সর্বজনস্বীকৃত ও পরম শ্রদ্ধেয় নজরুলসঙ্গীত সাধক ও গুরু সোহরাব হোসেন সুদীর্ঘ আট দশক ধরে নজরুলসঙ্গীতের মাঝে নিমগ্ন রেখেছিলেন নিজেকে। অসাধারণ ও মধুমাখা সুরের মায়াজালে তিনি আচ্ছন্ন্ করে রাখতেন শ্রোতাদের। তার কণ্ঠে বেজে উঠতো যে অলৌকিক সুর তা অণুপ্রস্থ ও অণুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে গিয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতো প্রকৃতির সাথে। সেই মধুর কণ্ঠের অধিকারী সোহরাব হোসেনের কণ্ঠ আর বাজবে না, চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল তার কণ্ঠস্বর। গত ১৩ পৌষ ১৪১৯ বঙ্গাব্দ, আরবী ১৩ সফর ১৪৩৪ মোতাবেক ২৭ ডিসেম্বর ২০১২ ইং রোজ বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা ২৫ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ৯১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন উপমহাদেশের এই মহান কিংবদন্তী।
১৯৯০ সাল থেকে সোহরাব হোসেন নজরুল ইনস্টিটিউটের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি নজরুলসঙ্গীত প্রশিক্ষণের ক্লাস নিতেন। সর্বশেষ শিক্ষকতা করেন তিনি এই নজরুল ইনস্টিটিউটেই। নজরুলসঙ্গীতসহ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে অনন্য অবদানের জন্য নজরুল একাডেমী পদক, চ্যানেল আই পদক, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। সোহরাব হোসেন নজরুলসঙ্গীত প্রামাণিকীকরণ পরিষদ ও নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং আমাদের নজরুল শিল্পী পরিষদেরও উপদেষ্টা ছিলেন। ২০০৯ সালে এই মহান গুণী শিল্পী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় সম্মাননা লাভ করেন। সঙ্গীত শিক্ষকতায় তিনি বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, ছায়ানট, শিল্পকলা একাডেমীসহ নজরুল একাডেমীতে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন।
মুমূর্ষু অবস্থায়ও যিনি আতিথেয়তা ও বিনয় করতে ভুল করেন না তেমন একটি বড় হূদয়ের মানুষ ছিলেন তিনি। অসাধারণ ছিল তার গায়কী। নজরুলসঙ্গীতের সম্রাজ্ঞী ফিরোজা বেগম তাকে নজরুলের গান নিয়ে একনিষ্ঠভাবে কাজ করার অন্যতম কৃতিত্বের দাবিদার বলে অভিহিত করেছেন। একাধারে ৪০ বছর নজরুলসঙ্গীতসহ সবমিলিয়ে ৬০ বছর তিনি সুরের আলো ছড়িয়েছেন শ্রোতাদের মনে। তার কাছে দীক্ষা নিয়েছেন এমন শিল্পীদের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতারের বিখ্যাত শিল্পী শাহীন সামাদ, সঙ্গীতজ্ঞ ড.সনিজদা খাতুন, খায়রুল আনাম শাকিল, আতিকুল ইসলাম, সাদিয়া আফরিন মল্লিক, মাহমুদুর রহমান বেনু উল্লেখযোগ্য। ২৮ ডিসেম্বর যখন তার লাশ সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শহীদ মিনারে রাখা হয় তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন নজরুলসঙ্গীতের আর এক দিকপাল সুধীন দাস। ১৯৪৮ সালে যখন তিনি রেডিওতে গান করতে শুরু করেন তখন থেকেই তাদের বন্ধুত্ব। দীর্ঘ ৬৪ বছরের সমান্তরাল বন্ধুত্বের সুসম্পর্ক তাদের। সাথীকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন তিনি। তিনি বলেন- “সোহরাব হোসেনের মত এমন সুরেলা সুরের নজরুলসঙ্গীত শিল্পী আর আসবে কি না সন্দেহ! সারাজীবনে কখনো তাকে অন্যের সমালোচনা করতে শুনিনি।”
সোহরাব হোসেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন যা বাঙালি জাতির গৌরবময় ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ, বাঙালির হূদয় তথা নজরুলসঙ্গীতের ইতিহাসে “সোহরাব হোসেনের” নাম সোনার হরফে লেখা থাকবে। তার গাওয়া “আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে” গানের বাণীগুলো তার নিজের জীবনেও প্রতিফলিত হবে নজরুলের দৈববাণীর মত তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। পরম করুণাময় মহান দয়ালু আল্লাহ্ তাকে জান্নাত দান করুন— সেই দোয়া সমগ্র বাঙালি জাতির।
লেখক :গবেষক
