গেলো বছরটা বিপরীতমুখী অবস্থানে কেটেছে সরকার ও বিরোধী জোটের। তবে বছরের শেষ দিন অর্থাত্ গতকাল সোমবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আগামী নির্বাচন প্রশ্নে খুব শিগগির বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সমন্বয়ক ও স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এমকে আনোয়ার ও ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। অন্য কিছু নিয়ে নয়।
সৈয়দ আশরাফ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তার উত্তর পাওয়া গেলেই সংলাপ শুরু হবে। তার দাবি, বিরোধী দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের আগে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের পুনর্নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছিলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উভয় দলের সদস্য সমন্বয়ে একটি ছোট মন্ত্রিসভা নির্বাচনকালে সরকার পরিচালনা করবে। সৈয়দ আশরাফ বলেন, যেকোনো সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথই হচ্ছে আলোচনা। আলোচনার মাধ্যমে সকল সংকটের সমাধান সম্ভব। যত দ্রুত আলোচনা হয় ততই মঙ্গল জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য। তিনি বলেন, আলোচনার জন্য সংসদে দাঁড়িয়ে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে-এখন প্রতি উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছি।
কবে নাগাদ বিরোধী দলকে প্রস্তাব দেয়া হবে এবং কী বিষয়ে আলোচনা হবে জানতে চাইলে সৈয়দ আশরাফ বলেন, আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, আশা করছি খুব শিগগির আলোচনা হবে। তিনি বলেন, এখন মতভেদ থাকলেও আগামী নির্বাচনে সকলেই অংশ নেবে।
তিনি আরো বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর ফলে সংবিধানে এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান নেই। তাই নির্বাচনকালে পূর্ববর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকবে।
সৈয়দ আশরাফের এই বক্তব্যের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির সমন্বয়ক তরিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের আশাবাদ শুভবুদ্ধির পরিচায়ক। তবে অন্তর্বর্তী নয়, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো ইস্যুতে আলোচনা বা নির্বাচন মেনে নেয়া হবে না। এরকম নির্বাচন হতেও দেয়া হবে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেছেন, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংসদ ভেঙে দিতে হবে। তিন মাসের মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নির্বাচন দিতে হবে। সেই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন তা নিয়ে বিএনপি আগ্রহ সহকারে আলোচনায় বসতে রাজি আছে। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে স্বপদে বহাল রেখে কোনো নির্বাচনে বিএনপি যাবে না। এই প্রধানমন্ত্রী তার পদে বহাল থেকে অন্য সব পদ যদি বিএনপিকে দেয়া হয় তবুও নির্বাচনে যাবে না বিএনপি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে আগ্রহী। আমাদের নেত্রীও এই আগ্রহের কথা বার বার বলেছেন। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিপূর্ণ রূপরেখা কি হবে সরকারকে তা পরিষ্কার করতে হবে। তারা একেক সময় একেক কথা বলছেন। আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সৈয়দ আশরাফ সাহেব বললেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে, আবার আজ বলছেন আলোচনায় বসতে চান। তারা কি চান তা আগে নির্ধারণ করতে হবে। তার আগে কোন আলোচনার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হবে না।
এমকে আনোয়ার বলেন, ‘আমরা আলোচনা করবো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন তা নিয়ে। অন্য কিছু নিয়ে গ্রহণযোগ্য আলোচনা হতে পারে না।’ তিনি বলেন, চলমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে আমাদের সঙ্গে ভেতরে ভেতরে আলোচনা চলছে বলে আশরাফ সাহেব যা বলেছেন, তা ঠিক নয়।
এই প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের সঙ্গে ভেতরে ভেতরে আলোচনা চলছে বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যে কথা বলছেন, তা আমার জানামতে সঠিক নয়। আর আলোচনার প্রস্তাব তারা দিলে আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিব।
প্রসঙ্গত, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। অনেক অরাজনৈতিক ব্যক্তি ও সংগঠন নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণের জন্য বিভিন্ন ফর্মুলাও দিচ্ছেন। তবে সরকার এখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে কঠোর অবস্থানেই আছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন। এ ধরনের সরকারের গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন।
