দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে সারা দেশকে সড়ক পথে সংযোগ করতে পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখা হয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু একেবারে তীরে এসে যেন তরী ডুবল। কাজ শুরুর আগেই প্রকল্পের কাজে দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় আটকে গেল স্বপ্নের এ সেতুর অর্থায়ন। শুধু সেতুর কাজই আটকে যায়নি, যেন আটকে গেছে দেশের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন। এর বাইরেও এই সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ এত প্রবল ছিল যে শেষ পর্যন্ত যোগাযোগ মন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে সৈয়দ আবুল হোসেনকে। ছুটিতে গেছেন প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা। বছরজুড়ে অর্থায়নকারী সংস্থা ও সরকারের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগে রাজনীতির মাঠ থেকে সংসদ, সংসদ থেকে চায়ের দোকান। কখনও তীর্যক, কখনও আগ্রাসী কখনও আবার নমনীয় আলোচনায় সরব ছিল দেশবাসী।
গণমাধ্যমগুলোও সচেষ্ট ছিল এই ইস্যুর সংবাদ পরিবেশন করতে।
২০১২ সালের পুরো বছরজুড়ে এমন হাজারো নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্প। একদিকে বাইশ হাজার কোটি টাকা ঋণ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার মতো দেশীয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে বিপাকে পড়ে সরকার। শুরুতে আবুল হোসেনকে নিয়ে দাতা সংস্থার অভিযোগ থাকলেও সরকার আগলে রাখেন তাকে। কিন্তু শেষরক্ষা হয় না। যোগাযোগমন্ত্রী আহত হলেও কাজের কাজ হয়নি। বিকল্পের সন্ধানে মালয়েশিয়ার প্রস্তাবের মূলা ঝুলেছে অনেকদিন। খোলা হয় দানবাক্স ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টও। অভিযোগ ওঠে চাঁদাবাজিরও, আলোচনায় আসে সারচার্জ বসানোরও। এত কিছুর পরও কাজের কাজ কিছুই হয় না। তত্ত্ব, তথ্য আর উপাত্তের বন্যায় ভাসতে থাকে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের ব্যাপারে কানাডীয় কোম্পানি এসএনসি লাভালিনের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে ২৯১ কোটি ডলারের পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্থগিত করে বিশ্ব ব্যাংক। এরপর আবুল হোসেনের পদত্যাগ, প্রকল্পের ইন্টেগ্রিটি অ্যাডভাইজর ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মসিউর রহমান এবং সেতু বিভাগের তত্কালীন সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইয়াকে ছুটিতে পাঠানোসহ সরকারের নানামুখী তত্পরতায় বিশ্ব ব্যাংক সিদ্ধান্ত বদলায়। বিশ্ব ব্যাংকের শর্তানুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু করে দুদক।
দুর্নীতির অনুসন্ধানে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সেতু সচিব মোশাররফ হোসেনসহ ২৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুর্নীতি দমন কমিশনের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন প্রকল্পের ইন্টেগ্রিটি অ্যাডভাইজর ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মসিউর রহমান, সাবেক প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম, জাতীয় সংসদের হুইপ নূর আলম চৌধুরী লিটনের ভাই নিক্সন চৌধুরী ও এসএনসি-লাভালিনের স্থানীয় এজেন্ট জিয়াউল হক। এ ছাড়া প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন কমিটির প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. আনম সফিউল্লাহ, পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ, সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী তরুণ তপন দেওয়ান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মকবুল হোসেন, ইস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের পরিচালক মো. দলিল উদ্দিন ও সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (নদী শাসন) কাজী মো. ফেরদৌসও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন। অপরদিকে বিশ্ব ব্যাংকের শর্তানুযায়ী বিশ্ব ব্যাংকের পর্যবেক্ষক ওকাম্পো ও তার সঙ্গী টিমোথি টং ও রিচার্ড অল্ডারম্যানের বিশেষজ্ঞ প্যানেল দেশে এসে দুদকের তদন্ত পর্যবেক্ষণ করেন। তিন দিনের সফর শেষে তারা যাওয়ার সময় দুদককে বেশ কিছু পরামর্শ দেন। এদিকে তদন্ত শুরুর পর দুদক দীর্ঘদিন দুর্নীতির কোনো তথ্য প্রমাণ না পাওয়ার কথা বললেও গত ২৭ নভেম্বর তদন্তকারী এ সংস্থার চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সাংবাদিকদের বলেন, পদ্মা প্রকল্পের কাজ পেতে ‘ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রে’ প্রমাণ পেয়েছেন অনুসন্ধানকারী প্যানেল। এর পর ২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় দেশে আসে বিশ্ব ব্যাংকের প্যানেল। গত ৫ ডিসেম্বর বিশ্ব ব্যাংকের তিন পর্যবেক্ষকের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেন দুদক কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকের পর দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, দুর্নীতির ‘ষড়যন্ত্র’ যে হয়েছিল, সে বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংক ও দুদক ‘একমত’ হলেও কার কার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে—সে বিষয়ে মতৈক্য হয়নি। শেষ পর্যন্ত মতৈক্য ছাড়াই ঢাকা ছাড়েন বিশ্ব ব্যাংকের প্যানেল। এরপর ৮ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে বিশ্ব ব্যাংক সাফ জানিয়ে দেয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ‘সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ’ তদন্ত না করা পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন করবে না বিশ্ব ব্যাংক।
