সর্বাগ্রে শিক্ষার লক্ষ্য স্থির করিতে হইবে

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৪১
সদ্য প্রকাশিত প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার ফল লইয়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই খুব উচ্ছ্বসিত। উচ্ছ্বসিত হওয়ারই কথা। দৃশ্যত দুইটি পরীক্ষার ফলই অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। প্রায় সকল সূচকেই যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে। প্রাথমিকে গত বত্সরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাইয়াছে। বাড়িয়াছে পাসের হারও। আর একটি ইতিবাচক দিক হইল, মেয়েদের অংশগ্রহণ তাত্পর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে। জেএসসি’র চিত্রও ভিন্ন নহে। গত বত্সরের তুলনায় এইবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুইটিই বাড়িয়াছে। পাশাপাশি, শতভাগ পাস করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে, তেমনি প্রায় অর্ধেকে নামিয়া আসিয়াছে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। এখন চলিতেছে এই সাফল্যের কারণ অনুসন্ধান। শিক্ষামন্ত্রী বলিয়াছেন যে, ফলাফলের সকল সূচকেই অগ্রগতি হইয়াছে। আর এই সাফল্যের মূলে রহিয়াছে বিদ্যালয় ও লেখাপড়ার প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ। সাফল্যের বিচারে আগাইয়া থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকগণও এই প্রসঙ্গে কিছু মূল্যবান কথা বলিয়াছেন। প্রাথমিকে দেশসেরা মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফরহাদ হোসেন জোর দিয়াছেন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্মিলিত প্রচেষ্টার উপর। পক্ষান্তরে জেএসসিতে দ্বিতীয়বারের মতো দেশসেরার গৌরব অর্জনকারী রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমামুল হুদা মনে করেন যে, নিয়ম-শৃঙ্খলা সঠিকভাবে অনুসরণের ফলেই এই সাফল্য সম্ভব হইয়াছে। অর্থাত্ সকলেই গুরুত্ব দিয়াছেন ভালো ফলাফলের উপর। অথচ শুধু ভালো ফলাফলই যে শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য নহে— সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এই কথাটিই চাপা পড়িয়া গিয়াছে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ডামাডোলে। শিক্ষার মানের প্রশ্ন তো আছেই। ইহা সর্বজনবিদিত যে, শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনেক ব্যাপক। এই প্রসঙ্গে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে’র ২৬ নম্বর ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে যে, ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ এবং মানবিক ও মৌলিক অধিকারসমূহের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে শিক্ষা পরিচালিত হইবে। শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য কী বা কী হওয়া উচিত— তাহার একটি রূপরেখা এইখানে তুলিয়া ধরা হইয়াছে এবং তাহা স্বব্যাখ্যাতও বটে। পাশাপাশি শিক্ষার কিছু আশু লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যও রহিয়াছে। তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হইল কর্মসংস্থান। শিক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে এমনভাবে গড়িয়া তুলিতে হইবে যাহাতে তাহারা একই সাথে নিজের ও দেশের প্রয়োজনে সেই শিক্ষাকে সফলভাবে কাজে লাগাইতে পারে। এই জন্যই শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যেমন স্পষ্ট হওয়া উচিত, তেমনি অপরিহার্য শিক্ষাকে দেশ-কালের চাহিদার সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত করা। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী সকল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাইল, কিন্তু বেকার বসিয়া থাকিল কিংবা অনন্যোপায় হইয়া এমন একটি অগুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত হইল যাহার সহিত তাহাদের অর্জিত শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নাই— ইহা কাহারও কাম্য হইতে পারে না। পৃথিবী দ্রুত আগাইয়া যাইতেছে। সেই সাথে বৃদ্ধি পাইতেছে প্রতিযোগিতা। অতএব, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রয়োজন বা চাহিদার আলোকে সর্বাগ্রে আমাদের লক্ষ্য স্থির করিতে হইবে। সেই লক্ষ্যেই চালিত করিতে হইবে সমগ্র শিক্ষা কার্যক্রমকে। মনে রাখিতে হইবে যে, অপচয় করিবার মতো অর্থ-সম্পদ ও সময় কোনোটাই আমাদের নাই।