অনিয়ম করে অধ্যক্ষ হয়েছেন। তার পর সার্টিফিকেট জালিয়াতি করে বেতন-ভাতা উত্তোলন। এভাবে ১৮ বছর কাটিয়ে দিলেন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বালারহাট কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম। এদিকে সার্টিফিকেট জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তেও। জাহাঙ্গীর আলমকে সাড়ে তিন লাখ টাকা ও তার হাতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতার ১৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮শ ১৬ টাকাসহ মোট ১৭ লাখ টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শকের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষে তিনটি বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন।
এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, কলেজটি স্থাপিত হয় ১৯৯৫ সালে। ওই বছরেই অধ্যক্ষ নিয়োগের ব্যবস্থা করে কলেজ কমিটি। নিয়ম অনুযায়ী কোন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দিতে হলে সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে সরকারি কলেজের একজন অধ্যক্ষ থাকতে হয়। ওই পদে কমপক্ষে তিন জন প্রতিদ্বন্দ্বি এবং প্রভাষক পদে ৫ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে প্রার্থীকে। একই সঙ্গে লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষা দিতে হবে প্রার্থীকে। কিন্তু জাহাঙ্গীর আলমের নিয়োগের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম মানা হয়নি। শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষা দিয়েই তিনি অধ্যক্ষ হয়েছেন। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি কলেজের কোনো অধ্যক্ষ উপস্থিত ছিলেন না। প্রার্থী ছিলেন জাহাঙ্গীর আলমসহ দুই জন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর আলম ১৯৭৬ সালে মিঠাপুকুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭৮ সালে পীরগাছা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি তৃতীয় শ্রেণী লাভ করেন। ১৯৮২ সালে স্নাতক এবং ১৯৮৩ সালে স্নাতকোত্তর পাস করেন।
অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর সব সার্টিফিকেট উপজেলা শিক্ষা অফিসে পাঠানো হয়। এসএসসি ও এইচএসসিতে তৃতীয় বিভাগ থাকায় অন্য সব শিক্ষকের বেতন আসলেও জাহাঙ্গীর আলমের বেতন তখন আসেনি। তত্কালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বোরহান উদ্দিন তার বেতন-ভাতার অনুমোদন দেননি।
পরে জাহাঙ্গীর আলম সার্টিফিকেট জালিয়াতি করে এসএসসি এবং এইচএসসিতে তৃতীয় বিভাগের বদলে দ্বিতীয় বিভাগ দেখিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে ২০০০ সালের ২২ মে বেতনের জন্য ব্যানবেইসে পাঠান। ২০০১ সাল থেকে তিনি বেতন উত্তোলন করে আসছেন। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলেজটি এমপিও ভুক্ত হয়। ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক ও উচচ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহীর কলেজ পরিদর্শক এসে ওই অধ্যক্ষকে সমাজ বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা এবং ইসলামী শিক্ষা বিষয় চালু করার অনুমতি দেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষর এবং স্মারক জালিয়াতি করে কৃষি শিক্ষা, কম্পিউটার এবং প্রকৌশল ও অংকন বিষয় অনুমোদন নেন। পরে তিনি আবার ওই তিন বিষয়ে অনুমতির জন্য আরেকটি ভুয়া স্মারক নম্বর দিয়ে বিষয় চালু করার অনুমতির আবেদন করেন। সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি না থাকলেও তিনি অবৈধভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তারা আজ পর্যন্ত বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছেন।
২০০৫ সালের ৭ জুলাই শিক্ষা পরিদর্শক বেনজির আহমেদ এবং শাহানা আহমেদ কলেজ পরিদর্শনে এসে মন্ত্রণালয়ে ১৪ জুন একটি প্রতিবেদন দেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর মোঃ আলী আকবর এবং উপ-পরিচালক এএফএম নরুল হুদা স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলমের সার্টিফিকেট ভুয়াসহ ১২টি অনিয়ম ছাড়াও বলা হয় ‘কলেজটির স্বীকৃতির মেয়াদ ২০০১ সালের ৩০ জুন শেষ হয়েছে। ৮ জন প্রভাষক, ১ জন করণিক ও ১ জন ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী অবৈধ ভাবে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। সে কারণে ১৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮শ ১৬ টাকা ফেরতসহ তাকে কারণ দর্শনারও চিঠি দেয়া হয়েছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল লিখত অভিযোগ করেছেন ওই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ডা. আব্দুল মালেক। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সূত্র মতে, অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলমের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে কথা বলা এবং টাইম স্কেল বৃদ্ধি নিয়ে কলেজের সাচিবিক বিদ্যা এবং অফিস ব্যবস্থাপনা বিষয়ের শিক্ষক ফকরুল ইসলামের কাছে ১২ হাজার টাকা নেয়া ছাড়াও আরো ৩৩ হাজার টাকা দাবি করেন তিনি। এর প্রতিবাদ করায় অধ্যক্ষ ওই শিক্ষককে চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর অফিস কক্ষেই পেটায়। এ ব্যাপারে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মিঠাপুকুর থানায় একটি মামলা হয়েছে। এ ব্যাপারে গত রবিবার বিকালে জাহাঙ্গীর আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমার কাছে তত্কালীন পরিদর্শক ৫ লাখ টাকা ঘুষ চেয়েছেন। সেই টাকা না দেয়ার কারণে তারা আমার বিরুদ্ধে ভুয়া প্রতিবেদন দিয়েছেন। আমি কোনো অনিয়ম করিনি।
