বাংলাদেশের বিজয় দিবস ১৬ই ডিসেম্বর হলেও পাবনা জেলা পাক হানাদার মুক্ত হয় আরও দু’দিন পর। পাক বাহিনী ১৬ তারিখে রাজধানী ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করলেও পাবনার চিত্র ছিল ভিন্ন। তারা জেলার বিভিন্ন স্থান দখল করে তখনও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে পাক বাহিনী। দুঃসহ ৯টি মাসের হয় অবসান। মুক্তির আনন্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে পাবনাবাসী। কণ্ঠে জয় বাংলা ধ্বনি। সেই সব দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন ইত্তেফাকের পাবনা প্রতিনিধি —রুমী খোন্দকার
যুদ্ধ হলো শুরু: ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ ঢাকায় পাক বাহিনীর ক্র্যাক ডাউনের পরদিন ২৬ মার্চ হানাদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য তত্কালীন জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খান পাবনাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। একই দিন বিকেলে পাবনা পৌরসভার কৃষ্ণপুর মহল্লায় কিছুসংখ্যক মুসল্লী কারফিউ অমান্য করে ২৫ মার্চ নিহত শহীদ শুকুরের নামাজে জানাযায় শরীক হয়েছিলেন। এ সময় পাকসেনাদের ৮/১০ জনের একটি দল অতর্কিতে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। নিহত হন ঐ মহল্লার আব্দুস সামাদ। আহত হন বেশ ক’জন। এ ঘটনার সাথে সাথে পুলিশ লাইনে অবস্থানরত পুলিশ বাহিনী ও জনতা পাকবাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৭ ও ২৮ মার্চ পাবনা টেলিফোন অফিসে অবস্থানরত ২৭/২৮ জন পাকসেনাকে তারা হত্যা করে। ২৯ মার্চ শিল্প নগরীতে অবস্থানরত পাকসেনাদের নিরাপত্তা দিতে পাক বাহিনী বিমান হামলা চালায় এবং তাদের পাবনা ত্যাগ করতে বলে। সে অনুযায়ী পাক বাহিনীর প্রায় দু’শ’ সদস্য পাবনা-পাকশী সড়ক দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু দাশুড়িয়া নামক স্থানে ও রাজশাহীর গোপালপুরে ক্ষুব্ধ জনতার হাতে সকল পাকসেনা নিহত হয়। ৩০ মার্চ সাময়িকভাবে পাবনা শত্রুমুক্ত হয়। ৩০ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা ছিল শত্রুমুক্ত। ৪ এপ্রিল পাকসেনারা নগরবাড়ি ঘাট দিয়ে পাবনা প্রবেশের চেষ্টা করে। এ খবর পেয়ে পাবনার স্বাধীনতাকামী ইপিআর, পুলিশ, ছাত্র-জনতা সম্মিলিতভাবে নগরবাড়িতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু স্থল, নৌ ও আকাশপথে পাকবাহিনীর ত্রিমুখী আক্রমণে মুক্তিসেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং ৯ এপ্রিল রাতে পাকসেনারা নগরবাড়ি দিয়ে পাবনায় প্রবেশ করে। ১০ এপ্রিল সকাল থেকে তারা রাস্তার দু’পাশের বাড়ি-ঘর, দোকানপাট ও প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগাতে থাকে এবং নির্বিচার হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। তারা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, সার্কিট হাউস ও নূরপুর ডাকবাংলোতে ঘাটি স্থাপন করে। গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ ও লুটপাটের এক জঘন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
গণহত্যা: সমগ্র পাবনাতেই পাক বাহিনী ও তাদের দোসররা ব্যাপক গণহত্যা চালায়। তবে সাগরকান্দি, ডেমরা, গোপালনগর, হাদল ও হান্দিয়াল গ্রামে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটে।
বধ্যভূমি ও গণকবর: সরকারি হিসেবে পাবনা জেলায় ৬টি বধ্যভূমি ও ৪টি গণকবর রয়েছে। তবে বেসরকারি হিসেবে এর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তালিকা অনুযায়ী পাবনা জেলায় মোট ২৭টি গণকবর রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৫টি, ঈশ্বরদীতে ৮টি, ফরিদপুর উপজেলায় ৪টি, সুজানগরে ৪টি, সান্থিয়ায় ৪টি, বেড়ায় ১টি এবং আটঘড়িয়ায় ১টি গণকবর রয়েছে।
শত্রুমুক্ত হলো যেভাবে: পাবনা ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের ৭ নম্বর রণাঙ্গন। কমান্ডার ছিলেন মেজর কাজী নুরুজ্জামান। অন্যদিকে পাকবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ১২ নম্বর পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কমান্ডার মেজর মীর নেওয়াজ খান। ১৪ জুলাই থেকে ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা জেলার সুজানগর, আটঘরিয়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সাতবাড়িয়া, দ্বীপচর, ঢালারচর, নাজিরপুর, টিকরী, দাপুনিয়া, মাধপুর, বাঁশের বাদা, আওতাপাড়া, চরসদিরাজপুর প্রভৃতি স্থানে অবস্থান নিয়ে পাকবাহিনীর দখলকৃত থানাগুলোতে প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করে। পাক বাহিনীর দোসর রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, মেম্বাররাও ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের টার্গেট। ১২ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলের নেতৃত্বে সুজানগর থানায় আক্রমণ চালায় মুক্তিযোদ্ধারা। পরদিন ১৩ ডিসেম্বর সুজানগর থানা শত্রুমুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার কারণে ১৪ ডিসেম্বর সদর উপজেলার নাজিরপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের নিরীহ মানুষকে গুলি করে মারে পাকসেনারা। ওইদিন দুপুর থেকে পাক সেনাদের পরাস্ত করতে মিত্রবাহিনী পাবনা শহরে মর্টার শেল ফেলে ও বিমান হামলা চালায়। ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা পাবনা শহরে বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে দেয়। মুক্ত হয় সদর থানা। জেলা স্কুলের মাঠ থেকে শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের বিজয়োল্লাসে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলের নেতৃত্বে শহরের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ১৭ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক কোম্পানি সৈন্য মেজর কে কে কোলির নেতৃত্বে পাবনায় পৌঁছে। ভীত সন্ত্রস্ত্র পাক বাহিনী ১৮ ডিসেম্বর নুপুর ওয়াপদা ক্যাম্পে স্বেচ্ছাবন্দি হয়, গোটা পাবনা জেলা হয় শত্রুমুক্ত। ১৯ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধা প্রধান মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলের সাথে দেখা করে তাকে অনুরোধ করে, মুক্তিযোদ্ধারা যেন পাকবাহিনীকে আক্রমণ না করে। ২০ ডিসেম্বর দুপুর থেকে আর্মি ভ্যানে তারা পাক সৈন্যদের ভারতে নেয়া শুরু করে।
মুক্তিযোদ্ধাদের কথা: পাবনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাবিবুর রহমান হাবিব জানান, জেলার মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ হাজার ২৩৫ জন। এদের মধ্যে শতকরা ১০জন মোটামুটি স্বচ্ছলভাবে জীবন কাটাচ্ছেন। বাকীরা ভালো নেই। প্রতি মহান বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসে দুঃস্থ কিছু মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেবল সেলাই মেশিন দেয়া হয়। সরকারের উচিত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা আরো বৃদ্ধি করা।
