বাংলা বানান সম্পর্কে সরকারি পরিপত্র : প্রসঙ্গ-কথা

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৪২
গত ৩১ অক্টোবর সরকার একটি নির্দেশ জারি করেছেন যেটা বাংলা ভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত করার জন্য এক ধাপ অগ্রগতিই বলা চলে। সরকারের সব দাপ্তরিক কাজে বাংলা বানানের শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে বাংলা একাডেমীর প্রমিত বাংলা বানানরীতি অনুসরণ করার নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তাদের জারি করা এক পরিপত্রে। পরিপত্রে বলা হয়েছে, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম বানানরীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বানানের শুদ্ধতা সম্পর্কে যত্নবান হওয়া আবশ্যক এবং সরকারি কাজে ভাষারীতির অভিন্নতা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় বাংলা একাডেমীর প্রমিত বাংলা বানানরীতি অনুসরণের মাধ্যমে সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহারে সামঞ্জস্য বিধান করা প্রয়োজন। দেশের মানুষের জন্য গৃহীত সরকারি এ সিদ্ধান্ত সত্যিই একটি ঐতিহাসিক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। কারণ একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে মায়ের ভাষার জন্য আমরা শহীদদের প্রতি যেরূপ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আসছি তদনুযায়ী ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সুন্দর উচ্চারণে কথা বলা বা বাংলা বানান শুদ্ধভাবে লিখতে আমরা মোটেই অগ্রসর নই বা আগ্রহী নই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে আমার একটি চিঠি ছাপা হয়, যার শিরোনাম ছিল ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সার্কুলারে বাংলা বানানের দৈন্যদশা’। ঐ পত্রটি ছিল ২০% মহার্ঘভাতা প্রদানে সরকারি সার্কুলার সম্পর্কে। যাতে মোট ৩৭টি বানান ভুল ছিল। স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত এ বানানে ভুল ছিল ১১টি ক্ষেত্রে। ণত্ব-বিধান অনুসরণ না করায় মন্ত্রণালয়, হিসাবরক্ষণ, কর্মচারিগণ, প্রধানগণ, প্রেরণ, সমর্পণ এসব শব্দে দন্ত্য-ন ব্যবহূত হয়। এ পত্রটি ঐ সময় আরো দুটো জাতীয় দৈনিক প্রকাশিত হয়েছিল; কিন্তু মন্ত্রণালয়ের টনক নড়েছে কিনা জানা সম্ভব হয়নি। এছাড়া বাংলা অভিধানে নেই এমন একটি অদ্ভুত শব্দ ‘প্রমাপ’ যা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর ও সেটেলমেন্ট প্রেসে ২০১০ সালে চালু করে গেছেন একজন কর্মকর্তা। যে শব্দের বিরুদ্ধে ইত্তেফাকে ১৫ নভেম্বর ২০১১-তে একটি চিঠি লিখেছিলাম এবং কাজের নির্ধারিত পরিমাণ, মান বা হারকে প্রমাপ নামে যে চালানো উচিত নয় সে লেখায় অভিধানের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করার পরও সেই ‘প্রমাপ’—আজব শব্দটির ব্যবহার বন্ধ হয়নি। অন্যদিকে সরকারি দপ্তরের সাইনবোর্ডে নানারকম বানান ভুল জাতির জন্য লজ্জাজনক। তেজগাঁস্থ কেন্দ্রীয় ঔষধাগার যে সাইনবোর্ডটি টানিয়েছে সাত রাস্তায় তাতে লেখা ‘শহীদ তাজউদ্দিন আহম্মেদ স্মরণী’। বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তরের সাইনবোর্ডে ‘শহীদ তাজ উদ্দিন আহমেদ সরণী’ এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সাইনবোর্ডে ‘শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণী’ লেখা। লক্ষণীয় যে, একজন জাতীয় নেতার নাম একটি দপ্তরে তাজ-এর পর স্পেস দিয়ে উদ্দিন লেখা ও অন্য দপ্তরে আহমেদ না লিখে আহম্মেদ লেখা। সড়ক শব্দের পরিবর্তে অভিধানে ব্যবহূত শব্দ সরণি অথবা সরণী। তত্পরিবর্তে স-এ ম দিয়ে স্মরণী কী অর্থে লেখা? এটা স্মরণ থেকে তো স্মরণী নয়। মগবাজারস্থ বেসরকারি ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাইনবোর্ডেও লেখা—৩৩৫, শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ স্মরনী। এছাড়া বিজয়নগর, সেগুনবাগিচা, মগবাজার, সাতরাস্তা, তিব্বত এদিকের সড়কের নাম শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি ও শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি হওয়ায় এই সরণি নিয়ে নানা ধরনের বানান দেখা যায়। যেমন স্বরনী, স্বরনি, স্মরণী, স্মরনী। ত্বরিত্ এ ভুল সংশোধন হওয়া আবশ্যক। এছাড়া শাহবাগ থানার জনৈক কর্মকর্তার নামফলকের নিচে শাহবাগ লেখা শাহাবাগ বানানে। একজন সাবেক উপদেষ্টা তাঁর নামে কেন যে বর্ণদ্বিত্ব ব্যবহার করেন জানি না। মূলত ‘মির্জ্জা’ শব্দটি ‘মির্জা’ হওয়াই বানানসিদ্ধ। বাংলা বানানের এই যে তাণ্ডবলীলা তা বন্ধ করতে সরকার যে পরিপত্র জারি করেছেন তার আলোকে আমার কিছু পরামর্শ— ১। শুধু সরকারি দপ্তর, পরিদপ্তর, অধিদপ্তরেই নয়, ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী বাংলা বানান শুদ্ধ করার জন্য একটি প্রচার অভিযান চালানো অত্যাবশ্যক। হ্যান্ডবিল, লিফলেট, পোস্টারে প্রমিত বাংলা বানান সম্পর্কে জনমনে ধারণা প্রদান অত্যাবশ্যক। এজন্য টিভি চ্যানেলগুলোকে নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে যে, প্রতিদিন বানান শেখানোর একটি অনুষ্ঠান চালু করতে। ২। সরকারি বিজ্ঞাপনে ও ক্রোড়পত্রে যেন কোনো ভুল না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যে মন্ত্রণালয় বাংলায় যা কিছু ছাপবে তার দায়-দায়িত্ব সে মন্ত্রণালয়ের। এজন্য জবাবদিহির বিধান থাকা জরুরি। ৩। সর্বাগ্রে সরকারি দপ্তরসমূহের সাইনবোর্ডের ভুল বানান অপনোদনে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে একটি নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। ৪। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে পদবির ভুল সংশোধন দরকার। উপ-সহকারী, সহকারী কমিশনার, সহকারী প্রকৌশলী, সিনিয়র সহকারী সচিব জাতীয় বানানে হ্রস্ব ই কার নেই। সহযোগী সম্পাদক, সম্পাদনা সহযোগী এসব বানানেও ভুল করা হয় আজকাল। সবশেষে সরকারের এ সিদ্ধান্তকে মোবারকবাদ জানিয়ে দেশ ভুল বানানমুক্ত হোক—এ কামনা করছি। ঢাকা