ছড়া সাহিত্যের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:৪১
আমাদের সাহিত্য অঙ্গনে একটি সুপরিচিত নাম রফিকুল হক। তিনি দাদুভাই নামেও অনেকের কাছে পরিচিত। শিশু সংগঠন চাঁদের হাটের তিনি প্রতিষ্ঠাতা। ছোটদের জন্য তিনি ছড়া-কবিতা লিখছেন ৬০ বছর ধরে। তার শিশুতোষ বইয়ের সংখ্যা কম হলেও প্রকাশিত বইগুলো ছোটদের কাছে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে। এগুলো হলো : পান্তা ভাতে ঘি, বর্গী এলো দেশে, নেবুর পাতায় করম চা, ঢামেরিক, আম পাতা জোড়া জোড়া, বই বই হই চই ও প্রাচীন বাংলার রূপকথা। সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তিনি পেয়েছেন অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। বাংলা একাডেমীর সাহিত্য পুরস্কার পাবার জন্য তাকে ২০১০ সালে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। রফিকুল হক দাদাভাই ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস রংপুরের কামাল কাচনা। তাঁর বাবার নাম ইয়াছিন উদ্দিন আহম্মদ ও মায়ের নাম রহিমা খাতুন। রফিকুল হক দাদুভাই বর্তমানে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন। এ সংখ্যায় তাঁর সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেছেন মিলন সব্যসাচী। প্রশ্ন: আপনার শৈশব-কৈশোর সম্পর্কে জানতে চাই। উত্তর: শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি সবার কাছেই বড়ই মধুর। সেই গানটার মতো মনে হয়: ‘ছেলেবেলার গল্প শোনার দিনগুলো এখন কতো দূরে। আজ আসে না রাজার কুমার পঙ্খীরাজে উড়ে।’ সেসব মধুময় দিন কি আর ফিরে পাওয়া যাবে? আমার শৈশব কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের ছবির মতো শহর কুচবিহারে। সেখানেই আমার স্কুলজীবন শুরু। দাদু ছিলেন জমিদার। বাবা জোতদার। কামিনিরঘাটে খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে জোতে (জমিদারের অঞ্চল) যাওয়ার কথা আজও মনে আছে। কতো রকমের কতো রঙের পাখি, নানান রকমের গাছপালা, নতুন নতুন মানুষ—আমার খুব ভালো লাগতো। কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের উত্তরের শহর রংপুরে। সেখানে আমি যে স্কুলে পড়তাম, আমার স্কুলের নাম কৈলাশ রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়। সেই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করে কারমাইকেল কলেজে লেখাপড়া করি। প্রশ্ন: আপনার প্রথম লেখাটি কি ছিলো? কোথায় ছাপা হয়েছিলো? উত্তর: লিখতাম খুব ছোটবেলা থেকেই। জগাখিচুড়ি—যখন যা ইচ্ছে তাই। লিখতাম মজা করে। সহপাঠীদের পড়ে শোনাতাম। বাহবা পেতাম। ১৯৫২ সালের কথা আমি যখন নবম শ্রেণীতে পড়ি তখন কলকাতার ‘দৈনিক লোকসেবক’ পত্রিকায় ছোটদের বিভাগ সবুজ পাতায় সবুজসাথী শিরোনামে ছোট্টো ছোটো বাক্যে, বার লাইনের একটি পদ্য প্রথম প্রকাশিত হয়। সবুজ পাতা বিভাগটি তখন সম্পাদনা করতেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক রমেন দাস। প্রথম প্রকাশিত সেই পদ্যটি ছিলো এরকম: সবুজ পাতা/সবুজ সাথী/ সবুজ সবার মন,/ দেশ মাতাকে/ নতুন করে/ গড়াই মোদের পণ।