শেয়ারবাজারে দরপতন অব্যাহত রয়েছে। গত তিন মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচক কমেছে ৭১২ পয়েন্ট যা গত ২৭ মাসে সর্বনিম্ন। বাজেটের আগে বাজারের এই দরপতনকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। তাঁরা বাজার ঠিক রাখতে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দাবি করেছেন। বলেছেন, বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যানকে না সরালে বাজার ঠিক হবে না। একইসঙ্গে শেয়ার কেলেঙ্কারির হোতাদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাসহ ১২ দফা দাবিও জানান তারা।
সোমবার দেশের দুই বাজারেই সূচকের পতন ঘটে। রবিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল বলেছেন, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণহীন। তিনি বাজারের উন্নয়নে বাজেটে সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও জানান। পরদিন সোমবার ঢাকার ডিএসইএক্স ৬২ পয়েন্ট কমে যায়। চট্টগ্রামের সিএএসপিআই সূচক কমে ১৮৩ পয়েন্ট।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নানা কারণে বাজারের পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। এরমধ্যে আস্থাহীনতা অন্যতম কারণ। এখানে রয়েছে স্বল্প মূলধনী কোম্পানির দৌরাত্ম্য। এসব কোম্পানির আইপিও প্লেসমেন্ট শেয়ারের অবৈধ বাণিজ্য বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে।
সূত্রমতে, বাজারে রয়েছে তারল্য সংকট। ব্যাংকিং খাত শেয়ারবাজারে বড় ভূমিকা রাখে। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা নাজুক হওয়ায় এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। মুদ্রানীতিও এরজন্যে কম দায়ী নয়। বছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষিত হওয়ার পর থেকে বাজারে পতন অব্যাহত রয়েছে। ফলে, বাজারে নতুন করে ধসের আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা। অর্থমন্ত্রীও গত সোমবার বলেছেন, শেয়ারবাজারে সূচকের উত্থান-পতনের পেছনে কেউ কেউ জড়িত।
পতনের প্রতিবাদে প্রতীকী অনশন
এদিকে, দরপতনের প্রতিবাদে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বাজারে অনশন করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের ব্যানারে সোমবার সকালে মতিঝিলে ডিএসই ভবনের সামনে এই অনশন হয়। এ সময় তারা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেনের পদত্যাগ দাবি করেন। তারা পুঁজিবাজার নিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামালের মন্তব্যের সমালোচনা করেন।
দুপুরে এই অনশন ভাঙান স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য অর্থমন্ত্রীকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।
বিনিয়োগকারীদের দাবি
বিনিয়োগকারীরা ১২ দফা দাবি পেশ করেন। ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী বলেন, অব্যাহত দরপতনে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। প্রতিদিন আমরা পুঁজি হারাচ্ছি। বাজার বাঁচাতে আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
তিনি বিএসইসির চেয়ারম্যানসহ কতিপয় কর্মকর্তার পদত্যাগ দাবি করেন। এটি ছিল ১২ দফা দাবির প্রথম দফা। অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে— যেসব কোম্পানি বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করেছে এবং করবে তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে ন্যূনতম ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে হবে। জেড গ্রুপ কিংবা ওটিসি (ওভার দা কাউন্টার) মার্কেট বলতে কোনো মার্কেট থাকবে না। বন্ধ করতে হবে দুর্বল কোম্পানির আইপিও প্লেসমেন্ট শেয়ারের অবৈধ বাণিজ্য। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী দোষীদের আইনের আওতায় আনা এবং বিচারের ব্যবস্থা করা, উদ্যোক্তা পরিচালকদের ব্যক্তিগত ২ শতাংশ এবং সম্মিলিত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ না করলে বিচারের আওতায় আনার দাবিও জানান বিনিয়োগকারীরা। তারা বলেন, পুঁজিবাজারে অর্থের জোগান বাড়াতে সহজ শর্তে ৩ শতাংশ সুদে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে। যা আইসিবি, বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকার হাউজের মাধ্যমে ৫ শতাংশ হারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লোন হিসেবে বিনিয়োগের সুযোগ নিতে পারবেন।
তাদের দাবির মধ্যে আরো রয়েছে— মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোকে পুঁজিবাজারে সক্রিয় হতে বাধ্য করা এবং প্রত্যেক ফান্ডের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক করা। মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোকে কমপক্ষে ১০ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিতে হবে এবং মেয়াদ না বাড়িয়ে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোকে উন্মুক্ত ফান্ডে রূপান্তর করতে হবে। আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারী কোটা ৮০ শতাংশ নির্ধারণ, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মার্জিন লোনের সুদ মওকুফ করাসহ ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং এ্যাক্ট বাস্তবায়নের দাবি জানান বিনিয়োগকারীরা।
