শৈশবে যখন একটা মেয়ের অনেকগুলো পুতুলের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কথা, সে তখন ব্যস্ত আশপাশের দুনিয়া নিয়ে দারুণ কৌতূহলী। কোথায় কী ঘটছে, সব তার জানা চাই! রাস্তায় বোমা ফুটল কেন? অনেকগুলো লোক একসাথে মিছিল করছে কেন? কেনই বা চেনা পরিবেশটা পালটে যাচ্ছে সময়ের সাথে? এসবের উত্তর দিতে দিতে দিতে ছোট্ট তানিয়ার বাবা-মায়ের নাভিশ্বাস উঠত! তখন কে জানত এই মেয়েটাই একদিন তার যুক্তির ঝড় তুলবে মঞ্চে? মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত হবে চারপাশ? নিজের যোগ্যতাতেই তানিয়া আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। নিজে বিতর্ক করার পাশাপাশি যুক্ত রয়েছেন বেশকিছু সংগঠনের সাথেও। ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশনের কো-চেয়ারম্যান তিনি। ইডেন কলেজের ডিবেট ক্লাবেরও কার্যকরী সদস্য।
তানিয়ার কাছে জানতে চেয়েছিলাম তার শুরুর গল্পটি। ভাবনার পথে খানিকটা পেছনে ফিরে যেতে হলো তাকে—সময়টা ৯৮-৯৯ সালের দিকে। অগ্রণী স্কুলে পড়তেন। বন্ধুরা মিলে বিতর্ক করতেন ক্লাসে, সেটা বিনোদন বা কিছুটা আড্ডার আঙ্গিকেই। তারা খুব করে অনুরোধ করলেন শিক্ষকদের একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য। তাদের উত্সাহে স্কুলের উদ্যোগে নটরডেম কলেজের সাথে আয়োজন করা হলো বিতর্ক বিষয়ক কর্মশালার। সেখানে তানিয়ারা একপর্বে বিজয়ীও হয়েছিলেন। সেই শুরু, আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক বিভিন্ন বিতর্ক প্রতিযোগিতাতে অংশ নিতে থাকলেন। বড়দের দেখে দেখেই যতটুক শেখা, এর বাইরে খুব একটা সুযোগ ছিল না জানার। শুরুর দিকে থাকতেন প্রথম বক্তা আর তারপর একসময় দলনেতা। কলেজে পড়াশোনার চাপে খুব একটা বিতর্কের সাথে থাকতে পারেননি। এরপর ইডেন কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তিনি আবার সুযোগ খুঁজছিলেন কীভাবে বিতর্কের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া যায়, সেই ভাবনা থেকেই এনডিএফ তথা ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশনের সাথে যোগাযোগ এবং কাজ শুরু করা। এখন তো এই সংস্থাটি বিভিন্ন জেলা এবং বিভাগেও বিতর্ক উত্সব করছে। সম্প্রতি ময়মনসিংহেও একটি বিতর্ক উত্সব আয়োজন করে। তানিয়া এই আয়োজনটির কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তানিয়া বলেন, ‘আগের চেয়ে এখন যে কেউ বিতর্কের প্রতি অনেক বেশি আগ্রহী, তারা যেমন এটা দেখতে আসছে, তেমনি এতে তাদের অংশগ্রহণের মাত্রাও বাড়ছে ধীরে ধীরে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোও বিতর্কের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এগিয়ে আসছে এ ধরনের আয়োজনে।’ উল্লেখ্য, এনডিএফ-এর আয়োজিত বিতর্ক উত্সবে মিডিয়া পার্টনার হিসেবে কাজ করছে দৈনিক ইত্তেফাক।
তানিয়ার কাছে তরুণ বিতার্কিকদের জন্য কিছু পরামর্শ জানতে চেয়েছিলাম। তিনি তিনটা বিষয়ের উপর জোর দিলেন। প্রথমত, পরিস্থিতি যাই থাকুক, বিতর্ককে মনে ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিতর্ক নিয়ে বিভিন্ন উত্সব হচ্ছে, সেগুলোতে যোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। তানিয়া মনে করেন, স্কুল-কলেজ থেকেই বিতর্ক শুরু করা উচিত। তবে পড়াশোনার দিকেও অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, এর গুরুত্ব আগে সেটা বুঝতে হবে। বর্তমানে প্রচলিত ধারার বাইরে জনপ্রিয় কিছু ধারার বিতর্ক যেমন রম্য বা আঞ্চলিক এই ধরনের বিতর্কের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘ক্ষণিকের জনপ্রিয়তা কখনোই মান বিচারের মাপকাঠি হতে পারে না। তবে এগুলো অবশ্যই বিতর্ককে মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে, এর কারণে মূল ধারার বিতর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।’ বিতর্কের জগতে অনেকেরই পছন্দের বক্তা তানিয়া, তার কাছে পছন্দের বক্তা কারা? তরুণকণ্ঠের পাঠকদের জন্য জানালেন তিনি তার প্রিয় দুই বক্তার নাম, যাদের কথা আর পরামর্শ তিনি আগ্রহ নিয়ে শোনেন, একজন বিরুপাক্ষ পাল আরেকজন এনডিএফের চেয়ারম্যান একেএম শোয়েব।
তানিয়ার ছেলেবেলা কেটেছে ঢাকার আজিমপুরে। বাবা সরকারি চাকরি থেকে অবসরে, মা একজন গৃহিণী। তিন ভাই বোনের মাঝে তিনি সবার বড়। ছোট বোন মুনিয়া ইডেন কলেজে আর ভাই রাফিদ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণীতে পড়ছে। তানিয়া বিতর্ক নিয়ে আরও অনেকদিন কাজ করে যেতে চান, সেই সাথে নিজের পড়াশোনার বিষয় ভূগোল আর পরিবেশ নিয়েও কাজ করতে চান। তার জন্য আমাদের শুভকামনা।