শুরু হয় দুদকে নানা নাটকীয়তা। দীর্ঘ নাটকীয়তার পর বিশ্ব ব্যাংকের পরামর্শকে আমলে না নিয়েই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছাড়ায় গত ১৭ ডিসেম্বর পদ্মা সেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলার এজহার দায়ের করে দুদক। এজহারে তিনজন বিদেশিসহ পদ্মা সেতু প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত চার সরকারি কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়। তবে মামলার এজহারে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে, দরপত্র প্রক্রিয়াকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে তদানীন্তন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, কানাডিয়ান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিন ও অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাক্ষাত্ দেন। এসএনসি লাভালিনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাবেক মন্ত্রীর সাক্ষাতের ক্ষেত্রে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী যোগাযোগ স্থাপনকারীর ভূমিকা পালন করেন। তা ছাড়া রমেশ শাহ’র (এসএনসি লাভালিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট) নোটবুকে কাজ পাওয়ার পর পদ্মা পিসিসি (প্রজেক্ট কমার্শিয়াল কস্ট/ প্রজেক্ট কমিটমেন্ট কস্ট) হিসেবে দরপত্র মূল্যের বিভিন্ন পার্সেন্টেজ প্রদানের হিসাবে তাদের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। তবে আলোচ্য ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত অপরাধ সংঘটনে আবুল হোসেন চৌধুরী ও সৈয়দ আবুল হাসানের ভূমিকা রাখার বিষয়ে অপরাপর সাক্ষীদের সাক্ষ্য বা পরিপূরক সাক্ষ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। অপরাধ সংঘটনে সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল হাসান চৌধুরীর অপরাধ সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তকালে খতিয়ে দেখা হবে। মামলায় আসামি করা হয় সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র মূল্যায়নে গঠিত কমিটির সদস্য সচিব কাজী ফেরদৌস, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের, এসএনসি-লাভালিনের স্থানীয় এজেন্ট মো. মোস্তফা এবং এর ৩ কর্মকর্তা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস, আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ সাহা ও সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইল। এই সাতজন আসামির ব্যাপারে এজাহারে বলা হয়েছে, পারস্পরিক যোগসাজশে ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্র করার মাধ্যমে পদ্মা সেতু প্রকল্পের তদারকি পরামর্শকের কাজ এর অন্যতম দরদাতা এসএনসি লাভালিন ইন্টারন্যাশনালকে পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। এসএনসি লাভালিন ওই কার্যাদেশ পেলে ‘ঘুষ লেনদেন সম্পন্ন হতো’। আসামিরা ১৬১ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় অপরাধ করার অভিপ্রায়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করেন। যা দণ্ডবিধির ১২০ (বি) ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গত ২৬ ডিসেম্বর পদ্মাসেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র মামলায় প্রধান দুই আসামি সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও সেতু কর্তৃপক্ষের নদী শাসন বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদৌসকে আটক করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই দিন সকালে মামলায় জামিন নিতে হাইকোর্টে যান এ দু’জন। হাইকোর্টের অবকাশকালীন বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের বেঞ্চ এ দু’জনের জামিন আবেদনের শুনানি নাকচ করে আবেদনটি নিয়মিত বেঞ্চে উত্থাপন করতে বলেন। এরপর হাইকোর্ট থেকে ফেরার পথে দুপুর পৌনে দুইটার দিকে এ দু’জন গাড়ি নিয়ে শাহবাগ এলাকার দিকে যেতে গেলে দুদক কর্মকর্তারা ধাওয়া করে গাড়ির গতিরোধ করে তাদের আটক করে।
দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলায় ‘সন্দেহভাজন’ বলে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে রাখা হলেও এ ব্যাপারে পরিষ্কার কিছু জানাচ্ছে না তদন্তকারী সংস্থা। অপর দিকে ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু করার প্রত্যয় থেকে সরে আসেন মন্ত্রীরা। সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা সুর পাল্টে বলেন চেষ্টা থাকবে সরকারের এই মেয়াদে কাজ শুরু করার।
মামলা, যুক্তি, তর্ক বছরজুড়ে চলছে পদ্মা সেতু নিয়ে। পদ্মা সেতুর কাজে দুর্নীতির অভিযোগের দায়ে গোটা সরকারের উপর পরলেও সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন সৈয়দ আবুল হোসেনই।
