চির নিদ্রায় শায়িত সোহরাব হোসেন

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৬
কিছু কিছু মানুষ থাকেন যাদের উপস্থিতি বোঝা যায় না। জীবনে তাদের কাজের প্রভাব এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যে, তারা যখন চলে যান তখন তার অভাব তীব্র হয়ে ওঠে। সঙ্গীতজ্ঞ সোহরাব হোসেন ছিলেন তেমনই একজন। গতকাল শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে নজরুল সঙ্গীতের প্রসারে তার অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেন সবাই। উচ্চারণ করলেন, তুমি নেই কিন্তু তোমার অবদান জাতি তার জীবনে জড়িয়ে রাখবে। হারিয়ে যেতে দেবো না। গতকাল শুক্রবার ছায়ানট ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডের স্থানীয় মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে তাকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। সকাল দশটায় সোহরাব হোসেনের মরদেহ শেষবারের মত নিয়ে আসা হয় তার অতি প্রিয় ছায়ানট সঙ্গীত ভবনে। ছায়ানটের শিল্পীরা গান গেয়ে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন সঙ্গীতগুরুর প্রতি। এই ছায়ানটে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন তিনি। তাকে ঘিরে বেড়ে উঠেছেন এখনকার অনেক স্বনামধন্য শিল্পী। তার মরদেহ সঙ্গীত ভবনে ঢুকতেই শিল্পীরা গেয়ে ওঠেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের দুটি গান। ‘দাও শৌর্য দাও ধৈর্য হে উদারনাথ’ ও ‘জাগো অমৃতপিয়াসী চিত্ত, আত্মা অনিরুদ্ধ’ এই দুটি গানের সুরে শিল্পীরা হূদয়ের অঞ্জলি নিবেদন করেন তার প্রতি। প্রথমেই সোহরাব হোসেনকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ছায়ানট সভাপতি ড. সন্জীদা খাতুন। এরপর একে একে ছায়ানটের শিক্ষক শিক্ষার্থী সবাই এসে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তার প্রতি। সন্জীদা খাতুন বললেন, যেমন তার কণ্ঠমাধুর্য, তেমনি কণ্ঠের কারুকাজ। মন ভরিয়ে দেয়। আমার জীবনে অনেকটা সময় তাকেই একমাত্র গুরু মেনেছি। ছায়ানট ভবন থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় সর্বস্তরের মানুষ ফুল দিয়ে তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসে অঝোর ধারায় কাঁদছিলেন সোহরাব হোসেনের বন্ধু সুধীন দাশ। তিনি বলেন, ‘সেই ১৯৪৮ সাল থেকে আমরা দুজন ছিলাম অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার মত প্রাণোচ্ছল মানুষ আর দেখিনি। শত বিপদেও তিনি বিষাদগ্রস্ত হতেন না। নজরুল সঙ্গীত যাদের প্রাণ তারা একজন অভিভাবক হারালেন। নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, সোহরাব হোসেন বাংলাদেশের নজরুল সঙ্গীতের চর্চাকে উচ্চ মাত্রায় নিয়ে গেছেন। ৬০ বছর ধরে এই কাজটিই করেছেন। যেন এটাই ছিল তার ব্রত।’ রাষ্ট্রপতির পক্ষে মরদেহে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন তার ব্যক্তিগত সহকারী ফজলুল হক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার একান্ত সচিব সাইফুজ্জামান শেখর, আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, বিএনপির পক্ষে ড্যাব নেতা ডা. জাহিদ। আরো শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ভাষা সৈনিক ড. রফিকুল ইসলাম, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ হাসান ইমাম, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারোয়ার আলী, শিল্পী খালিদ হোসেন, সৈয়দ আবদুল হাদী, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, শাহিন সামাদ, বিশ্বজিত্ রায়, মহাদেব ঘোষ, সুজিত মোস্তফা, খায়রুল আনাম শাকিল, কবি আবদুল হাই শিকদার, কবি রশীদ হায়দার, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, শিল্পী ফকির আলমগীর, উদীচী সভাপতি কামাল লোহানী, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, সচিব মনজুরুর রহমান, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য আব্দুল মান্নান চৌধুরী, ঢাবি চারুকলা অনুষদের ডিন মতলুব আলী, ম. হামিদ প্রমুখ। যেসব সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে সেগুলো হচ্ছে, জাসদ, যুবলীগ, বাসদ, ছায়ানট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, নজরুল ইন্সটিটিউট, শিল্পকলা একাডেমি, সঙ্গীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, জাতীয় প্রেসক্লাব, রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, উদীচী, কমিল্লা জেলা পরিষদ প্রভৃতি। শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বটি পরিচালনা করেন জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ।