শক্তিশালী হয়েছে রিজার্ভ। ডলারের দামও রয়েছে স্থিতিশীল। তবে জনশক্তি রফতানির বেশিরভাগ বড় বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ খাতটি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরব্যাপী অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবনতি হলেও বুক চিতিয়ে অর্থনীতির অনেক ঝড় সামাল দিয়েছে রফতানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। আর মোট রফতানি আয়ে গার্মেন্টস খাত একাই অবদান রেখেছে প্রায় ৮০ শতাংশ।
পূর্বের পঞ্জিকা বর্ষের চাইতে গত ২০১২ সালে রফতানি আয় বেড়েছে। তবে রফতানি আয়ে নেতৃত্বদানকারী তৈরি পোশাক কারখানায় অসন্তোষ ছিল বছরব্যাপী। বছরের শেষভাগে এসে সাভারের নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গার্মেন্টস খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হতাহতের ঘটনাটি ঘটল। ১১১ জন শ্রমিকের নিহত হওয়ার ঘটনা বিদেশের মিডিয়ায়ও ব্যাপকভাবে প্রচারণা পেয়েছে। এসব প্রতিবেদনে শ্রমিকের প্রতি মালিকপক্ষের অবহেলার চিত্র ফুটে উঠেছে। এমন দগদগে ঘা এই খাতকে বয়ে বেড়াতে হবে অনেক দিন। আর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পশ্চিমা বড় ক্রেতারা পোশাক কেনার ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্সের শর্তে আরো কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে। তাছাড়া রফতানির প্রধান গন্তব্য ইউরোপে মন্দা পরিস্থিতি চলছে। ফলে সার্বিক বিবেচনায় নেতিবাচক ধাক্কা পড়তে পারে রফতানি খাতে। যদিও সমপ্রতি চীন, হংকং এবং ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এই খাতে বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা বাড়ানোর উপায় ঠিক করতে বাংলাদেশ সফর করেছেন।
এছাড়া রফতানিমুখি পোশাক কারখানায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেও গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে অনেক কারখানা চালু করা যায়নি। ব্যাংকের অস্বাভাবিক ঋণের সুদ এবং হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনার জেরে রফতানিকারকদের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয় ব্যাংকের। এতকিছুর পরও রফতানি আয় বেড়েছে ২০১২ সালে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এক হাজার ১৩ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। গত ২০১১-১২ অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ৯৭০ কোটি ডলারের পণ্য। একই সময়ের তুলনায় আয় বেড়েছে চার দশমিক ৩৬ শতাংশ।
পরিসংখ্যান বলছে, ওভেন পোশাক রফতানি গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরে পাঁচ মাসে এক দশমিক ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে ওভেন পোশাক রফতানি হয়েছে ৩৯২ কোটি ডলার। নিট পোশাক রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও গত বছরের পাঁচ মাসের তুলনায় মাত্র এক দশমিক ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। এসময়ে ৪০৬ কোটি ডলার রফতানি হয়েছে। এ অবস্থায় পোশাক খাতের রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে জ্বালানি ও গ্যাস-বিদ্যুত্ সঙ্কট নিরসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা।
রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, এখন পর্যন্ত পোশাক রফতানি খাতের প্রবৃদ্ধি ভালো। তবে ২০০৮ সালের মন্দার পর আবার আমাদের রফতানির প্রধান গন্তব্য ইউরোপ ও আমেরিকা একই পরিস্থিতির মুখোমুখি। তার উপর দেশে রফতানিমুখি শিল্প উদ্যোক্তারা গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকট, উচ্চ সুদ হার, অবকাঠামো সমস্যাসহ নানামুখি সমস্যায় রয়েছেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে। একারণে সামনের দিনগুলোতে আরো বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, সমপ্রতি তাজরীনের ঘটনায় বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। অনেকে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে নষ্ট করতে বিদেশে ষড়যন্ত্রেও লিপ্ত। তাই বিষয়টি বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
বেড়েছে প্রবাসীদের পাঠানো আয়ও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, এ বছর প্রবাসীদের পাঠানো আয় প্রায় প্রতিমাসেই বেড়েছে রেকর্ড হারে। গত মার্চ মাস থেকেই রেমিট্যান্স ১০০ কোটি ডলারের উপরে উঠে যায়। সে সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় সব মাসেই রেমিট্যান্স ১০০ কোটির উপরে ছিল এবং মাস পার হলেই নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছিল। জুলাইতে ১২০ কোটি, আগস্টে ১১৭ কোটি এবং সেপ্টেম্বরে ১১৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। আর জানুয়ারি মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১২২ কোটি টাকার। চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই- নভেম্বর) ৬১১ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের আয় ভালো হলেও সামনে এ আয় ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানো নিয়ে জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাথে সরকারের যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তাতে খাতটি প্রভাবিত হতে পারে। ইতিমধ্যে বায়রা ঘোষণা দিয়েছে যে, সরকার মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি নিয়ে বায়রার সাথে সমঝোতা না করলে তারা সব ধরনের জনশক্তি রফতানি বন্ধ রাখবে। দেশের জনশক্তি রফতানির সিংহভাগই করে বায়রা তাই এ ধরনের সিদ্ধান্তে দেশের জনশক্তি রফতানি হুমকির মধ্যে পড়বে যা সামনে দেশের রেমিট্যান্স আয়ের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এমনিতেই দেশের শ্রমিক রফতানির বড় বড় বাজারের বেশিরভাগই বন্ধ রয়েছে। তার উপর যে বাজারগুলোতে অল্প পরিমাণে রফতানি হচ্ছে তাও যদি রফতানিকারকরা বন্ধ করে দেন তবে এ খাতের আয় হুমকির মুখে পড়বে।
