খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে দেশ নায়কেরা পায়নি প্রতিদান

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৮
প্রত্যেক ফসলের বাম্পার ফলন। আনন্দে ভেসেছিল কৃষক। স্বপ্নভঙ্গ হতেও সময় লাগেনি। উত্পাদিত ফসল বিক্রি করতে গিয়ে দেখা গেল দাম নেই। অবস্থা এমন খরচের দামও উঠে আসছে না। বুক চাপড়ে কেঁদেছেন অনেক কৃষক। তবে চোখের পানি ফেলতে হয়নি সবার। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে দেশ। চাল রপ্তানির কথাও ভাবছে সরকার। অর্জিত হয়েছে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা। আবার ফড়িয়া, দালাল আর মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেট ভারী হয়েছে। কিন্তু কৃষিতে বিপ্লবের নায়কেরা পায়নি প্রতিদান। এমন চিত্র ছিল পুরো বছর জুড়েই। পাটের পর বোরো, এখন চলতি আমন মৌসুমেও ধানের দাম না পাওয়ার বেদনায় পুড়ছে কৃষক। চলতি আমন মৌসুমে প্রতি মণ ধানে তাদের লোকসান গুণতে হচ্ছে একশ থেকে দেড়শ’ টাকা। ন্যায্য মূল্য যাতে কৃষক পায় সেজন্য সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও খুব একটা কাজ হয়নি। কৃষিতে ঋণ বিতরণের নির্দিষ্ট সীমা বাধ্যবাধকতার কারণে পুঁজির সংকট হয়নি কৃষকের। গ্রামে অর্থ প্রবাহ প্রক্রিয়াও ছিল সচল। কিন্তু খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি পরিকল্পনামাফিক। ফলে, ন্যায্য দাম না পাওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হয়েছে পচনশীল কৃষিপণ্য। সরকার কৃষককে সহায়তা দিতে নানা প্রণোদনার পাশাপাশি চলতি বছর অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বোরো ও আমন দুই মৌসুমে প্রায় ১৩ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও তা বাজারে প্রভাব ফেলতে পারেনি। কৃষকের কোন উপকারেই আসেনি তা। আবার কৃষককে সহায়তা দিতে সরকার বেশি পরিমাণে ধান-চাল সংগ্রহ করবে তাও পারছে না। সংরক্ষণ ব্যবস্থা অপ্রতুল হওয়ার কারণে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, কৃষককে তার ফসলের ন্যায্যমূল্য দিতে প্রয়োজনে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হবে। সার, ডিজেল, বিদ্যুতের দাম কমানোর পাশাপাশি প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়ে উত্পাদন ব্যয় কমাতে হবে। কিন্তু চাল রপ্তানি করে কৃষককে নায্যমূল্য পেতে সহায়তা দিতে হবে- এমন উদ্যোগ সঠিক নয়। কেননা, এর সুযোগ নেবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। শুধু তাই নয়, দেশে একটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে তখন কি হবে? প্রয়োজনের সময় যে টাকা দিয়েও খাদ্যশস্য পাওয়া যায় না-তাতো এর আগে আমরা দেখেছি। এ বিষয়ে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেছেন, বাম্পার ফলন হলে সাধারণ মানুষ সস্তায় খাদ্যদ্রব্য কিনতে পারে। কিন্তু তা কৃষকের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কৃষকের এ সমস্যার সমাধানের জন্য কৃষকদের সংগঠিত করার পাশাপাশি তাদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে তাদের সরকার যে ভর্তুকির ব্যবস্থা করেছে তাও চালু রাখতে হবে। সব কৃষক এ ভর্তুকির টাকা পায় না। তবে ১০ টাকায় অ্যাকাউন্ট খোলায় অনেক কৃষকই ভর্তুকি সুবিধা পাচ্ছেন। দেশ কি এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ? এই প্রশ্ন আসছে ঘুরেফিরে। গত দুই বছরে সরকার বিদেশ থেকে চাল আমদানি করেনি। কিন্তু চাহিদার তুলনায় দেশে গমের উত্পাদন কম হওয়ায় শুধু গম আমদানি করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, ২০১১-১২ অর্থবছরে চালের উত্পাদন হয়েছে ৩৩ দশমিক ৮০ মিলিয়ন টন। ২০১০-১১ সালের শুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫২ দশমিক ৫০ মিলিয়ন। বিবিএস-এর হিসেবে মাথাপিছু বছরে চাল প্রয়োজন ১৫২ কেজি। এই হিসেবে বছরে চালের প্রয়োজন ২৩ দশমিক ১৮ মিলিয়ন টন। উত্পন্ন চালের থেকে বীজ, অপচয় ও গো-খাদ্য মিলিয়ে আরো প্রয়োজন কমপক্ষে ১২ শতাংশ। যা মোট উত্পন্ন চালের ৪ দশমিক ০৬ মিলিয়ন টন। সবমিলিয়ে দেশে চালের প্রয়োজন ২৭ দশমিক ২৪ মিলিয়ন টন। উদ্বৃত্ত থাকছে ৬ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন টন। খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকও ইত্তেফাককে বলেছেন, এই মুহূর্তে দেশ খাদ্যে স্বয়ং-সম্পূর্ণ। খাদ্যে আমাদের কোন সংকট নেই। খুব ভালো অবস্থানে আছি আমরা। বর্তমানে গম আমদানি করা হলেও চাল আমদানি করা হয় না বলে তিনি জানান। এখন প্রায় ১৪ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ আছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গুদামের খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ১৭ লাখ টন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণকালে ধারণক্ষমতার পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ টন। ৩ লাখ টন মজুদের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কমপক্ষে ৩০ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ রাখা উচিত। এদিকে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও বছর জুড়ে ওএমএস-এর পাশাপাশি ফেয়ারপ্রাইস কার্ডের মাধ্যমে ৮২ লাখ স্বল্পআয়ের পরিবার এবং ৪র্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারী ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের মাঝে চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণে বিক্রি করা হয়েছে আটা। বেড়েছে কৃষি ঋণ বিতরণের পরিমাণ :বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বছরে যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করবে তার দুই শতাংশ হতে হবে কৃষিঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন বাধ্যবাধকতার কারণে চলতি বছর কৃষি ঋণ বিতরণের পরিমাণ বেড়েছে কয়েকগুণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) কৃষিঋণের (শস্য ও পল্লী ঋণ) বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৩২ দশমিক ৩০ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে। অর্থাত্ ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ব্যাংকগুলো চার হাজার ৫৬১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। চলতি অর্থবছরে ১৪ হাজার ১৩০ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে।