যক্ষ্মা একটি মরণব্যাধি’- এ কথা এখন কেউ মানেন না। ভয়ও কমে গেছে। চিকিত্সকরা বলেন, যক্ষ্মা এখন মরণব্যাধি নয়। পূর্ণ কোর্সে ওষুধ খেলে এ থেকে সম্পূর্ণ রক্ষা পাওয়া যায়। আর সাধারণ মানুষদের কাছে যক্ষ্মা সম্পর্কে জানতে চাইলে এখন তারা বলেন, ‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই এই কথার ভিত্তি নেই।’ নীলফামারী জেলার রামনগর ইউনিয়নের একাধিক যক্ষ্মা রোগী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপ করলে এ নিয়ে সচেতনতা বাড়ার প্রমাণ মিলে। এ মুহূর্তে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ছাড়াও ব্র্যাকসহ কয়েকটি বেসরকারি এনজিও সংস্থা কাজ করছে। তারা তৃণমূলে চিকিত্সা পৌঁছে দেয়ায় বাংলাদেশে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা কমেছে। বর্তমানে ডটস পদ্ধতির আওতায় বিনামূল্যে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, যক্ষ্মা নিয়ে সচেতনতা বাড়ার কারণে দেশে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। ভয়ও দূর হয়েছে। সদর উপজেলার কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের গুড়গুড়ি মনসাপাড়া গ্রামের রবিউল ইসলামের স্ত্রী মবিদুলা বেগম, তার মেয়ে হাবিবা, ইটাখোলা ইউনিয়নের আব্দুর রশিদের মেয়ে রাবেয়া, পৌরসভা এলাকার ফুড অফিস পাড়ার রামলাল, জুম্মাপাড়ার মানিক চাকীসহ অনেকে জানায়, যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক স্থানে চিকিত্সা নিয়েছে, অনেক টাকা খরচ করেছে, কিন্তু কোন লাভ হয়নি। পরে ব্র্যাকের তত্ত্বাবধানে চিকিত্সা সেবা নিয়ে তারা আজ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। এখন মনে হচ্ছে ভয়ের কিছুই নেই। তাহেরা খাতুন, তিনি ব্র্যাকের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে কানিয়াল খাতার চিনিরকুঠি গ্রামে কাজ করেন। বলেন, আগে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে রোগী খুঁজতাম। আর এখন কারো কাশি, জ্বর, বুকে-পিঠে ব্যথা হলে তারাই আমাদের খুঁজে বের করেন। যক্ষ্মায় আক্রান্ত কিনা তা জানতে কফ পরীক্ষায় আসেন। এটি মানুষের সচেতনতারই লক্ষণ। তিনি বলেন, প্রত্যেক দিন আমি ৮ থেকে ১০টি বাসায় গিয়ে দেখি কেউ অসুস্থ কিনা। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে জড়িতরা জানান, নানা কারণে দেশের গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝেই এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। আর বয়সের হিসাবে ১৫ থেকে ৪৫ বছরের কর্মক্ষম মানুষের মাঝেই সংক্রমণের প্রবণতা লক্ষণীয়। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা সহজে চিকিত্সার আওতায় আসেন। সাধারণ গরিব মানুষ এতদিন চিকিত্সা থেকে দূরে থাকতেন। এর জন্য অর্থ ছাড়াও চিকিত্সার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকাও দায়ী ছিল। যক্ষ্মা রোগ নিয়ন্ত্রণে নীলফামারীতে ২০০৪ সাল থেকে কাজ শুরু করেন ব্র্যাক। সন্দেহজনক যক্ষ্মা রোগীর কফ সংগ্রহ করার জন্য তাদের ১৫৪টি কেন্দ্র রয়েছে। যক্ষ্মা রোগীদের নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানোর জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ব্র্যাকের স্বাস্থ্য সেবিকারা। এ জন্য জেলায় ২ হাজার ৪৮৮ জন স্বাস্থ্য সেবিকা ও ২৮৮ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে। ব্র্যাক ২০১০ সালে ১হাজার ১৬১ জন যক্ষ্মা রোগীকে বিনা মূল্যে চিকিত্সা সেবা দেন। এর মধ্যে সুস্থ হন ১ হাজার ৪৭ জন। ২০১১ সালে ৮ শত ৩৩ জন যক্ষ্মা রোগীকে চিকিত্সা সেবা দিয়ে ৭ শত ৭২ জনকে সুস্থ করে তোলেন ব্র্যাক। ১৯৯৩ সালে শহর কেন্দ্রিক যক্ষ্মা রোগ নির্ণয় কেন্দ্র ছিল মাত্র ৪৭টি। ২০১২ সালে এসে তা ১০৫০টিতে দাঁড়িয়েছে। এখন সরকারি প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৪৪টি বক্ষব্যাধি ক্লিনিক, ৮টি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, ৪টি বিভাগীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, বিভিন্ন আরবান ক্লিনিক, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সামরিক হাসপাতাল,জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, ব্র্যাকের হেল্থ সেন্টার যক্ষ্মার চিকিত্সা দিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে ব্র্যাকের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। বর্তমানে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের শরীরে যক্ষ্মা জীবাণুর সংক্রমণ ঘটেছে। তবে এ সংক্রমণের অর্থ রোগে আক্রান্ত হওয়া নয়। নিয়ন্ত্রন কর্মসূচির ফলে ১৯৯৫সালে ১৬ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়। এখন রোগী হচ্ছে শতকরা ৭৪ শতাংশ্। ১৯৯৫ সালে আরোগ্যের হার ছিল ৭০ শতাংশ, এখন আরোগ্য পাচ্ছে ৯২ শতাংশ। ২০১৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা এবং মৃত্যু অর্ধেকে কমিয়ে আনার চেষ্টায় সফল হবে বাংলাদেশ। প্রতি মাসেই যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আনুপাতিক হারে কমছে। ২০১০ সালে কফ পরীক্ষা করে শতকরা ৮ জন রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। ২০১১ সালে এসে শতকরা ৭ জনে নামে। চলতি বছরে নভেম্বর পর্যন্ত শতকরা ৬ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত অক্টোবর মাসে ৬৭ জনের মধ্যে ৮ জন এবং নভেম্বরে ৭০ জনের কফ পরীক্ষা করে ৫ জন রোগী ধরা পড়ে। এক সময় ওষুধ নিয়ে সেবন করতেন রোগীরা। চিকিত্সার নিয়ম হচ্ছে নিয়মিত কোন বিরতি ছাড়া ওষুধ সেবন করা। কিন্তু রোগীরা বাসায় নিয়মিত ওষুধ সেবন করতেন না। ফলে নিরাময় হত না। এজন্য ব্র্যাক এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘খানা’ হিসাবে সেবা দিচ্ছে। রোগীরা শুধু কফ পরীক্ষার জন্য চিকিত্সা কেন্দ্র বা সেন্টারে আসেন। বাকি সময় বাসাবাড়িতে গিয়ে ওষুধ খাওয়ানোর কাজ করেন স্বাস্থ্যসেবিকারা। এর মাঝে ২ মাস অন্তর অন্তর চিকিত্সাধীন রোগীর কফ পরীক্ষা করা হয়। এতে নিয়মিত চিকিত্সা ও পূর্ণ কোর্স শেষ হচ্ছে। ব্র্যাকের ল্যাবরেটরী টেকনিক্যাল এ্যাসিস্ট্যান্ট মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যক্ষ্মার চিকিত্সা দীর্ঘমেয়াদী। ৬ মাস চিকিত্সা নিতে হয়। আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীই কৃষক-শ্রমিক ও গরিব। তারা ২-৩ সপ্তাহ চিকিত্সা নিয়ে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। ফলে তাদের রোগ জটিল আকার ধারণ করে এমডিআর-এ উপনীত হয়। এর চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ সময় রোগীর বাসায় যদি শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু থাকে তার যক্ষ্মা না হলেও তাকে ৬ মাসের কোর্সে ওষুধ দেয়া হয়। এছাড়া, সচেতনতা বাড়াতে ইমাম, নারী সংগঠক, শিক্ষক ছাড়াও ওয়ার্কপ্লেস যেমন, গামেন্ট এবং অন্যান্য শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওরিয়েন্টেশন করানো হচ্ছে। এটি ভীতি দূর করছে, সচেতনতাও বাড়াচ্ছে। নীলফামারীর সিভিল সার্জন ডাঃ শওকত আলী জানান, সরকারের স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি ব্র্যাক যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ব্র্যাকের স্বাস্থ্য সেবিকারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করার কারণে অনেক যক্ষ্মা রোগী প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ছে। এতে করে চিকিত্সা সেবা দিতে সহজে তাদের ভালো করা সম্ভব হচ্ছে। নীলফামারী বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের জুনিয়র কলসাটেন্ট ডাঃ খোরশেদ আলম জানায় যক্ষ্মা রোগ নির্মূলে জেলায় একটি বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের পাশাপাশি ১৫টি ল্যাবরেটরি রয়েছে। এ ছাড়া ব্র্যাকের বিপুলসংখ্যক মাঠকর্মী যক্ষ্মা রোগ নির্মূলে কাজ করায় দিন দিন যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে।
