প রা গ ম ণ্ড ল

মায়ের বুকে ফেরা

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৩
পরাগ মণ্ডল। বয়স ছয়। কেরানিগঞ্জের শুভাড্যা বাংলাবাজার হিট ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রথম শ্রেণীর ছাত্র। বাবা বিমল মণ্ডল। পুরোনো ঢাকার তাঁতীবাজারের জে কে ইঞ্জিনিয়াররিং ওয়ার্কশপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক । মা লিপি মণ্ডল আর দিদি পিনাকি মণ্ডল। আর ঠাকুর মা সাবিত্রী মণ্ডল। এ নিয়েই ছিল তার ভালোবাসার ছোট পৃথিবী। হঠাত্ এক সকালে মানুষরূপী দানবরা মুক্তিপণের দাবিতে তাকে অপহরণ করে। প্রতিরোধ করতে গিয়ে দানবদের গুলিতে আহত হয় তার মা, দিদি আর গাড়ি চালক। আর এ অপহরণের মধ্য দিয়ে মণ্ডল পরিবারের এই ছোট সদস্যটি পরিচিতি পায় দেশবাসীর কাছে। পরাগ হয়ে ওঠে প্রতিঘরের আপনজনে। মণ্ডল পরিবারের কষ্টের অংশীদার হয় দেশের ছোট-বড় সবাই। কাটে শ্বাসরুদ্ধকর ৬৫ ঘণ্টা। এরপর অচেতন অবস্থায় রাস্তার পাশ থেকে উদ্ধার। মায়ের কোলে ফেরে পরাগ। পরিবারের সঙ্গে দেশবাসীও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তারপরও অপহরণকারীদের ধরতে চলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ইঁদুর-বিড়াল খেলা। আর ঘটনার ১৮ দিন পর শেষ হয় পরাগ অপহরনের দ্বিতীয় পর্ব। তৃতীয় পর্ব হলো চার্জশিট খুব শিগগিরই দাখিল করবেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু শেষ হয়েও তো সবকিছু শেষ হয় না। এখনও অজানা আশঙ্কায় প্রতিটি রাত পোহায় মণ্ডল পরিবারের। পরাগের বাবা বিমল মণ্ডল বলেন, ‘নিরাপত্তার কথা ভেবে পরাগের স্কুলে যাওয়া আপাতত বন্ধ রেখেছি। আগামী ৪ জানুয়ারি স্কুল খুলবে। আশা করি নতুন বছরে পরাগ স্কুলে যাবে। চিকিত্সক বলেছেন, অপহরণ নিয়ে যাতে পরাগের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করি। তার পরেও পরাগ মাঝে মাঝে সেই প্রসঙ্গ নিজে থেকেই উত্থাপন করে। বাসায় ২৪ ঘণ্টাই পুলিশ পাহারা রয়েছে। পরাগের মা এখনও সুস্থ হতে পারেনি। পরাগ সারাক্ষণ মায়ের পাশেই বসে সময় কাটায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তিন শিফটে পুলিশ পাহারা দেয়। আর পরাগ প্রায় জিজ্ঞাসা করে, বাবা বাসায় পুলিশ কেন? কেন তারা আসে। তার এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি।’ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কেরানিগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পরাগ অপহরণ মামলায় গ্রেফতারকৃত এক মহিলাসহ ১১ জনই কারাগারে। এরা হচ্ছে আমীর হোসেন, তার স্ত্রী বিউটি, যুবলীগ নেতা জুয়েল মোল্লা, জাহিদুল হাসান, আলী ওরফে রিফাত, কালা চান, আলফাজ, রিজভী আহমেদ অনিক, আবুল কাশেম, মামুন হোসেন ও আল আমিন। তাদের মধ্যে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন আমীর হোসেন, মোহাম্মদ আলী ওরফে রিফাত, জাহিদুল হাসান, কালা চাঁন ও আল আমিন । তিনি আরও বলেন, ‘ব্যালাস্ট্রিক ও কেমিক্যাল রিপোর্ট পাওয়ার পরপরই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে।’ কী ঘটেছিল :১১ নভেম্বর। রবিবার। সকালে মা লিপি মণ্ডল, বোন পিনাকি মণ্ডল (১১) তাকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছিলেন। দক্ষিণ কেরানিগঞ্জের শুভাড্যা পশ্চিমপাড়া কালিবাড়ি এলাকার বাসার সামনে ছিল তাদের প্রাইভেটকার। গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে অপহরণকারীরা পরাগকে অস্ত্রের মুখে মোটর সাইকেলে তুলে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। অপহরণকারীদের গুলিতে আহত হয় পরাগের মা, বোন ও গাড়ি চালক নজরুল ইসলাম। এদিকে পরাগকে