দীর্ঘদিন ঘুরেফিরে একই জেলায় দায়িত্ব পালন করছে ফেনীর পুলিশ প্রশাসন

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৪৭

ফেনীর পুলিশ প্রশাসনে চরম সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এসব সিন্ডিকেটের হাতে প্রশাসন জিম্মি হয়ে পড়েছে। ঘুরে ফিরে একই জেলায় বেশ কিছু কর্মকর্তা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে হয়রানি করাসহ ঘুষ দুর্নীতি ও নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে।

এতে করে একদিকে পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি যেমন নষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসন ও জনমনে বিরাজ করছে ক্ষোভ। তাই এই সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেয়ার দাবি করেছেন ভূক্তভোগীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বছরের পর বছর ঘুরেফিরে এই একই জেলায় বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করে আসা বেশ কিছু পুলিশ কর্মকর্তা এখানে নানা অনিয়ম ও অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে একই জেলায় অবস্থান করার ফলে ওইসব পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যেও এক ধরনের ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে।

প্রভাবশালী বলয় তৈরি করা ফেনীর ওইসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রয়েছে দায়িত্ব বা কর্তব্যে অবহেলা, অসহায় মানুষদের হয়রানী, মামলা, আটকসহ নানাভাবে হুমকি দিয়ে ঘুষ-দুর্নীতি করার মতো গুরুতর অভিযোগ। এসব নিয়ে মুখ খুললে বিপদে পড়তে হয় ভুক্তভোগী বা সাধারণ মানুষদের। 

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে ফেনী পুলিশের একশ্রেণির কর্মকর্তা বা সদস্য নানা অনিয়ম ও অপকর্মে একাকার হয়ে গেছে। সোনাগাজীতে রাফীর ওপর বর্বরতার ঘটনায় রাজনৈতিক সিন্ডিকেটে জড়িয়ে গিয়ে সোনাগাজীর তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন আসামিদের পক্ষে ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ওসি মোয়াজ্জেমের পক্ষ নিয়ে আবার পুলিশ সদর দফতরে রাফীর পরিবারকেই দোষারোপ করে লিখিত চিঠি দেন ফেনীর এসপি এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার। অভিযোগ আছে, এভাবেই প্রায় সব ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের মতো করেই চলছে ফেনীর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।

এ ছাড়া মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফীকে শ্লীলতাহানি ও পরবর্তীতে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে অবহেলা বা গাফিলতি এবং আসামিদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মতো নানা অভিযোগ উঠেছে। রাফীর ঘটনা ছাড়াও ইতিপূর্বেও বেশ কিছু ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে সোনাগাজী মডেল থানার বর্তমান পরিদর্শক (তদন্ত) কামাল হোসেনও ১৩ বছর ধরে এ জেলায় রয়েছেন। মাঝখানে অল্প কিছুদিন চাঁদপুরে থাকলেও ঘুরেফিরে ফেনীতেই চলে আসেন। প্রায় ১০ বছর ধরে ফেনীতে বিভিন্ন পদে চাকরি করছেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ডিআইও-১ পরিদর্শক শাহিনুজ্জামান। প্রথমে ফেনী মডেল থানায় এসআই হিসেবে যোগ দিলেও পদোন্নতির পরও ঘুরেফিরে এ ছাড়া রাফীর ঘটনার পর প্রত্যাহারকৃত সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনও ফেনীতে ছিলেন প্রায় ছয় বছর। সোনাগাজীর আগে ছাগলনাইয়া থানার ওসি এবং তার আগে ফেনী মডেল থানার ওসির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

পুলিশ ও ভূক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এখানে ব্যাপকহারে গণগ্রেফতার বা আটক-বাণিজ্যের ঘটনা ঘটে। ওই সময় ফেনীর হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন ও আবদুর রহিমকে ফেনী সদর থানা পুলিশ থানায় তিনদিন আটকে রাখে। এরপর দেনদরবার করে ৩ লাখ টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় সাখাওয়াত ও রহিমকে। 

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ‘স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত’ কপিল উদ্দিনকে গ্রেফতারের পর তাকে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে তার পরিবারের কাছে ১২ লাখ টাকা দাবি করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরবর্তী সময়ে দেনদরবারের মাধ্যমে পরিবারের কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা নিয়ে কপিলকে কারাগারে পাঠানো হয়। দুই মাস আগে ভিআইওপি ব্যবসায়ী সন্দেহে (ছদ্মনাম) আকরাম হোসেনের কাছ থেকে ৫ লাখ নিয়ে তাকে ফেনী থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এসব অভিযোগের ব্যাপারে ফেনী শহরে ওপেনসিক্রেট আলোচনা হয়। তবে জড়িত কর্মকর্তাদের বিষয়ে সহসা কেউ মুখ খোলে না।

এ ছাড়া স্থানীয়দের তথ্যমতে, ফেনী জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা পুলিশ সুপার (এসপি) এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার অন্যদের মতো দীর্ঘদিন ধরে না থাকলেও পদমর্যাদাসহ নানা কারণে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তার গভীর সখ্যতা রয়েছে। অনেক সময় এসপি জাহাঙ্গীরকে ফেনীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সেমিনারে রাজনীতিকদের মতো বক্তব্য দিতে দেখা যায়। 

আরও পড়ুনঃ নববধূকে সিগারেটের আগুনে ছ্যাঁকা দেওয়া সেই স্বামী গ্রেফতার

ফেনীর সাধারণ মানুষ মনে করে, ফেনী সদর উপজেলাসহ ৬টি উপজেলার থানা পর্যায়ে গোটা পুলিশ কর্মকর্তাদেরকে ফেনী জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলী করা হলে ফেনী সদর উপজেলাসহ ৬টি উপজেলার আইনশৃংখলার উন্নতি হবে তেমনি পুুলিশ প্রশাসনেরও ভাব-মূর্তি বাড়বে।

ইত্তেফাক/নূহু