আ লো চি ত অ ন্যা ন্য

তারকার প্রস্থান

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৭
বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়ে খবরটা এলো। হুমায়ূন আহমেদ নেই। নিষ্ঠুর, নির্মম এই সংবাদে হতভম্ব পুরো দেশের মানুষ। এমন তো হবার কথা ছিল না। অপারেশন তো ঠিক ঠিক হয়েছিল। কোন জটিলতা তো ছিল না। তারপরও? প্রশ্নের কোন কূল-কিনারা পাচ্ছিলেন না কেউ। জন্ম-মৃত্যুর নিশ্চয়তা কে দিতে পারে? কিন্তু সফল অস্ত্রপচারের পর যেটুকু অনিশ্চয়তার মেঘ মানুষের মনে ছিল সেটাও কেটে গিয়েছিল। তিনি সুস্থ হয়ে ফিরবেন, তার নতুন নতুন উপন্যাসের পাতায় বুঁদ হবেন পাঠক — এই স্বপ্ন দেখার পেছনে কোন আশঙ্কা ছিল না তো! তাই, হুমায়ূন আহমেদের এভাবে বিনা নোটিসে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছিল না কেউই। গেল বছর ১৯ জুলাই বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে এগারোটার দিকে যখন খবরটা বাংলাদেশে এলো তখন শোকে সত্মম্ভিত হয়ে পড়েছিল পুরো জাতি। ২০১২ সালে বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক অনিঃশেষ শোক-প্রাণপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের চলে যাওয়া। ‘আমি’ আমার কিছু অপছন্দের শব্দের একটি। আমরা পৃথিবীতে যখন বাস করতে আসি তখন আমির সঙ্গে যুক্ত হয় সন্ত্মান, স্ত্রী, বন্ধু-বান্ধব, স্বজন। জন্মের আগে এবং পরে আমি বলে কিছু থাকলেও থাকতে পারে, জীবিত অবস্থায় আমি বলে কিছু নেই। একটি সংকলন গ্রন্থের ভূমিকায় এভাবেই নিজের কথা বলেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। সেই তিনিই সবাইকে ছেড়ে একলা চলে গেলেন — এই অনুভূতি সীমাহীন শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল পরিবার, স্বজন, ভক্ত-পাঠকদের মনে। অসাধারন প্রাণশক্তির এই মানুষটি সারাজীবন ধরে দেখিয়ে এসেছেন ইচ্ছাশক্তি থাকলে, একাগ্রতা থাকলে, ভালোবাসা থাকলে সব সম্ভব। তার সেই মন্ত্রের জোরে মানুষ এটাও বিশ্বাস করেছিল যে দুরারোগ্য ক্যান্সারকে পরাজিত করে তিনি ফিরে আসবেন তেরোশ নদীর দেশ—এই বাংলায়। সারাদেশের মানুষের আকুতি ছিল—ব্যাধিকে জয় করে ফিরে এসো হুমায়ূন। কিন্তু তা আর হলো না। জীবন মৃত্যুর দোলাচলে দুলে-দেশের মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তার সফল অস্ত্রপচারের পর কদিন ধরেই সারাদেশে তার সুস্থতার বিষয়ে জল্পনা চলছিল। অস্ত্রপচার পরবর্তী জটিলতা দেখা দিয়েছিল। সবার মনে প্রশ্ন, ফিরবেন কী হুমায়ূন? আবার কী তার অসামান্য লেখনীর দেখা পাবে না বাংলাদেশের মানুষ। তার বইয়ে চোখ রেখে আবার কী জীবনকে, মানুষকে ভালোবাসার স্বপ্নে বিভোর হবে না তরম্নণপ্রজন্ম! কিন্তু তা আর হলো না। মাত্র ৬৩ বছর বয়সে চলে গেলেন। শোকাকুল মানুষ কেঁদে কেঁদে বলেছে, এত তাড়াতাড়ি যেতে নেই, এভাবে যেতে নেই হুমায়ূন। শোক জানাতে এসে হুমায়ূনের কফিনে ফুল দিয়ে ঢুঁকড়ে কেঁদে উঠেছিলেন একজন ভক্ত। ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিলেন চত্বর থেকে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন তিনি। কান্না জড়ানো গলায় বলে উঠলেন, ‘হুমায়ূন তুমি দেখতে পাচ্ছো। বাংলার মানুষ তোমার জন্য কাঁদছে।’ তাকে শ্রেষ শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল পুরো জাতিকে নতুন করে চিনিয়েছিল তিনি পাঠকের কতটা আত্মার আত্মীয়। মানুষের ঢল নেমেছিল — বিমানবন্দর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঈদগাহ ময়দানের জানাযা থেকে গাজিপুরের নুহাশ পলস্নী — লাখ লাখ মানুষের স্রোত। দাফন হয়ে যাবার পর তার কবর জিয়ারতের জন্য নুহাশ পলস্নীতে মানুষের ঢল আজ অবধি থামেনি। ২৪ জুলাই মঙ্গলবার চিরনিদ্রায় শায়িত হন হুমায়ূন। সেদিন শ্রাবণের অবিরাম বর্ষণ। মহান লেখকের মৃত্যুতে আকাশও কাঁদছিল যেন। কাঁদছিল নুহাশ পলস্নীর প্রতিটি বৃড়্গ, ঘাস, ‘দিঘিনালা’র জল। হুমায়ূন আহমেদের শেষ বিদায়কে ঘিরে ভক্তদের চোখের জলের ধারা ধুয়ে যাচ্ছিল অঝোর বর্ষণে। শ্রাবণ ধারায় ভিজে ভিজে অন্ত্মিম শয়ানে গেলেন বাংলার কিংবদন্ত্মিতুল্য লেখক হুমায়ূন আহমেদ। বৃড়্গছায়া শোভিত ‘নুহাশপলস্নী’র যে লিচুতলায় বসে বিশ্রাম নিতেন, সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তার নতুন কোন সৃষ্টি আর আসবে না ভক্তদের হাতে। কিন্তু তাতেই কী হুমায়ূন হারিয়ে যাবেন? তাও কী হয়। যিনি সৃষ্টিশীলতার বিস্ময়কর প্রকাশ ঘটিয়েছেন, যার সৃষ্ট চরিত্র মানুষের কাছে বাসত্মব হয়ে ধরা দেয়, যিনি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন গদ্যধারার সৃষ্টি করেছেন, যিনি লেখার ভাষা ও গানের ভাষারও স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছিলেন, জাতির প্রতিটি ক্রান্ত্মিকালে যিনি একজন সচেতন লেখকের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন— তার জন্য এই জাতি গৌরব করবে। বাংলা পাঠক সমাজের হূদয়ে হুমায়ূন বিরাজ করবেন অনন্তকাল!