উদ্ধারের জন্য আত্মীয়-স্বজন, এলাকাবাসী ও বিএনপি নেতৃবৃন্দ জোর দাবি তোলে। অপহরণের পর কেরানিগঞ্জ থানায় মামলা করেন পরাগের ঠাকুরমা (দাদি) সাবিত্রী মণ্ডল। ঘটনার দুইদিন পর ১২ নভেম্বর মঙ্গলবার রাত সোয়া ১২টার দিকে কেরানিগঞ্জের আঁটিপাড়া বাজার এলাকা থেকে অচেতন অবস্থায় পরাগকে উদ্ধার করা হয়। তাকে ভর্তি করা হয় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে। আপনজনদের চোখে জমে থাকা বেদনার মেঘ কেটে ঝরে আনন্দের অশ্রু। ছেলেকে দেখার জন্য ওইদিন রাতে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন মা লিপি মণ্ডল ছুটে যান স্কয়ার হাসপাতালে। শেষ হয় মায়ের প্রতীক্ষার প্রহর। পরে মাকেও ভর্তি করা হয় স্কয়ার হাসপাতালে। ১০ দিন হাসপাতালে থাকার পর মাকে নিয়ে বাড়িতে ফেরে পরাগ। তাকে স্নান করানো হয় দুধ দিয়ে। উদ্ধার অভিযান :ঘটনার পরপরই পরাগকে উদ্ধারে ঢাকা জেলা পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান শুরু করে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা দফতরে খোলা হয় মনিটরিং সেল। পাশাপাশি র্যাব তাদের মতো করে অভিযানে নামে। অভিযানে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার ছানোয়ার হোসেন বলেন, অপহরণকারীদের সঙ্গে পরাগের বাবা বিমল মণ্ডলের যোগাযোগ ছিল। ঘটনার পরই প্রযুক্তির মাধ্যমে অপহরণকারীদের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল। তবে পরাগকে জীবিত উদ্ধারই ছিল আসল টার্গেট। তা ছাড়া অপহরণকারীরা পরাগের বাবাকে হুমকি দিয়েছিল যে, র্যাব বা পুলিশের সহায়তা নিলে পরাগকে ইনজেকশন প্রয়োগে মেরে ফেলা হবে। তিনি বলেন, এ কারণেই খুব হিসাব-নিকাশ করে অভিযান করতে হয়েছে। ঘটনার পরের দিন ১২ নভেম্বর সোমবার অপহরণের প্রধান হোতা আমীর হোসেনের প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দা দফতরে আনা হয়। তার দেওয়া তথ্যমতে তার ভাই মামুন হোসেনকে আনা হয়। কৌশলে তাদের দিয়ে যোগাযোগ করা হয় আমিরের সঙ্গে। ১২ নভেম্বর মঙ্গলবার (পরাগ উদ্ধারের দিন) সন্ধ্যায় আমীর হোসেন নিশ্চিত হয় তার স্ত্রী-শ্যালক পুলিশ হেফাজতে। এরপরই আমির হোসেন পরাগকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়। অপহরকারীরা পরাগের বাবাকে জানায়, পরাগকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এ জন্য তাকে মোহাম্মদপুর বছিলা যেতে বলে। এরপরই ডিবি পুলিশ পরাগের বাবাকে নিয়ে আলাদা গাড়িতে বের হন। আমিরের স্ত্রী ও মামুনকে রেখে যান গোয়েন্দা দফতরে। পরাগের বাবা সেখানে পৌঁছানোর পর আমির তাকে আমিনবাজার পার হয়ে তুরাগ সেতুর কাছে যেতে বলে। এভাবে চলে সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। তবে রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমীরের স্ত্রী টেলিফোন পেয়ে তারা পরাগের বাবাকে নিয়ে আঁটিবাজারে ছুটে যান। আঁটিবাজার স্কুলের পাশের একটি বাড়ি থেকে রাত সাড়ে ১২টার দিকে প্রায় অচেতন অবস্থায় পরাগকে উদ্ধার করে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ র্যাবের ইঁদুর-বিড়াল খেলা :পরাগ উদ্ধারের দুইদিন পর গত ১৪ নভেম্বর। ডিবি পুলিশ নিশ্চিত হয় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় আমীরের ছয় সহযোগী অবস্থান করছে। তারা ওই দিন ভোর রাতে ঢাকা থেকে গাজীপুরে একটি বাড়িতে গিয়ে আমীরের সঙ্গে দেখা করবে। এ অবস্থায় ডিবি পুলিশ অবস্থান নেয় যাত্রবাড়ীতে। তাদের টার্গেট , ভোরে তাদের পিছু পিছু গাজীপুরে যাওয়া। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাত্ করে র্যাবের গাড়ি এসে ৬ জনকে তুলে নিয়ে যায়। অভিযান ব্যর্থ হয় ডিবির। এরপর আমীর চলে যায় গভীর আত্মগোপনে। ৭ দিন পর গত ২২ নভেম্বর রাত। ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মো. শফি উদ্দিন শেখ, পরির্দশক মেজাবাহ উদ্দিন আহমেদ, পরিদর্শক মো. রহুল আমিন, পরিদর্শক মো. সায়েদুর রহমানের সমন্বয়ে একটি টিম আমীরের সহযোগী আল আমিনকে ধরতে অভিযান চালায় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে। আর তাদের আগেই র্যাব সেখানে হাজির হয়। তবে র্যাবকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ডিবি পুলিশ আল আমিন ও তার একসহযোগী শাহিনকে আটক করে ঢাকায় ফেরে। সম্পৃক্ততা না থাকায় ছেড়ে দেওয়া হয় শাহিনকে। আল আমিনকে রিমান্ডে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি। আর আল আমিনের দেওয়া তথ্যমতে ডিবি নিশ্চিত হয় আমীর হোসেন টঙ্গী এলাকায় অবস্থান করছে। এরপর ২৯ নভেম্বর শুক্রবার। রাত ১২টার দিকে ডিবির একই টিম আমীরকে ধরতে টঙ্গীর (গাজীপুর সদর থানার অন্তর্গত) মুদাফা টিলারগাতিতে থেমে থেমে গুলিবিনিময়ের পর আহত অবস্থায় আমীর হোসেনকে গ্রেফতার করে। একই সময় গ্রেফতার করে তার দ্বিতীয় স্ত্রী বিউটিকে। ঠিক একই সময় র্যাবও ওই এলাকায় আমীরকে ধরতে অভিযান শুরু করেছিল। কিন্তু এ যাত্রায় র্যাব ব্যর্থ হয়। ডিবি জানায়, আমীর হোসেন গত ২৩ নভেম্বর টিলারগাতি এলাকার সৌদি প্রবাসী মনির হোসেনের একতলা বাড়ির একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল। এমনকি ওই এলাকায় পাঁচ লাখ টাকায় ২ শতাংশ জায়গা কিনে আমীর হোসেন ভবন নির্মাণ শুরু করে। মুক্তিপণ নিয়ে বির্তক :সূত্র জানায়, পরাগকে ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে অপহরণকারীদের মুক্তিপণ দেওয়া হয়েছে। তবে তার পরিমান ৫০ লাখ টাকার কম হবে। পরাগ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগেই গাবতলী এলাকায় আমীরের কাছে এ টাকা প্রদান করা হয়। আর টাকা প্রদানের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। ইচ্ছে করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আমীরকে গুলি করে ধরতে পারতেন। ওই সময় উপস্থিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্য বলেছেন, উপরের নির্দেশ ছিল, আগে পরাগ উদ্ধার, পরে অপহরণকারী গ্রেফতার। পরাগ উদ্ধারের পর র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয় ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হয়েছে। তবে পুলিশ বলেছে, না। পরাগের বাবা বলেছেন, না কোনো মুক্তিপণ দেননি। হাইকোর্টের রুল :২২ নভেম্বর পরাগ অপহরণের মূল হোতা আমীর হোসেন ও জুয়েল মোল্লাকে কেন গ্রেফতারে নির্দেশ দেওয়া হবে না— তার কারণ জানতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করে হাইকোর্ট। আবেদন করেন আইনজীবী ড. মো. ইউনুস আলী আকন্দ। এরআগে গত ১৫ নভেম্বর শিশু পরাগ ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবেদন করেন সাপ্তাহিক সপ্তবর্ণ পত্রিকার সম্পাদক নাজিম আহমেদ। আবেদনের প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত। আদালতে চলছে মামলা। হয়তো বিচারও হবে একদিন। কিন্তু একটি অবুঝ শিশুকে কেন্দ্র করে যে ঘটনা এবং তার প্রেক্ষিতে পুরো সমাজে যে আতঙ্ক গ্রাস করেছে তা সহজে হ্রাস পাবার নয়। হয়তো এই পরিবারটির জন্যও সারাজীবনে স্বস্তি কি তা জানা হবে না। এই সমাজ আর এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শিশুর নিরাপত্তা আজ নতুন করে আবারও ভাবনার খোরাক জোগাবে সচেতন নাগরিকদের। তাই পরাগের মায়ের বুকে ফেরা আপাত দৃষ্টিতে স্বস্তির হলেও দীর্ঘযাত্রায় হয়তো আশংকার বীজ রেখে যাবে।