/ ধনী-গরীব/জাতিভেদের বালাই হেথায় নাই,/ সবুজ মোরা/ আপন সবে/ সবাই সবার ভাই। এ লেখাটি ১৯ ফেরুয়ারি প্রকাশিত হলেও পত্রিকাটি পাই ২০শে ফেব্রুয়ারি। অর্থাত্ একদিন পরে। হায়রে ছাপার অক্ষরে জীবনের প্রথম প্রকাশিত লেখাটি দেখে আমার কী যে আনন্দ সে কথা আজ বলে বোঝাতে পারবো না। তারিখটা আমার খুব মনে আছে এ কারণে যে, তার পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার দাবিতে ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিলো। বেশ মনে আছে, সেদিন বড়ভাইদের ডাকে ক্লাস বর্জন করে রংপুরের রাজপথে আমরা মিছিল করেছিলাম ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ছাপার অক্ষরে আমার প্রথম লেখা আর মহান একুশের স্মৃতি আমার জীবনে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। প্রশ্ন: ছড়া লেখার ব্যাপারে কেউ কি আপনাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন? উত্তর: আমার স্নেহশীলা মা শিশুতোষ ছড়া শুনিয়ে আমাকে ঘুম পাড়াতেন। সুকুমার রায়, সুনির্মল বসু আর পল্লীকবি জসীমউদদীনের ছড়া কবিতা পড়ে পদ্য লেখার কসরত শুরু করি। পরবর্তীতে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত আর অন্নদা শঙ্কর রায় আমাকে ছন্দের জাদু শেখান। কবি হাবীবুর রহমান (দৈনিক সংবাদ পত্রিকার খেলাঘর পাতার প্রথম ‘ভাইয়া’) আমাকে উত্সাহ দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাঃ তুমি তো চমত্কার ছড়া লেখ হে! ছড়া লেখা বাদ দিয়ো না।’ আজ মনে হয়, তাঁর ওই দু’টি উচ্চারণই সম্ভবতঃ আমার ছড়াকার হওয়ার পেছনে প্রথম এবং অব্যর্থ অনুপ্রেরণা। প্রশ্ন: আপনার প্রথম বই সম্পর্কে কিছু বলুন। উত্তর:আমার প্রথম বই ‘বর্গী এলো দেশে।’ ছাপা হয় ১৩৯০ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ। ইংরেজি তারিখ ১৫ই এপ্রিল ১৯৮৩ সালে বই প্রকাশে—প্রেরণা যুগিয়েছেন বন্ধু শিল্পী হাশেম খান। ছড়াকার লুত্ফর রহমান রিটন ছায়াসঙ্গী হয়ে বইটি প্রকাশে আমাকে সহায়তা করেছে। এদের কথা আমি ভুলতে পারবো না। প্রথম বইটি প্রকাশ হওয়ার আনন্দে প্রথম বাবা হওয়ার মতোই সেদিন আমি আপ্লুত হয়েছিলাম। প্রশ্ন:আমাদের জানা মতে—১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনি একটি অসাধারণ ছড়া লিখেছিলেন। সে সম্পর্কে কিছু বলুন। উত্তর:বায়াত্তরে বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর পাকিস্তানিদের পীড়নে চিকিত্কার জন্য লন্ডনে গিয়েছিলেন। একমাস চিকিত্সা নেয়ার পর সেখান থেকে তিনি দেশে ফেরেন। ১৯৭২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। তত্কালীন ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকা তাঁর অসুস্থ হয়ে দেশে ফেরা উপলক্ষে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। আমার সেই ছড়াটির শিরোনামে নিয়ে বিশেষ সংখ্যাটির নামকরণ হয়। ‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু।’ ওই বিশেষ সংখ্যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তিন কলাম ছবির নীচে আমার ছড়াটি ছাপা হয়। প্রশ্ন: এ সময়ে অনেকেই ছড়া লিখছেন। কার, কার ছড়া আপনার ভালো লাগে? উত্তর: সব ধরনের ছড়া-কবিতার আমি একজন একনিষ্ঠ পাঠক। বইপুস্তক, পত্র-পত্রিকায় সবার লেখাই আমি পড়ি। সবার সব লেখা ভালো না লাগলেও ভালো লেখাটি ঠিকই ভালো লাগে। বিশেষ করে এক্ষেত্রে কারো নাম উল্লেখ করে অন্যদের মনে কষ্ট দিতে চাই না। তবে এটুকু আস্থার সঙ্গে বলতে পারি, অনন্ত আমাদের ছড়া-সাহিত্যের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। আমাদের নবীন ছড়াকারদের অনেকেই খুব ভালো ছড়া লিখছে। প্রশ্ন: আপনি তো ছোট-বড় সবার জন্যই ছড়া লেখেন। আপনার শিশুতোষ ছড়াগুলো ছোটদের মনের খোরাক যোগাতে কতটুকু সফল হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? উত্তর:লিখি তো মনের তাগিদে। ছোটদের জন্য লিখতে গেলে ছোট হয়ে যেতে হয়। আমি চাঁদের হাটের মতো ছোটদের সংগঠন বানিয়েছি। মিশি ছোটদের সঙ্গে। একেবারে মিশে যাই। ওদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা আঁচ করতে পারি। লিখিও সেসব নিয়ে। তবে এটা বেশ বুঝতে পরি যে, ওরা আমার ছড়া পড়ে খুব মজা পায়। প্রশ্ন: এ পর্যন্ত আপনি কি কি পুরস্কার পেয়েছেন? উত্তর: পুরস্কার পাবো বলে তো কোনদিন লিখিনি। অনেক অনেক পুরস্কার পেয়েছি এ যাবত্। কোনটার কথা বলবো? তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাংলা একাডেমীর সাহিত্য পুরস্কার, নিখিল ভারত শিশু সাহিত্য সংঘের আজীবন সাহিত্য সম্মাননা, বিহারের স্ক্রোল অব অনার, অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার ও বাংলাদেশ ছড়া একাডেমী সম্মাননা। প্রশ্ন: সপ্তাহের প্রতি বুধবার আমাদের কচি-কাঁচার আসর বর্ধিত কলেবরে প্রকাশিত হয়। আপনার কেমন লাগে? উত্তর: দুই পৃষ্ঠা কচি-কাঁচার আসর ভাবাই যায় না। শিশু-কিশোরদের মেধা-মনন বিকাশে, বিশেষ করে শিশু সাহিত্যকে সময়োপযোগী মূল্যায়নের জন্য দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার মালিক-কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ধন্যবাদ। কচি-কাঁচার আসর কোনো কোনো সংখ্যা এমন বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে যে, চোখ ফেরানো যায় না। মন ভরে যায়। আবার বলি কচি-কাঁচার আসর খুব ভালো। ও হ্যাঁ, নতুন লিখিয়েদের জন্য আমার এতটুকু বলা। পড়ো, খুব বেশি বেশি পড়ো, না পড়লে জানবে কী করে? এর আগে অগ্রজ কবি-সাহিত্যিক, ছড়াকার, গল্পকার, কে কি লিখেছেন না পড়লে কি কিছু জানা যাবে? নতুন লেখা মানেই তো আগের বা, পুরনো লেখা বাদ দিয়ে নতুন কিছু লেখা। প্রশ্ন: আসছে ৮ই জানুয়ারি আপনার জন্মদিন। আপনাকে আসরের পক্ষ থেকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। আগামী দিনগুলোয় আমাদের আরো ভালো ছড়া-কবিতা উপহার দেবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা। উত্তর: আমি আরো ভালো কিছু লিখতে চাই। কচি-কাঁচার আসরের সবাই আমার বন্ধু। ওদের দোয়া চাই। কর্তৃপক্ষের কাছেও আমার অনেক কৃতজ্ঞতা। ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত ছড়া ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু পাইতা থুইছি পিঁড়া, জলপান যে করতে দেব ইরি ধানের চিড়া। শালি ধানের চিড়া ছিল বিন্নি ধানের খই, কোথায় পাব শবরী কলা গামছা বাঁধা দই! জান মেরেছে খান পশুরা বর্গী সেজে ফের, আগুন জ্বেলে খাক করেছে দেশটা আমাদের। প্রাণের বন্ধু ঘরে আইলা বসতে দিমু কিসে বুকের মধ্যে তোমার বাণী রক্তে আছে মিশে। বঙ্গবন্ধু তোমার আসন বাংলাদেশের মাটি, মনের মধ্যে পাতা আছে প্রীতির শীতল পাটি। ১৯৭২